ডাঃ মণি ছেত্রীর হাত ধরে এসএসকেএম-এ গড়ে ওঠে ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট (আইটিইউ)। একে একে চালু হয় এনডোক্রিনোলজি, কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, ডায়াবিটিস, রিউম্যাটোলজি— যা আগে রাজ্যের কোনও সরকারি হাসপাতালে আলাদা বিভাগ হিসেবে ছিল না।

ডাঃ মণি ছেত্রী
শেষ আপডেট: 6 April 2026 07:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটি যুগের অবসান ঘটে গেল নীরবে। ১০৬ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক মণি কুমার ছেত্রী। এমন একটি নাম, যাঁকে এড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক চিকিৎসা ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা চিকিৎসা পরিষেবার পরিকাঠামো, বিশেষায়িত বিভাগ বা আধুনিক চিকিৎসার কথা বলি, তখন একথা মনে রাখতেই হয় যে, তার ভিত অনেকটাই গড়ে দিয়েছিলেন এই মানুষটি। তাই তাঁর প্রয়াণ যেন সেই ভিত্তির উপর এক আবেগঘন শোকের চাদর নামিয়ে আনল।
১৯২০ সালের ২৩ মে দার্জিলিংয়ে জন্ম। পাহাড়ি শহরের এক সাধারণ শুরু থেকে তাঁর পথচলা শুরু। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ, তারপর ১৯৪৪ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক। থেমে থাকেননি, ১৯৪৯-এ স্নাতকোত্তর। এরপর বিদেশে পাড়ি, জ্ঞানের পরিধি আরও প্রসারিত করতে।
১৯৫৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিসিয়ানস থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন, পরবর্তী সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ—কার্ডিওলজি থেকে মেডিক্যাল সায়েন্সেস—সব ক্ষেত্রেই নিজের ছাপ রেখে গেছেন তিনি।
কিন্তু তাঁর আসল কাজ শুরু হয় দেশে ফিরে। কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসা। তারপর প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল, আজকের এসএসকেএম— আবার সেই হাসপাতালকেই যেন নতুন করে গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর ছিলেন তিনি।
টাইমলাইনে যদি দেখা যায়, বিধানচন্দ্র রায়ের পর রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই জায়গাতেই হস্তক্ষেপ করেন মণি কুমার ছেত্রী। শুধু চিকিৎসা নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়েও এগিয়ে আসেন।
তাঁর হাত ধরেই এসএসকেএম-এ গড়ে ওঠে ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট (আইটিইউ)। একে একে চালু হয় এনডোক্রিনোলজি, কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, ডায়াবিটিস, রিউম্যাটোলজি— যা আগে রাজ্যের কোনও সরকারি হাসপাতালে আলাদা বিভাগ হিসেবে ছিল না।
সহকর্মীরা বলেন, “তিনি শুধু ডাক্তার নন, তিনি একটি সিস্টেম তৈরি করেছেন।” চিকিৎসক জয়ন্ত বসুর কথায়, “একদিকে কঠোর প্রশাসক, অন্যদিকে অসাধারণ চিকিৎসক—এই ভারসাম্য খুব কম মানুষ রাখতে পারেন।”
ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন ‘টিচার অফ টিচার্স’। তাঁর শতবর্ষের জন্মদিনে ছাত্র মনোতোষ পাঁজা স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ আমাদের অনুপ্রাণিত করত। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেখাতেন—দুর্ভিক্ষ মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও কাজ করেছেন।”
১০০ বছর পেরিয়েও তাঁর কর্মস্পৃহা ছিল বিস্ময়কর। ভোরে ওঠা, নিয়মিত রোগী দেখা—এসএসকেএম-এর রোনাল্ড রস বিল্ডিংয়ে তাঁর নামে থাকা কেবিনে অনেকদিন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন তিনি। বয়স যেন তাঁর অভিধানে কোনও বাধা ছিল না।
তবে এখানেই কিছু প্রশ্নও উঠে আসে। এত দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত গড়ে দেওয়া এক ব্যক্তিত্ব—তাঁর তৈরি কাঠামো কি যথাযথভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেছে? আধুনিক চিকিৎসার চাপে, প্রযুক্তির ঝড়ে—সেই মানবিক স্পর্শ কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে না? শুধু তাই নয়, তাঁর মতো শিক্ষক-চিকিৎসকদের উত্তরসূরি তৈরি করার প্রক্রিয়া কি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে? নাকি সেই ধারাবাহিকতায় কোথাও ছেদ পড়েছে?
১৯৭৪ সালে পদ্মশ্রী, তার আগেই একাধিক সম্মান—সবই তাঁর কাজের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় হয়তো এইসব পুরস্কারের বাইরেই—একজন চিকিৎসক, যিনি সিস্টেম বদলেছেন।
আজ তাঁর প্রয়াণে চিকিৎসা মহলে শোকের ছায়া। তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়। যে ভিত তিনি গড়ে দিয়েছিলেন, সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আমরা কি তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব, নাকি সময়ের স্রোতে তা ধীরে ধীরে মুছে যাবে?