দ্য ওয়াল-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সব প্রশ্নই সোজা ব্যাটে খেললেন কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম

ফিরহাদ হাকিম
শেষ আপডেট: 24 December 2025 21:03
'সংখ্যালঘুরা একদিন সংখ্যাগুরু হবে' বা 'মিনি পাকিস্তান', ফিরহাদ হাকিম কি সত্যিই এমন বিতর্কিত মন্তব্য কখনও করেননি? কেন বারবার তাঁর বিরুদ্ধে এই মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে? ঠিক কী বলেছিলেন তিনি? হুমায়ুন কবীরকে (Himayun Kabir) নিয়েও বা তাঁরা কী ভাবছেন? দ্য ওয়াল-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সব প্রশ্নই সোজা ব্যাটে খেললেন কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)।
সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হওয়ার আগেই ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) জানতে চান প্রশ্ন সব তৈরি করে এনেছেন তো? উত্তর তাঁকে জানাই - হ্যাঁ প্রশ্ন তো রেডি, তবে আপনি কতগুলি প্রশ্নের উত্তর দেবেন আর কতগুলি এড়িয়ে যাবেন সেটাই ভাবছি। ববি হাকিম (সাধারণ মানুষের কাছে এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত) সোজাসুজি জানিয়ে দিলেন, কোনও অসুবিধা নেই, আপনি আমার গুণগান করতে তো আসেননি, সব প্রশ্নই করুন।
গত বছর ঠিক এই সময়েই অর্থাৎ ২০২৪-এর ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে ফিরহাদ হাকিম বলেছিলেন 'আমরা এখন ৩৩ শতাংশ। একদিন আমাদের অওকাত ও রুতওয়া বাড়বে। ইনশাআল্লাহ, আমরা একদিন সংখ্যাগুরু হব।' কেন এমন বলেছিলেন?
প্রথম প্রশ্নেই ববি হাকিম বলেন, 'আমার মন্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছে সংবাদমাধ্যম। আমি বলিনি যে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হবে। আমি শুধু বলেছিলাম যারা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়, তাঁরা সামনে আসুক। তাঁদের উন্নয়ন হোক। আর এটা তো অস্বীকার করার জায়গা নেই যে মুসলিম সমাজের বিশেষ করে ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত যারা, তারা সত্যিই তো আর্থিকভাবে সমাজে একদম পিছিয়ে পড়া শ্রেণি হয়ে রয়েছে। তেমনই জনজাতিও পিছিয়ে পড়ে রয়েছেন। আমি এঁদেরকেই সামনে তুলে আনার কথা বলেছি।'
তাঁর করা 'মিনি পাকিস্তান' মন্তব্য নিয়ে একেবারেই ক্রোধের সঙ্গে ববি হাকিম বলেন, "আমি কখনও এমন কথা বলিনি। মিনি পাকিস্তান এই শব্দ ব্যবহার করেছি যদি কেউ প্রমাণ সহ দেখিয়ে দিতে পারে তাহলে শুধু মন্ত্রিত্ব বা মেয়র পদ নয়, আমি রাজনীতিই ছেড়ে দেব।" মন্তব্যের প্রেক্ষিত বোঝানোর জন্য ববি হাকিম যোগ করেন, "একটা পাকিস্তানের কাগজে নাকি লেখা হয়েছিল আমি এমন মন্তব্য করেছি। পাকিস্তান প্রীতি বিজেপির আছে। আর আমি মুসলমান বলে আমাকে পাকিস্তানের ছাপ মেরে একটা কমিউনাল কার্ড খেলার চেষ্টা।" এই প্রসঙ্গেই তিনি পরিষ্কার বলেন, "ভারতের শত্রু যে, সে আমারও শত্রু। পাকিস্তান যতদিন ভারতের শত্রু থাকবে, সে আমাদেরও শত্রু থাকবে।" মনে করিয়ে দিলেন, যদি কেউ দেখাতে পারে এমন 'বাইট' আমি দিয়েছি, তাহলে রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়াব।
সাসপেন্ডেড ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর কি সত্যিই তৃণমূলের মাথার ব্যাথা নয়? বিশেষ করে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কবীরের নিজের জেলা মুর্শিদাবাদ বা মালদহে কোনও এফেক্ট ফেলতে পারবে না তার নতুন দল 'জনতা উন্নয়ন পার্টি'?
এই প্রশ্নে অবশ্য হুমায়ুন কবীরকে সরাসরি বিজেপির এজেন্ট হিসাবেই দেগে দিলেন ববি হাকিম। উল্টে তাঁর প্রশ্ন, "মুর্শিদাবাদ মালদহের মানুষ কি কিছুই বোঝেন না? সবাই জানে মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেলে বিজেপি এখানে আসবে। এটাই ওদের(বিজেপির) অঙ্ক। আর এই অঙ্কের মোহরা হচ্ছেন হুমায়ুন কবীর, যাকে ওরা ব্যবহার করছে।"
ফিরহাদের সংযোজন, ''মুসলিম সমাজ ১০০ শতাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছিল, সেটা আগের নির্বাচনগুলিতেই প্রমাণিত।'' এটা মনে করিয়ে দিয়ে ববি হাকিম যোগ করলেন, তৃণমূল কী এতটাই বোকা যে সেই ভোট ভাগ করবে!
তৃণমূলের কেউ কখনও কোনও দুর্নীতি করেনি? এই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য দুর্নীতির দায় ব্যক্তিবিশেষের উপরেই ঠেলে দিলেন ফিরহাদ হাকিম। তাঁর মন্তব্য, "শিয়ালদহ স্টেশনে একটা ঢিল ছুঁড়লে যার মাথায় পড়বে সে তৃণমূল। এখন কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতি করে তার দায় কেন দলের উপরে পড়বে?"
যোগ করলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস আজ পর্যন্ত অসৎ পথে একটা নয়া পয়সা কারও কাছ থেকে নেয়নি। সাধারণ মানুষের ডোনেশনের টাকায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হয়েছে। যে দলের নেত্রী নিজে সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন একটা পয়সাও নেন না, তাঁর দলের কেউ এমন(দুর্নীতি/তোলাবাজি) কিছু করবে, এমনটা আমি বিশ্বাস করি না।"
SIR-এর বিরোধিতা করা প্রসঙ্গে অবশ্য ববি হাকিম সরাসরিই জানিয়ে দিলেন গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যই তাঁরা এর বিরোধিতা করছেন। যেভাবে মহারাষ্ট্র বা অন্যান্য রাজ্যে বিজেপিকে জেতানোর জন্য কমিশন (নির্বাচন কমিশন) কাজ করছে, এখানেও সেটা করতে চাইছে। তাই বিরোধিতা।
যে অরূপ বিশ্বাসকে (Aroop Biswas) নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতি তোলপাড় হয়েছে, যে অরূপ বিশ্বাস ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন, যে কারণে বাংলার বদনাম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই মেসি কাণ্ডে অবশ্য ফিরহাদ হাকিম 'খুলে আম' বন্ধুর পাশেই দাঁড়ালেন।
অরূপ বিশ্বাস প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, "আমি বিশ্বাস করি অরূপ কোনও অন্যায় করেনি। হ্যাঁ এটা ঠিক যে সেদিন মাঠে উপস্থিত অনেকেই মেসিকে দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কিন্তু সেদিন তো কেউ মারা যাননি। তাও অরূপ পদত্যাগ করেছে।"
এরপরেই বিজেপি শাসিত রাজ্যের প্রসঙ্গ তুলে অরূপ বিশ্বাসকে ডিফেন্ড করে 'বন্ধু' ববির বক্তব্য, "কই মোরবী (গুজরাত) ব্রিজ দুর্ঘটনার পর তো কেউ পদত্যাগ করেনি। হাথরসের (উত্তরপ্রদেশ) ঘটনার পরেও তো কেউ পদত্যাগ করেনি!" সবশেষে ফের একবার রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরার আত্মবিশ্বাস রেখেই তিনি শেষ করেন সাক্ষাৎকার পর্ব।