পাবনার ‘ভাঙা বাড়ি’, যেখানে জন্ম হয়েছে সুচিত্রার, বেড়ে উঠেছেন, তা আজ দেশভাগের যন্ত্রণা সয়ে বিলয়ের অপেক্ষায়। ভেঙে পড়েছে দেয়াল, খসে পড়ছে পালেস্তারা। সরকার তবু উদাসীন।

সুচিত্রা সেন
শেষ আপডেট: 26 May 2025 19:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২১ মে সকালের ঘটনা। বাংলাদেশের পাবনার গভর্নমেন্ট এডওয়ার্ড কলেজের বিখ্যাত সুচিত্রা সেন মহিলা হলের নাম বদলে ফেলল কলেজ কর্তৃপক্ষ। খুলে নেওয়া হল ফলক। বসানো হল ঝাঁ-চকচকে নয়া নামাঙ্কন: ‘জুলাই ৩৬ স্টুডেন্ট ডরমেটরি’!
ছাত্রীনিবাসের এই নামবদল আসলে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতীক—এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। জুলাই অভ্যুত্থানের ‘আদর্শ’কে শুধু মৌখিক নয়, লিখিত আকারে জীবন্ত রাখতেই এমন পদক্ষেপ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার—এ নিয়ে কারও কোনও দ্বিমত নেই। প্রাক্তন প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পনেরো বছর বাদে মসনদচ্যুত করে মাত্র ৩৬ দিনেই ‘দিনবদল’—এই হিসেবকে গোটা গোটা অক্ষরে খোদাই করে দিতে চাইছে নতুন সরকার।
সেই সূত্রে ঝাপট দিয়ে উঠছে ভারত-বিরোধিতার হাওয়াও। বাংলাদেশের ভূমিকন্যা অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। বাঙালি। তাঁর ছায়াছবির গানে স্বপ্নমদির দুই বাংলা, কটাক্ষে বিবশ। মোহময়ী চাহনি, কেশসজ্জা, বেশভূষা, উচ্চারণ… কোনওকিছু কাঁটাতারের বাধা মানেনি। গঙ্গা, পদ্মার দুকূলে দোলা উঠেছে। পাবনা নিজের মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। আজ সেখানেই স্রেফ ভারতবিরোধিতার জিগিরে, হাসিনাকে নয়া দিল্লির সমর্থন, নয়া সরকারকে অপছন্দের জেরে ‘ভারতীয় অভিনেত্রী’ তকমা দিয়ে সুচিত্রার নামাঙ্কিত ফলক তুলে ফেলা হবে? বদলে দেওয়া হবে ছাত্রীনিবাসের নাম?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সমাজ-ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন যারা, তাঁরা অবশ্য এডওয়ার্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে নারাজ। তাঁদের চোখে এটা আঘাত। তবে আঘাতের উলটো প্রান্তে ‘ভারত’ নামক কোনও ভূখণ্ড দাঁড়িয়ে নেই। দাঁড়িয়ে রয়েছে যৌথ স্মৃতি আর সেই স্মৃতিকে লালন করার ঐতিহ্য!
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সেই ঐতিহ্যের মূলে আঘাত হানতে চাইছে। ইতিহাস—সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘সাম্প্রতিক’—তাকে হাতিয়ার করে বিগত দিনের যাবতীয় চিহ্ন, সংকেত, পরিচিতিকে মুছে দিতে বদ্ধপরিকর। রুদ্ধ হোক বহুত্বের স্বর। যে স্বর এতদিন ধরে জাতীয়তাবাদের মিথকে গড়ে তুলেছে, নিশ্চিহ্ন হোক তা-ও—ফলকের নাম বদলের আড়ালে শাসকের এমন হিংস্র থাবা দেখতে পাচ্ছেন অনেকেই।
আর এই কারণেই পাবনার ‘ভাঙা বাড়ি’, যেখানে জন্ম হয়েছে সুচিত্রার, বেড়ে উঠেছেন, তা আজ দেশভাগের যন্ত্রণা সয়ে বিলয়ের অপেক্ষায়। ভেঙে পড়েছে দেয়াল, খসে পড়ছে পালেস্তারা। সরকার তবু উদাসীন।
এই ঔদাসীন্য কি নেহাতই নির্লিপ্তি? ইতিহাস-বিস্মৃতি? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আড়ালে রয়েছে কূট অভিসন্ধি। দেশভাগের আগে এক উদ্বাস্তু কিশোরী, কালে-কালান্তরে রুপোলি পর্দার মহানায়িকা হয়ে উঠল, ধর্মপরিচয়ে যে ‘হিন্দু’, তার অস্তিত্ব ধূলিস্যাত করতে উঠেপড়ে লেগেছে মুসলিম-প্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ!
সরকারি বয়ান অবশ্য ইতিহাসের এই অন্তর্ঘাত, জটিল দুরভিসন্ধি মেনে নিতে নারাজ। এডওয়ার্ড কলেজের প্রিন্সিপালের বক্তব্যকে এর প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। যিনি পিঠ বাঁচাতে ঘোষণা করেছেন: বাংলাদেশের কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নামে রাখা হয়নি, হবে না। ইতিহাসে যার নজির নেই, তা ভবিষ্যতের দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
কিন্তু সুচিত্রা সেন কি শুধুই অভিনেত্রী? পাবনার জনতার গর্বের ভূমিকন্যা নন? ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’ গড়ে উঠেছে যেখানে, সেখানকার জনতা এত সহজে এই নাম পরিবর্তনের নিহিত চক্রান্ত মেনে নেন কী করে?
প্রতিবাদ যে ওঠেনি, তা নয়। পরিষদের সেক্রেটারি নরেশচন্দ্র মধু দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন—‘সুচিত্রা সেন কোনও রাজনৈতিক প্রতীক নন। তিনি আমাদের প্রতীক।‘ রাষ্ট্রের স্মৃতিভ্রংশের সঙ্গে হয়তো এভাবেই নাগরিকের যৌথ স্মৃতির সঙ্গে সংঘাত বাধে! সুচিত্রাকে মুছে দিতে চাইছে যে সরকার, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের চিন্তা ও চেতনাকে সংখ্যাগুরু মুসলিম আধিপত্যবাদের আঙ্গিকে নয়া চেহারা দিতে চাইছে।
সাংবাদিক ফজলুর রহমানের মতো কেউ কেউ এই দুরভিসন্ধির আঁচ পেয়েছেন। পাবনার বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই প্রতিবাদে নামার কথা ভাবছেন।
‘সুচিত্রা সেনকে প্রতিষ্ঠান মুছে ফেলতে পারে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তাঁর নাম সুমুদ্রিত।‘—ঘোষণাটা দেয়ালেই লিখে রাখতে চাইছেন পাবনাবাসী!