বিকাশ রায়ের সবথেকে পছন্দের নায়িকা ছিলেন সুচিত্রা সেন। মণীশের তো দেবযানীর প্রতি প্রেম থাকবেই।

বিকাশ রায় ও সুচিত্রা সেন
শেষ আপডেট: 16 May 2025 17:34
বিকাশ রায়, যাঁকে বাংলা ছবির 'ডার্ক হর্স' বলা হত। চিরাচরিত নায়কোচিত দর্শনধারী না হয়েও তিনি মানুষের মনে ছাপ রেখে যেতেন। তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত অভিনেতা সে সময় খুব কম ছিল অভিনয় জগতে। যে শিক্ষার ছাপ তাঁর ঝকঝকে অভিনয়ে পড়ত। মঞ্চ,বেতার,পর্দা তিন মাধ্যমেই বিকাশ রায় ছিলেন সফল অভিনেতা। তবে অভিনেতার পাশাপাশি বিকাশ রায়ের পরিচালক সত্ত্বাটিও উল্লেখযোগ্য। একাধিক কালজয়ী ছবি তিনি পরিচালনা করেছিলেন। 'মরুতীর্থ হিংলাজ', ',সূর্যমুখী', 'বসন্ত বাহার', 'কেরি সাহেবের মুন্সি','রাজা সাজা' উল্লেখযোগ্য।
বিকাশ রায়ের সবথেকে পছন্দের নায়িকা ছিলেন সুচিত্রা সেন। মণীশের তো দেবযানীর প্রতি প্রেম থাকবেই। সে কথা অকপটে বলতেও কখনও দ্বিধা করেননি বিকাশ রায়। তাঁর সুচিত্রা প্রীতি বিকাশের স্ত্রীও জানতেন। কিন্তু সেই ভাল লাগা কখনও মাত্রা ছাড়ায়নি। একাধিক ছবি একসঙ্গে করেছেন সুচিত্রা সেন ও বিকাশ রায়। কিন্তু বিকাশ রায় পরিচালিত ছবিতে কখনও কাজ করেননি শ্রীমতী সেন। কেন দু'জনের একসঙ্গে কাজ হল না?

বিকাশ রায় ভীষণ ভাবে চেয়েছিলেন তাঁর পরিচালিত ছবিতে রমা ওরফে সুচিত্রা কাজ করুন। যেমন বিকাশ রায় পরিচালিত দ্বিতীয় ছবি 'সূর্যমূখী'তে নায়িকা হওয়ার অফার বিকাশ প্রথম দিয়েছিলেন সুচিত্রাকেই। নায়িকা প্রধান ছবি ছিল 'সূর্যমুখী'। কিন্তু বিকাশ রায়ের প্রস্তাবে শেষ অবধি রাজি হননি মিসেস সেন। সুচিত্রার অতিরিক্ত পারিশ্রমিকে রাজি হতে পারেননি বিকাশ রায়। তখন সুচিত্রাই ছিলেন টালিগঞ্জ পাড়ার সর্বোচ্চ চাহিদার নায়িকা। বন্ধু সহকর্মী বিকাশদার জন্য টাকার অঙ্ক কমাননি সুচিত্রা।
তবে 'সূর্যমুখী' ছবির চরিত্রটিও সুচিত্রার পছন্দের ছিল না। নায়িকা শেষ অবধি হলেন সন্ধ্যারাণী। সন্ধ্যারাণী যেন এ ছবিতে সতীত্বের পরীক্ষার দিচ্ছেন। সতী বউয়ের সব শ্রী যে মেয়ের মধ্যে ছিল সেই মেয়ের ফুলশয্যার রাতেই স্বামী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। পরে তাঁকে স্বামী ত্যাগ করেন। একা মেয়ের একলা যৌবনের সুযোগ নেয় তাঁর দেওর। যে চরিত্রে বিকাশ রায়। বিকাশ এখানে খলনায়ক চরিত্রে। সন্ধ্যারাণীর স্বামীর ভূমিকায় অভি ভট্টাচার্য। এছাড়াও ছিলেন ছবি বিশ্বাস, চন্দ্রাবতী দেবী, ভারতী দেবী, মঞ্জু দে প্রমুখ।
ছবির শেষে ছিল স্বামী অভি ভট্টাচার্য অপরাধবোধ থেকে স্ত্রী সন্ধ্যারাণীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছেন। তৎকালীন ফিল্ম সমালোচকরা এতে ক্ষুন্ন হয়ে ছবির রিভিউ লিখেছিলেন "একজন পুরুষ কেন নারীর পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইবেন? এটা কী করে দেখালেন পরিচালক বিকাশ রায়!" পাঁচের দশকের সমাজ চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিক। কিন্তু বিকাশ রায় এমন মুক্তমনা ভাবেই গড়েছিলেন অভি ভট্টাচার্যর চরিত্রটিকে।

'সূর্যমুখী' দুঃখের গল্প হলেও সুপারহিট করে। তাঁর বড় কারণ ছবির গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে এই ছবিতেই সন্ধ্যারাণীর লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গান 'আকাশের অস্তরাগে আমারই স্বপ্ন জাগে'। ছবির শুরু এ গান দিয়েই। বিকাশ রায়ের পরিচালনায় প্রথম সুপারহিট গান এল হেমন্ত সুরের হাত ধরেই। হেমন্ত কন্ঠে 'ও বাঁশিতে ডাকে সে শুনেছি যে আজ'। পাঁচের দশকের সীতা রূপে 'সূর্যমুখী' সন্ধ্যারাণী সবার মন জিতে নেন।

এই ধরনের চরিত্রে সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্ব কিছুটা হলেও মানানসই ছিলেন না। তাই হয়তো আরও করেননি শ্রীমতী সেন। তবে এরপরেও কয়েক বার সুচিত্রাকে নিজের ছবির জন্য অফার দেন বিকাশ রায়। তখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। বরং সুচিত্রার পরিবর্তে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বিকাশ রায়ের অনুরোধ রেখে, নিজের জীবনের সেরা কয়েকটি চরিত্র পেয়েছিলেন। 'মরুতীর্থ হিংলাজ' ছবির কুন্তী কে কি ভোলা যায়? 'বসন্ত বাহার' ছবিতে সাবিত্রীর লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ রাগাশ্রয়ী গান 'বাঁধো ঝুলনা'...কে ভুলতে পারে!

উত্তম-সুচিত্রাকেও জুটি করে ছবি করতে চেয়েছিলেন বিকাশ রায়। উত্তমকে বেশ কয়েকটি ছবিতে পেলেও, সুচিত্রাকে কখনও পেলেন না বিকাশ রায়। বিকাশ রায়ের প্রযোজকরাও তেমন ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন না। বন্ধু অসীম পাল তাঁর বেশিরভাগ ছবির প্রযোজক। বড় প্রযোজক না পাওয়াতে মিসেস সেনকেও পেলেন না পরিচালক বিকাশ রায়।