গত কয়েক বছর ধরেই কলকাতার বহু পুজো প্যান্ডেলই আর নিছক প্যান্ডেল হয়ে থাকেনি। নানা শিল্পভাবনা নিয়ে আলোচনার পরিসর তৈরি করেছে বহু প্যান্ডেলই।

কলকাতার পুজোয় প্যালেস্তাইন। শিল্পী প্রদীপ দাস।
শেষ আপডেট: 18 September 2025 16:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার এক পুজো প্যান্ডেলে লেখা ফ্রি প্যালেস্টইন! কিন্তু হঠাৎ কলকাতার পুজোতে প্যালেস্তাইন কেন? দুর্গা পুজোর উৎসবে প্যালেস্তাইনের প্রসঙ্গ কি আদৌ প্রাসঙ্গিক!
বস্তুত, গত কয়েক বছর ধরেই কলকাতার বহু পুজো প্যান্ডেলই আর নিছক প্যান্ডেল হয়ে থাকেনি। নানা শিল্পভাবনা নিয়ে আলোচনার পরিসর তৈরি করেছে বহু প্যান্ডেলই। এই ‘অন্যরকম’ ভাবনার কাজে যাঁরা ব্রতী হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম শিল্পী প্রদীপ দাস। কলকাতার বেহালা অঞ্চলের শিল্পী সংগঠন ‘চাঁদের হাট’ কালেক্টিভের অন্যতম সদস্য প্রদীপ কলকাতার নানা প্যান্ডেলে ইতিমধ্যেই দেশভাগ ও তার যন্ত্রণা নিয়ে একাধিক কাজ করেছেন।
কলকাতা শহরের ছিন্নমূল মানুষদের যন্ত্রণার আর্কাইভ নিয়ে নাকতলা উদয়ন সংঘে তাঁর প্যান্ডেল গড়েছিলেন প্রদীপ। সেই ‘হৃদয়পুর’ প্যান্ডেল বহুলভাবে প্রশংসিত হয়। সমাজের প্রান্তিক মানুষদের ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে শিল্পী বারবার প্রশ্ন করেছেন প্রাতিষ্ঠানিকতাকে। প্রশ্ন করেছেন সমকালীন রাজনীতিকে। এবারেও তার অন্যথা হয়নি।
তাই তাঁর হাত ধরেই এবছর বেহালা ফ্রেন্ডস ক্লাবের পুজোয় উঠে এল যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। প্যান্ডেলে ঢোকার মুখেই এক পাথরের চাঁইয়ের উপর বড় করে লেখা ‘Free Palestine’ আর অপরদিকে কোকাকোলার ফন্টে লেখা ‘Genocide’ অর্থাৎ গণহত্যা।
এই কোকাকোলার ফন্টের মধ্যে দিয়ে শিল্পী ঠিক কীসের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন? এর উত্তরে প্রদীপ জানান, যুদ্ধের রাজনীতিতে কিভাবে বিভিন্ন কোম্পানি অর্থনৈতিক মদত যুগিয়ে মুনাফালাভের আশায় থাকে, তারই ইঙ্গিত দর্শকরা এই কাজের মধ্যে দিয়ে খুঁজে পাবেন।
তিনি আরও জানান, এই প্যান্ডেল শুধুই প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ বা গাজার হাহাকারের কথা বলছে না। এই প্যান্ডেল মনে করিয়ে দিতে চাইছে, যুদ্ধ যেখানে যেখানেই হয়েছে, সেখানেই একদল সুবিধালোভী মুখিয়ে থাকে সম্পদ লুঠের আশায়। আমাদের দেশে যখন ব্রিটিশ শাসন ছিল তারাও নানাভাবে সম্পদলুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে এই দেশকে দুর্ভিক্ষের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। আজ গাজায় যেভাবে বাটি হাতে শিশুদের দেখা যাচ্ছে, একসময় এদেশেও আকালের সময়েও একই দৃশ্য দেখা গেছে।
যুদ্ধ মানে একদিকে যেমন মৃত্যু, হাহাকার, ক্ষতবিক্ষত প্রজন্ম, তেমনই যুদ্ধের মধ্যে গৌরব খুঁজে নেওয়ার আখ্যানও নানা সময়ে মিলেছে প্রাচীন কাল থেকে। বরং বলা যায়, যুদ্ধ নিয়ে উল্লাস ইতিহাসের এক ভীষণই প্রাসঙ্গিক বিষয়। তাই তো দেশ-বিদেশের ঐতিহাসিক চিত্রকলায় বিজয়ী ও বিধ্বস্ত সৈনিকের ছবির পিছনে জ্বলে থাকা যুদ্ধের আগুনকে রোম্যান্টিসাইজ করার উদাহরণও অজস্র।
সেই ‘গৌরবের’ অধ্যায়ে ছেদ ঘটতে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। মানুষ বুঝতে শুরু করে যুদ্ধ কোনও গৌরবের ফসল নয়, বরং যুদ্ধের মধ্যে আছে জিঘাংসা চরিতার্থ করার কলঙ্ক, ভোগবাদী দুনিয়ার থাবা ও কর্পোরেট রাজনীতির নিঃশব্দ হুঙ্কার।
পৃথিবীর যে দেশে যে কোন সময়ে যখনই যুদ্ধ বেধেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে অতিষ্ঠ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি যেমন নাগরিক জীবনকে কোণঠাসা করেছে, তেমন একদল মানুষকে বাধ্য করেছে ছিন্নমূল হতে। ইতিহাসে এমন কোনও যুদ্ধের উদাহরণ বোধহয় নেই, যা শেষমেশ মন্বন্তরে পর্যবসিত হয়নি। তা আমাদের দেশের ৪৬ হোক, বা পড়শি দেশের ৭১। বা হোক না কেন সুদূর প্যালেস্টাইনের ছিন্নভিন্ন অবস্থা।
সব মিলিয়ে, প্রদীপের চিন্তাতেও কোথাও যেন এক হয়ে যাচ্ছে দেশভাগের যন্ত্রণা, দুর্ভিক্ষের হাহাকার এবং গাজায় বিধ্বস্ত কোন এক শিশুর ক্ষুধাক্রান্ত কান্না। যুদ্ধের সর্বগ্রাসী ভয়াবহতাকে তুলে ধরে, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে আসা দর্শকদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে চাইলেন প্রদীপ।
এই ব্যতিক্রমী প্যান্ডেল নির্মাণেও রয়েছে অভিনবত্ব। তাই শুধু লোহা লক্কর, কাঠ সিমেন্টেই সীমাবদ্ধ না থেকে, প্যান্ডেলের আবহ সঙ্গীতে মিশে গেছে প্যালেস্তাইনের এক কবি, হাসানের কবিতা ও সেখানকার সুর। রাফার বাসিন্দা হাসান এখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে আল মাওয়াসির রিফিউজি ক্যাম্পে আছেন। প্যালেস্টাইনের থিয়েটার কর্মী রাইদা ঘাজালের কণ্ঠে হাসানের একটি কবিতাও রয়েছে এই প্যান্ডেলের আবহে। সেই সব নিয়ে যে আবহ সঙ্গীত নির্মাণ করেছেন দীপময় দাস, তাতে মিলেমিশে যাচ্ছে কিশোর কবি সুকান্তের লেখাও।
কারণ ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পৃথিবীর সব প্রান্তেই পূর্ণিমা চাঁদ ঝলসানো রুটি হয়েই ধরা পড়ে।