আত্মত্যাগের সিদ্ধান্ত ভারতের দাবার পরিসরে নতুন নয়। গুকেশের বাবা রাজনীকান্ত মনোমিতার মতো স্টেথোস্কোপ ছেড়ে হাতে তুলে নেন ঘুঁটি। প্রজ্ঞানন্দের মা নাগালক্ষ্মীও দুই দাবাড়ু সন্তানের জন্য নিজেকে এক প্রকার ‘উৎসর্গ’ করেছেন।

ময়াঙ্ক চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 29 March 2026 18:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গুয়াহাটি বিমানবন্দরে সেদিন উৎসবের আবহ। ঢোলের বাদ্যি, ফুলের মালা, মাথায় অসমের ঐতিহ্যবাহী ‘জাপি টুপি’। বছর ষোলোর ময়াঙ্ক চক্রবর্তী (Mayank Chakraborty) সবকিছু সামলাচ্ছেন হাসিমুখে। কিন্তু ক্যামেরা একটু সরতেই ধরা পড়ল অন্য ছবি। কয়েক পা পেছনে দাঁড়িয়ে তাঁর মা, মনোমিতা, অঝোরে কেঁদে চলেছেন! কান্নায় মিশে ভরপুর দুঃখ? সেটা নেই অবিশ্যি। বদলে রয়েছে বছরের পর বছরের অপেক্ষা, ত্যাগ আর স্বপ্নপূরণের আনন্দ।
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার
সম্প্রতি ভারতের ৯৪তম দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন ময়াঙ্ক। কিন্তু এই অর্জন নিছক গৌরবময় তালিকায় আরও এক নাম হয়ে ওঠা নয়, নজির স্থাপনের গৌরবও বটে! দেখতে গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার ষোলো বছরের কিশোর। অসম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড—কোনও রাজ্য থেকে এর আগে কেউ দাবার মঞ্চে এই উচ্চতায় পৌঁছননি।
গুয়াহাটির বিপুল, রাজকীয় অভ্যর্থনার ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। ডি গুকেশ (D Gukesh) ২০২৪ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে চেন্নাইয়ে ফেরার পর তাঁকে যেভাবে বরণ করা হয়েছিল, দিব্যা দেশমুখ (Divya Deshmukh) নাগপুরে নামা মাত্র যেভাবে অনুরাগীদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিলেন—এই বাঁধভাঙা 'অসমিয়া আপ্যায়ন' তাদের সঙ্গে একই সারিতে থাকবে।
সাফল্যে মিশে মায়ের আত্মত্যাগ
ময়াঙ্কের সাফল্যের আড়ালে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তাঁর মা, মনোমিতার। পেশায় চিকিৎসক, সরকারি হাসপাতালের স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ… ‘ছিলেন’। মানে অতীতে। ছেলের কেরিয়ার গড়তে মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দেন। নির্দ্বিধায়। পুরোপুরিভাবে হয়ে ওঠেন ময়াঙ্কের সঙ্গী। কখনও সফরে, কখনও অনুশীলনে। ছেলেকে এতটুকু চোখের আড়াল করেননি।
বস্তুত, এই আত্মত্যাগের সিদ্ধান্ত ভারতের দাবার পরিসরে নতুন নয়। গুকেশের বাবা রাজনীকান্ত মনোমিতার মতো স্টেথোস্কোপ ছেড়ে হাতে তুলে নেন ঘুঁটি। প্রজ্ঞানন্দের মা নাগালক্ষ্মীও দুই দাবাড়ু সন্তানের জন্য নিজেকে এক প্রকার ‘উৎসর্গ’ করেছেন। রাজনীকান্তকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—‘ছেলের জন্য কেরিয়ার ছাড়লেন, এ কি নিঃস্বার্থ ত্যাগ নয়?’ জবাবে তিনি শুধরে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিজের সন্তানের জন্য কাজ মোটেও ত্যাগ হতে পারে না… এটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে!’
পথ সহজ ছিল না
প্রান্তিক উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে অন্যবিধ খেলার মতোই দাবার শীর্ষে পৌঁছনো বেশ কঠিন। চেন্নাইয়ের মতো শহরে গ্র্যান্ডমাস্টার কোচ দরজায় দরাজায় মেলে। ময়াঙ্কের হাতে সে সুযোগ ছিল না। তার উপর আর্থিক চাপও দাঁত চেপে বসে। মনোমিতার কথায়, মাঝেমধ্যে দুর্বল প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে টুর্নামেন্ট খেলাতেন—শুধু পুরস্কারের টাকায় বড় টুর্নামেন্টের খরচ মেটাতে! কিন্তু এতে রেটিং পয়েন্ট কমার ঝুঁকি থাকত। আজ স্মৃতিচারণের ছলে তাঁর মন্তব্য, ‘জিতলেও রেটিং তো কমেছে। পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন ছিল!’
আপাতত স্বপ্নপূরণ হল। এবার সামনে কী? প্রশ্নটা বিমানবন্দরে নামামাত্র মনোমিতার কানে উড়ে আসে। দক্ষ ম্যানেজার যেমন দলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে আগলে রাখেন—সেই স্টাইলে এতটুকু ভড়কে না গিয়ে তিনি জবাব দেন, ‘অসমের মানুষের এই ভালোবাসায় আমরা অভিভূত। এই মুহূর্তের জন্যই এতদিন অপেক্ষা করছিলাম!’
আসল জবাব এড়ালেন মনোমিতা। বদলে যা বললেন, তা নিখাদ পেশাদার উত্তর। মাপা, বিচক্ষণ, পরিশীলিত! কে না জানে, চৌষট্টি খপের লড়াইয়ে সেরার সেরা হয়ে উঠতে গেলে যে কোনও দাবাড়ুকে এই তিনটি বক্সে টিক মারতেই হয়। শুধু হাতে ধরে নয়, মুখের কথাতেও ময়াঙ্ককে কয়েক কদম এগিয়ে দিচ্ছেন তাঁর মা মনোমিতা।