সরকারি গাড়ি ছেড়ে বাস-ট্রেনে যাতায়াত! সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতেন প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়। পড়ুন এক আদর্শবাদী নেতার অজানা ইতিহাস।

প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 14 April 2026 19:27
বিকেল সাড়ে পাঁচটা-ছ’টা হবে। ডালহৌসি স্কোয়ারে টেলিফোন ভবনের উল্টো দিকের গলি দিয়ে ভদ্রলোক ধীর পায়ে হাঁটছেন। অফিস ফেরত যাত্রিবোঝাই বাস-ট্রামে অবরুদ্ধ রাস্তা। ঘরমুখী হাজার মানুষের ভিড়ে ফুটপাথে পা ফেলার জো নেই। পথচলতি একজন পাশে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে চেনা চেনা লাগছে!’
পথেঘাটে, ট্রেনে-বাসে, অনুষ্ঠান বাড়িতে, সিনেমা বা থিয়েটার হলের লাইনে, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড কিংবা শহিদ মিনারের ভিড়ে- চেনা চেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঝালিয়ে নেওয়া তখনও চালু সংস্কৃতি। যাঁর উদ্দেশে কথাটা বলা তিনি জবাবে বললেন, ‘ও আচ্ছা, হবে হয়তো। কোথাও নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে আমাদের। তা আপনার পরিচয়?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার পরিচয় পরে বলছি। আপনি স্যার মন্ত্রী সুবোধ ব্যানার্জি (Subodh Banerjee) না?’ জবাব এল, ‘সে হবে হয়তো। আপনার তাতে কী এল গেল?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘স্যার, আপনি হেঁটে হেঁটে কোথায় চললেন? আপনার গাড়ি কই? মন্ত্রীদের তো শুনেছি চব্বিশ ঘণ্টা সরকারি গাড়ি পাওয়ার কথা।’ জবাব এল, ‘আপনার পরিচয়টা দিলেন না তো?’ কৌতূহলী ভদ্রলোক জানালেন, তিনি ডালহৌসিতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। অফিস শেষ করে বেলেঘাটার বাড়িতে ফিরছেন। সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বললেন, ‘বাহ! তবে তো ভালই হল। চলুন এক সঙ্গে খানিকটা হাঁটা যাক।’
ভদ্রলোক ফের গাড়ির প্রসঙ্গ তুলতে সুবোধবাবু বললেন, ‘আচ্ছা, কোম্পানি যদি আপনাকে এখন ছুটি না দিয়ে অফিসে থাকতে বলত, তাতে আপনার মনের অবস্থা কেমন হত ? সরকারি গাড়ির চালকেরও তেমনই হওয়ার কথা। এখান থেকে আমাদের পার্টি অফিস হাঁটা পথ। তাই, চালককে বাড়ি চলে যেতে বলেছি।’
এসইউসিআইয়ের (অধুনা এসইউসিআই-সি) (SUCI) বরেণ্য নেতা সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটা সময়ে বাংলার মানুষ ‘ঘেরাও মন্ত্রী’ বলে জানত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সংবাদপত্র তাঁকে বাংলার শিল্পের দুর্দশার জন্য কাঠগড়ায় তোলে। কোটি কোটি শব্দ খরচ হয়েছিল কর্মচারী আন্দোলনের এই নেতার মুণ্ডপাত করতে। তিনি ছিলেন প্রথম যুক্তফ্রন্ট (United Front) সরকারের শ্রমমন্ত্রী (Labor Minister)। শিক্ষকতা এবং ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে আসা সুবোধবাবুর শ্রমমন্ত্রী হিসাবে স্পষ্ট অবস্থান ছিল শ্রমিক-মালিক বিরোধে সরকার থাকবে শ্রমিকের পক্ষে।
বাংলায় ১ মে অর্থাৎ মে ডে-র সরকারি ছুটি ঘোষণার পিছনে সুবোধবাবুর অবদান ছিল অগ্রগণ্য। সেবার মে দিবসে আকাশবাণী শ্রমমন্ত্রীর ভাষণের খসড়ায় চোখ বুলিয়ে তার কিছু অংশ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। সুবোধবাবু তাতে কর্ণপাত না করে সেই ভাষণ শহিদ মিনারের সভায় গিয়ে পাঠ করেন।
ভাষণের একটি অংশে ছিল— ‘পুলিশকে এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে নিয়ম ও শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে যেন দমন না করে। পুলিশ যে শুধু এইসব আন্দোলনকে দমন করবে না তাই নয়, পক্ষান্তরে মালিক ও সমাজ বিরোধী শক্তির অন্যায় আক্রমণ হতে এই সব আন্দোলনগুলিকে রক্ষাও তারা করবে।’
সুবোধবাবু আরও বলেছিলেন, ‘ন্যায়সঙ্গত কথাটার অর্থ কী তা বোঝা দরকার। এথিকস অর্থাৎ ন্যায়নীতির ছাত্র মাত্রই জানেন যে, ন্যায়সঙ্গত হতে হলে সবসময়েই যে তাকে প্রচলিত আইনসঙ্গত হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থায় এমন বহু আইনসঙ্গত জিনিস থাকে যাকে ন্যায়সঙ্গত বলা চলে না। যেমন, শ্রমিক ছাঁটাই করার অধিকার বর্তমান সমাজে মালিকের আছে। এই আইনকে আইনসঙ্গত বলে স্বীকার করলেও ন্যায়সঙ্গত বলে স্বীকার করতে সৎ মানুষের আপত্তি থাকতে পারে। সেই রকম যা বেআইনি তাই ন্যায়সঙ্গত নয় এমন কথাও বলা যায় না। সুতরাং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করার দরকার আজ দেখা দিয়েছে। আমাদের সমাজে আজ সবচেয়ে যা দরকার তা হল নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন দৃষ্টিকোণ, যাতে করে আমাদের দেশের মেহনতি মানুষ প্রকৃত সামাজিক বিচার পায়।’
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার বেশ কয়েক বছর পর বিবিসি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। সেই সাক্ষাৎকারে সুবোধবাবুর একতরফা শ্রমিকের পক্ষ নেওয়া প্রসঙ্গে জ্যোতিবাবু মস্ত বড় ভুল বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বাংলার শ্রমিক আন্দোলনে ‘ঘেরাও’ শব্দটা তখনই চালু হয়। ক্রমে বহুল ব্যবহারে ইংরাজি ডিকশনারিতেও শব্দটি স্থান পায়। শ্রমিক কর্মচারীর অধিকার নিয়ে সুবোধবাবু এতটাই সচেতন থাকতেন যে, বিকেলের পর সরকারি কাজ না থাকলে সরকারি গাড়ি নিতেন না। যাতে চালকরা একটু আগে বাড়ি ফিরতে পারেন। ব্যক্তিগত এবং পার্টির কাজে গাড়ি নেওয়ার বালাই ছিল না। মাঝেমধ্য বাড়ি যেতেন বাসে বা লোকাল ট্রেনে চেপে।
এক প্রবীণ সাংবাদিক ক’দিন আগে বলছিলেন, ‘স্টেশনটা ঠিক মনে নেই, অফিসের কাজ সেরে কলকাতা ফিরব বলে রাতের ট্রেনের সাধারণ স্লিপার কোচে উঠেছি। দেখি একটি বার্থে সুবোধবাবু হাত দু’টোকে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে আছেন। তিনি তখন রাজ্যের মন্ত্রী। দলের কাজে কোথাও গিয়েছিলেন। চাইলেই ফার্স্ট ক্লাস কোচে আরামে ঘুমিয়ে ফিরতে পারতেন। কিন্তু ওই যে দলের কাজে গিয়েছেন। এটা ছিল তাঁর প্রিন্সিপাল।’
ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি তখন অবশ্য বাম-অবাম অনেক মন্ত্রীই ব্যবহার করতেন না। বছর কয়েক আগে প্রয়াত কংগ্রেস নেতা খড়্গপুরের দশবারের বিধায়ক জ্ঞান সিং সোহনপাল যুক্তফ্রন্ট এবং কংগ্রেস—দুই জমানাতেই মন্ত্রী ছিলেন। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন পরিবহণমন্ত্রী। সেই তিনি প্রায়ই রাইটার্স থেকে হেঁটে বাবুঘাটে যেতেন। তার পর লঞ্চ পেরিয়ে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে খড়্গপুর পৌঁছতেন।
মুর্শিদাবাদের আবদুস সাত্তারের মতো রাজ্যস্তরের নেতা ছিলেন না বর্ধমানের কংগ্রেস নেতা আবদুস সাত্তার। তবে তিনিও কয়েক দফা মন্ত্রী ছিলেন। দলীয় কাজে সেই সাত্তার সাহেবও গাড়ি ব্যবহার করতেন না। কংগ্রেসের আর এক মন্ত্রী শ্যামাদাস ভট্টাচার্য গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়িতে প্রায়ই ট্রামে চেপে ফিরতেন।
বামফ্রন্ট সরকার আসার পরেও সেই ধারা বজায় থাকে। বামফ্রন্টের প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। প্রায় বছর দশ বিদ্যুৎমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাকে লোডশেডিংয়ের হাত থেকে অনেকটা মুক্তি দিয়ে গিয়েছিলেন প্রয়াত শঙ্কর সেন। শনি-রবিবার ব্যক্তিগত কাজে বেরোতে হলে তিনি বাস বা মিনিবাসে চাপতেন।
বৈপরীত্যের ছবিটা এখানে একবার স্মরণ না করিয়ে দিলে ভুল হবে। ইদানীং বিধানসভায় গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা পান না মন্ত্রী বিধায়করা। সবার কাছেই গাড়ি রয়েছে। তার মধ্যে কিছু আবার পেল্লাই স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল। সাধারণের মধ্যে মিশে গিয়ে একলা পথে হাঁটা এখন নিতান্তই ইতিহাস।