ইতিহাস বলছে, ১৮ জন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মধ্যে মাত্র ১০ জন নিজের শিরোপা রক্ষা করতে পেরেছেন। একবিংশ শতকে সে কৃতিত্ব আছে কেবল বিশ্বনাথন আনন্দ আর ম্যাগনাস কার্লসেনের। গুকেশ পারবেন?
.jpeg.webp)
গুকেশ
শেষ আপডেট: 9 November 2025 11:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২২ হাজার কিলোমিটার।
ঠিক এতটা পথ পেরিয়ে গোয়ায় বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিলেন দোম্মারাজু গুকেশ। কেন এই লম্বা গন্তব্য? তার কারণ, গ্রিসে ইউরোপিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে দু-দু’খানা সোনার মেডেল জেতার পর ভারতের তরুণ দাবাড়ু চলে যান সেন্ট লুইস৷ ক্লাচ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে৷ সামনে হিকারু নাকামুরা, ম্যাগনাস কার্লসেনের মতো পোড়খাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী। দুঃস্বপ্নের সেই শুরু৷ ইতিউতি প্রতিভার ঝলক দেখালেও অন্তিম স্থানে প্রতিযোগিতা শেষ৷ তার উপর কার্লসেনকে একবারও হারাতে না পারার যন্ত্রণা।
জ্বালা সহ্য করে নিউইয়র্ক থেকে সোজা গোয়া৷ বিশ্বকাপে নামতে৷ যে টুর্নামেন্টে খেলার কোনও প্রয়োজনই গুকেশের ছিল না। তিনি তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন—যাঁর জায়গা আগেই নির্দিষ্ট। অগ্নিপরীক্ষায় নামার প্রয়োজনই নেই! এই প্রতিযোগিতা থেকে তো কেবল তিনজন পৌঁছবেন প্রার্থীদের (Candidates) আসরে, যাঁরা শেষ পর্যন্ত গুকেশকেই চ্যালেঞ্জ করবেন ২০২৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে।
তবু গুকেশ এলেন। সেই গুকেশ, যিনি বিশ্বাস করেন, শিরোপা ধরে রাখতে চাইলে একটানা খেলতে হবে, চাপ নিতে হবে… প্রয়োজনে হারতেও হবে। এ যেন প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ডিং লিরেনের (Ding Liren) সম্পূর্ণ উলটো দর্শন। ডিং বিশ্বজয়ের পর থমকে যান। গুকেশ ঠিক বিপরীত—খেলে চলার তাড়নায় মগ্ন! কিন্তু সেই খিদেই তাঁকে ফের একবার খাদের কিনারে ঠেলে দিল।
২০২৫ সালের শুরুটা আশা জাগিয়েছিল। ওয়াইক আন জি–এর (Wijk aan Zee) টাটা স্টিল চেস টুর্নামেন্টে ট্রফি প্রায় জিতেই ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষ দিনে একটিমাত্র ভুল, আর সেই ভুলেরই ফায়দা নিয়ে শিরোপা হাতে তুলে নিলেন অর্জুন এরিগাইসি (Arjun Erigaisi)। টাইব্রেকে গুকেশের ব্যর্থতা ছিল একটা সংকেত—চাপের মুহূর্তে গতি হারাচ্ছেন তিনি। প্রজ্ঞানন্দের (R Praggnanandhaa) হাতে সেই ট্রফি উঠতেই প্রথমবার মুখে ধরা দিল উদ্বেগ।
এরপর ফ্রিস্টাইল টুর্নামেন্টগুলোয় (Freestyle events) অবস্থা আরও খারাপ। ওয়াইসেনহাউস, প্যারিস—সব জায়গায় তালগোল পাকিয়ে ফেললেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠল—‘এই কি সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন?’ ম্যাগনাস কার্লসেনের কটাক্ষে বিতর্ক, চাপ আরও বেড়ে গেল।
তবু একটা সান্ত্বনার জয় ছিল—নরওয়ে চেস (Norway Chess 2025)। সেখানে কার্লসেনকেই হারিয়েছিলেন গুকেশ… তাঁরই দেশে, তাঁরই অনুরাগীদের সামনে। কিন্তু এই সুদিন থাকল কই? গ্র্যান্ড সুইসে (Grand Swiss 2025) ৪১তম স্থানে শেষ করলেন। আর এবার বিশ্বকাপে তৃতীয় রাউন্ডেই বিদায়। ফ্রেডরিক সভানের (Frederik Svane) বিরুদ্ধে শেষ গেমে তাঁর কাছে ছিল সমতার সুযোগ—‘থ্রিফোল্ড রিপিটেশন’নিয়েই ড্র করা যেত। কিন্তু চাপে ঠান্ডা মাথা হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত আগ্রাসনে ভুল চাল। নিট ফল: নিজের হার নিজেই হার নিশ্চিত করলেন!
এই পরাজয় শুধু এক টুর্নামেন্টের ব্যর্থতা নয়, বরং ইঙ্গিত—গুকেশের মানসিক ভারসাম্য নড়ছে। চ্যাম্পিয়নের মুকুট কাঁধে থাকলে যে চাপ আসে, সেটা সামলানো কঠিন। আনন্দ পেরেছেন, কার্লসেন পেরেছেন। কিন্তু গুকেশ? অনেক বেশি ভঙ্গুর!
ইতিহাস বলছে, ১৮ জন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মধ্যে মাত্র ১০ জন নিজের শিরোপা রক্ষা করতে পেরেছেন। একবিংশ শতকে সে কৃতিত্ব আছে কেবল বিশ্বনাথন আনন্দ আর ম্যাগনাস কার্লসেনের। গুকেশ পারবেন? প্রশ্নটা এখন দাবার বোর্ড ছাড়িয়ে, মানসিক শক্তিবিচারের চৌহদ্দিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যর্থতা থেকে শিখতে চান। নিজের মুখেই বলেছেন তরুণ দক্ষিণী দাবাড়ু। ব্যর্থতার ২০২৫ হয়তো তাঁকে হাতেনাতে বুঝিয়ে দিল—শিরোপা জেতার কঠিন, কিন্তু তার চেয়েও শক্ত সেটাকে ধরে রাখা।