দুর্গাপুজোর সময় পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম শৃঙ্গ মানসলু (Mount Manaslu) জয় করলেন হুগলির পর্বতারোহী শুভম চ্যাটার্জি (Shubham Chatterjee)। ৮,১৬৩ মিটার উচ্চতায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ইতিহাস গড়লেন ‘মাউন্টেনিয়ার রনি’।

মানসলুর চুড়োয় শুভম।
শেষ আপডেট: 8 October 2025 17:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্গাপুজোর ঢাক বাজছে, শহর আলোয় ঝলমল করছে, আর ঠিক তখনই এক তরুণ লড়ছে পৃথিবীর অষ্টম সর্বোচ্চ শৃঙ্গের বরফঢালে। তিনি হুগলির হিন্দমোটরের শুভম চ্যাটার্জি, পর্বতারোহী মহলে যিনি ‘মাউন্টেনিয়ার রনি’ নামে পরিচিত।

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। ভোর ৬টা ১৮ মিনিট। নেপালের মানসলু শৃঙ্গের উচ্চতা ৮,১৬৩ মিটার। সেই ভয়ংকর শীতল উচ্চতায় ভারতের পতাকা তুলে দিলেন শুভম। যে সময় কলকাতা প্রস্তুত হচ্ছিল পুজোর আলোয়, শুভম তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন মৃত্যুঝুঁকির মাঝখানে, মেঘের অনেক ওপরে।

মানাসলু বা Spirit Mountain। সেখানে পা রাখা কোনও সহজ বিষয় নয়। এই পর্বত ‘ডেথ জোন’-এর উপরে, অর্থাৎ এমন উচ্চতা যেখানে মানুষের শরীর দীর্ঘক্ষণ টিকতে পারে না। ৮,০০০ মিটারের ওপরে অক্সিজেনের অভাব, হিমবাহের গহ্বর, আর ভয়ঙ্কর সেরাকের (বরফের টাওয়ার) নীচে লুকিয়ে থাকে বিপদ।
শুভম জানান, ক্যাম্প ৩ থেকে ক্যাম্প ৪ পর্যন্ত পথটাই সবচেয়ে কঠিন। প্রায় ১০ ঘণ্টা টানা আরোহণ করে পেরোতে হয় খাড়া তুষারঢাল, বরফের দেয়াল, পাথুরে এলাকা। তুষারঝড়ের ভয় তো রয়েছেই। একবার এক প্রবল অ্যাভালাঞ্চ ক্যাম্প ৩-এ তাঁদের পথ আটকে দেয়। কিন্তু থেমে থাকেননি শুভম। সহযাত্রী গাইড ও শেরপাদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে রোপ বসিয়ে, বরফ কেটে পথ তৈরি করে এগিয়ে গেছেন ধাপে ধাপে।

এই অভিযান পরিচালিত হয় কিংবদন্তি নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজা (নিমস দাই)-এর নেতৃত্বে—যিনি একসময় ‘১৪ পিকস ইন ৭ মান্থস’ অভিযানের জন্য বিশ্বখ্যাত হন। তাঁর দলের অংশ হয়ে শুভম শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সহনশক্তিরও চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন।

এর আগেও শুভম জয় করেছেন একাধিক মহাদেশের শৃঙ্গ। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আন্টার্টিকা—সবখানেই তাঁর পদচিহ্ন পড়েছে। ৪৯ ঘণ্টার ব্যবধানে ওশিয়ানিয়া মহাদেশের দুটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করার রেকর্ড রয়েছে তাঁর। এই অসামান্য সাফল্যের জন্য তাঁর নাম ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত হয়েছে World Book of Records (London)-এ।

এবার তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। শুভম বলেন, “প্রতিটি শৃঙ্গ আমাকে নতুনভাবে শেখায়, মানুষ কোথায় থেমে যায় আর মন কোথায় পৌঁছতে পারে। মানাসলু শুধু পর্বত নয়, এটা আমার নিজের সীমা ভাঙার যাত্রা।”

আজ যখন দেশের যুবসমাজ নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত, তখন শুভমের এই অভিযান এক আশার আলো। পাহাড়ে তাঁর জয় কেবল উচ্চতার নয়, মানবিক ইচ্ছাশক্তিরও প্রতীক।