১০৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি ইতিহাসের কত যে সন্ধিক্ষণের সাক্ষী ছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—তাঁর স্টেথোস্কোপ ছুঁয়েছে বহু কিংবদন্তিকে। আজও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর হাজার হাজার ছাত্রের কাছে তিনি ছিলেন চিরকালীন ‘স্যার’।

কিংবদন্তি ডা. মণি ছেত্রীর মৃত্যুতে ফিরে দেখা
শেষ আপডেট: 6 April 2026 00:37
দ্য ওয়াল: পূর্ব ভারতের চিকিৎসা জগতের এক মহীরুহের পতন। বছরের প্রথম কালবৈশাখীর মেঘলা আকাশ সাক্ষী রেখে বিদায় নিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস। রবিবার দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ প্লেসের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তথা পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডাঃ মণি কুমার ছেত্রী (Padmasree Dr Mani Chetri)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৬ বছর। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে (Dr Mani Chetri death) । ১৫ দিন আগে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছিলেন, চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও শেষরক্ষা হল না (Who was Dr Mani Chetri)।
পাহাড় থেকে প্রেসিডেন্সি: এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প
১৯২০ সালের ২৩ মে দার্জিলিংয়ের এক সাধারণ গোর্খা পরিবারে জন্ম মণি কুমারের। পাহাড়ের কোলে বড় হওয়া এই মেধাবী ছাত্রটির স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করার পর পাড়ি জমান বিদেশে। ১৯৫৬ সালে লন্ডন থেকে অর্জন করেন FRCP সম্মান, যা সেই যুগে ভারতীয় চিকিৎসকদের কাছে ছিল এক বিরল প্রাপ্তি।
পূর্ব ভারতের হৃদরোগ চিকিৎসার কারিগর
ষাটের দশকে যখন আধুনিক কার্ডিওলজি ভারতে সবে ডানা মেলছে, তখন এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে এই বিভাগের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ডাঃ মণি ছেত্রী। কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান থেকে শুরু করে এসএসকেএম-এর ডিরেক্টর এবং পরবর্তীকালে রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা (Director of Health Services)—প্রত্যেকটি পদে তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর বিচক্ষণতার স্বাক্ষর। বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও দীর্ঘকাল দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
ইতিহাসের সাক্ষী ও দূরদর্শী শিক্ষক
১০৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি ইতিহাসের কত যে সন্ধিক্ষণের সাক্ষী ছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—তাঁর স্টেথোস্কোপ ছুঁয়েছে বহু কিংবদন্তিকে। তবে তাঁর আসল পরিচয় ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে। আজও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর হাজার হাজার ছাত্রের কাছে তিনি ছিলেন চিরকালীন ‘স্যার’। শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর পড়ার টেবিলে সাজানো থাকত মেডিসিনের আধুনিক সব বই। ডায়েরিতে নিজের হাতে নোট নিতেন, খোঁজ রাখতেন আগামীর ‘জিন-থেরাপি’র।
শৃঙ্খলা ও দীর্ঘায়ুর গোপন মন্ত্র
কীভাবে ১০৬ বছর বয়সেও এমন সচল ছিলেন তিনি? ডাঃ ছেত্রী নিজেই বলতেন, “সবটাই শৃঙ্খলার খেলা।” ভোর ৪টেয় ঘুম থেকে ওঠা, নিয়ম করে হাঁটা আর সময় মেপে খাওয়া—এই ছিল তাঁর দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি। আর ছিল এক অমলিন হাসি। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনকে ভালোবাসলে জীবনও পাল্টা ভালোবাসা দেয়।
বিতর্ক ও জীবনের কঠিন অধ্যায়
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে বিতর্কের ছায়া ফেলেছিল ২০১১ সালের এএমআরআই (AMRI) অগ্নিকাণ্ড। হাসপাতালের শীর্ষ প্রশাসনে থাকার কারণে তাঁকেও আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে সেই কঠিন সময়েও তাঁর আদর্শ ও চিকিৎসা সত্তা ছিল অটুট।
এক শতাব্দী প্রাচীন এক বটবৃক্ষের পতন হল আজ। তাঁর প্রয়াণে বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তৈরি হল এক অপূরণীয় শূন্যতা। কিন্তু তাঁর শেখানো শৃঙ্খলা, মানবিকতা আর জ্ঞাননিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের চিকিৎসকদের কাছে চিরকাল ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে।