পরিবেশে দূষণের মাত্রা যে হারে বাড়ছে, তাতে ফুসফুসকে বাঁচানো দায়। পরিসংখ্যন বলছে, দিল্লিতে একদিন কাটানো মানে ২০টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি। কলকাতা বা চেন্নাইয়ের পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়;

শেষ আপডেট: 14 April 2026 20:44
ফুসফুস (Lung) খারাপ হচ্ছে, অথচ অনেক সময় রোগী তা টেরই পান না। আমরা দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার বার শ্বাস নিই। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখি এই অবিরাম প্রক্রিয়ার কথা? একেবারেই না। একমাত্র যখন সমস্যা শুরু হয়, একটু বাতাসের জন্য প্রাণ হাঁসফাঁস (Dyspnea) করে, তখনই আমরা ফুসফুসের গুরুত্ব বুঝি। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে শহরের বিষাক্ত বাতাসে ফুসফুসকে সুস্থ রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সামান্য পরিশ্রমেই কি হাঁপিয়ে যাচ্ছেন?
আজকাল অনেকেই অল্পে হাঁপিয়ে যান। দেখা যায়, দু-তিনটে সিঁড়ি ভাঙলেই জোরে জোরে শ্বাস (Difficulty in breathing) নিতে হচ্ছে। এর পিছনে ঠিক কী সমস্যা লুকিয়ে আছে? আসলে এটি ফুসফুসের সমস্যার পাশাপাশি আরও কিছু শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। যেমন— হার্টের সমস্যা থাকলে এমন হয়। আবার অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা থাকলে কিংবা হঠাৎ ওজন কমে গেলেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তাই এই কষ্টকে অবহেলা না করে কেন এমন হচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
দূষণ ও ফুসফুস: সুস্থ থাকা কতটা কঠিন?
পরিবেশে দূষণের মাত্রা যে হারে বাড়ছে, তাতে ফুসফুসকে বাঁচানো দায়। পরিসংখ্যন বলছে, দিল্লিতে একদিন কাটানো মানে ২০টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি। কলকাতা বা চেন্নাইয়ের পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়; এখানেও একদিনে ৫-১০টি সিগারেট খাওয়ার সমান বিষ ঢুকছে শরীরে। বাতাসের সূক্ষ্ম ধূলিকণা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা COPD ডেকে আনে। যারা ধূমপান করেন না, তাদের ক্ষেত্রেও ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ বা দূষিত পরিবেশ ১০-১৫ বছরের মধ্যে এই রোগ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে ভারতে প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ সিওপিডি রোগী জীবনে কখনও ধূমপান করেননি, স্রেফ বায়ুদূষণই তাদের এই রোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাতাসে থাকা নাইট্রাস অক্সাইড থেকে সর্দি-কাশি হয়। এছাড়া অত্যন্ত ক্ষুদ্র ‘ফাইন পার্টিকলস’ ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে রক্তে মিশে যায়। এটি ফুসফুসের অ্যালভিওলাই (Alveoli)-এর মারাত্মক ক্ষতি করে, যা থেকে ভবিষ্যতে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে হার্টের ওপরেও।
নাক ডাকা কি ফুসফুসের সমস্যার লক্ষণ?
একে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’। এই সমস্যায় শ্বাসনালীতে ফ্যাট জমে মেকানিক্যাল বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে রক্তে অক্সিজেনের অভাব ঘটে এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়ায় বারবার ঘুম ভেঙে যায়। নাক ডাকা এর অন্যতম বড় উপসর্গ। এর ফলে সকালে উঠে ক্লান্তি বা ঝিমুনি ভাব থাকে। চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপের পিছনেও অনেক সময় এই স্লিপ অ্যাপনিয়া দায়ী থাকে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জিম বা ব্যায়াম করেও হাঁফ ধরা: কেন এমন হয়?
অনেকে নিয়ম মেনে জিম বা এক্সারসাইজ করেও হাঁপিয়ে ওঠেন। আসলে ফিট থাকার জন্য শুধু ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়; দরকার সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি। আপনি রোজ ব্যায়াম করছেন কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা খাবারে অনিয়ম করছেন— তবে শরীরে সমস্যা বাড়বে এবং হাঁপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে যাবে।
ফুসফুসে জল জমা ও ইনফেকশন
শহরাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে অ্যালার্জি ও বায়ুদূষণের প্রভাবে শ্বাসকষ্ট, সাইনাস বা ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘদিনের কাশি থেকে অনেক সময় ব্রংকাইটিস বা অ্যাজমা জাঁকিয়ে বসে। এই সংক্রমণ ঠিকমতো না সারলে এক সময় ফুসফুসে জল জমতে শুরু করে। তাই যাঁদের এই ধরনের সমস্যা আছে, তাঁদের বছরে অন্তত একবার ‘লাং ফাংশন টেস্ট’ করা জরুরি। পাশাপাশি সময়মতো নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নিয়ে নেওয়া উচিত।
ফুসফুস ক্যানসারের উপসর্গ
ফুসফুস ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো লক্ষণ থাকে না। যখন ধরা পড়ে, ততক্ষণে রোগ অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সাবধান হতে হবে:
লাং ট্রান্সপ্লান্ট: শেষ কথা যখন অস্ত্রোপচার
আগে ধারণা ছিল ফুসফুস খারাপ হলে আর ফেরার পথ নেই। কিন্তু এখন চিকিৎসা উন্নত হয়েছে। ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি ফাইব্রোসিস বা ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজে ফুসফুস যখন ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকে এবং ৮০ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়ে, তখনই ট্রান্সপ্লান্টের কথা ভাবা হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, লাং ট্রান্সপ্লান্ট একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অন্তত ছয় মাস হাতে সময় নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসা প্রয়োজন। সঠিক সময়ে ডোনার পাওয়া গেলে এবং অস্ত্রোপচার সফল হলে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। এমন উদাহরণও আছে, যেখানে ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগী পাহাড়ে চড়ছেন বা অলিম্পিকেও অংশ নিচ্ছেন। তাই ভয় না পেয়ে সঠিক সময়ে সচেতন হওয়া এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করাই সুস্থ থাকার একমাত্র পথ।