কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত কঙ্কালীতলা শেষ পীঠ। প্রাচীন কালে চৈত্র সংক্রান্তির দিন হত মূল পুজো, আজ কালীপুজোতে ভক্তভরে মুখরিত হয় এই পবিত্র স্থান।

সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 20 October 2025 18:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শান্তিনিকেতনে ঘুরতে গিয়ে কঙ্কালীতলার নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বোলপুর স্টেশন থেকে প্রায় সাত-আট কিলোমিটার দূরে, কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির ঘিরে রয়েছে একাধিক পুরাণকথা আর আধ্যাত্মিক রহস্যের গাথা।
একান্নপীঠের শেষ পীঠ'। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, দেবী সতীর দেহখণ্ডগুলির মধ্যে এখানে পড়েছিল তাঁর কাঁখাল বা কোমর। সেই কারণেই এই স্থানটির নাম হয়েছে ‘কঙ্কালীতলা’। এই জায়গায় দেবীকে ‘দেবগর্ভ’ রূপে পূজা করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এখানে দেবীর কোনও বিগ্রহ নেই। মায়ের একটি ছবি দিয়েই চলে পূজা।
তবে এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে মন্দির চত্বরে থাকা ছোট্ট পুকুরটি, যা ‘সতীকুণ্ড’ নামে পরিচিত। পুরাণ মতে, সতীর অস্থি এখানে এসে পড়ার ফলেই এই কুণ্ডের সৃষ্টি হয়। বিশ্বাস, এই কুণ্ডের ঈশান কোণে দেবীর কাঁখাল নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। তাই একে পবিত্র বলে মানা হয়। কালীপুজোর দিন এখান থেকে জল এনে পুজোর কাজ সারা হয়।
কঙ্কালীতলা সতীপীঠ হলেও এক দশক আগে পর্যন্ত খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল না। রাজ্য রাজনীতির পালা বদলের পর ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে, বিশেষ করে বীরভূমের বাইরে। স্থানীয়রা বলছেন, এখানে কালীপুজো নিয়ে রমারমা খুব একটা ছিল না আগে, যা আড়ম্বর, পুরোটাই খুব 'নতুন'।
তাঁরাই জানান, এখানকার মূল পুজো চৈত্র সংক্রান্তির সময় হত। কোপাইয়ের তীরে বসত মেলা, সে বিরাট আয়োজন। সেসব এখনও আছে সঙ্গে জুড়েছে কালীপুজোও।
জনশ্রুতি আরও বলে, এই সতীকুণ্ডের না কি তিনটি গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে, যা সরাসরি কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণেই এই কুণ্ডের জল কখনও শুকিয়ে যায় না। তবুও অদ্ভুতভাবে প্রতি ১৯-২০ বছর অন্তর কুণ্ডের জল সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। ঠিক সেই সময়, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যায় মণিকর্ণিকা ঘাটও। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, পুজোর পর রাতারাতি আবার জল ভরে ওঠে কুণ্ডে।
আজও কঙ্কালীতলা তন্ত্রসাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। কালীপুজোর সময় এই পীঠে দূর-দূরান্ত থেকে বহু ভক্তের সমাগম হয়। যদিও প্রাচীন কালে এই স্থানে আসল পুজো হত চৈত্র মাসের সংক্রান্তির দিন। সেই সময় বিশাল মেলার আয়োজনও হত। এখন কালীপুজোর দিনও জাকজমকপূর্ণ আয়োজন হয় কঙ্কালীতলায়। পবিত্র সতীকুন্ডের জল এনে সেই দিনই হয় দেবীর পুজো।
রহস্য, বিশ্বাস আর ভক্তির এই অদ্ভুত সংমিশ্রণই আজও কঙ্কালীতলাকে করে তুলেছে বীরভূমের এক অনন্য আধ্যাত্মিক কেন্দ্র — যেখানে প্রতিটি পূজোর দিনই যেন মিশে থাকে প্রাচীন পুরাণকথা আর বর্তমান সময়ের ভক্তির আলো।