এমন কথা বলছেন অনেকেই। সত্যিই তো, প্রেমের পরিণতি কি এমন হওয়া উচিত? যেখানে এক জন শুধু দিচ্ছেন, আর অন্য জন নিচ্ছেন? আজকের দিনে অনেক মহিলাই ডেট পর্যন্ত করতে চাইছেন না এই ভয়ে। ভাবছেন, একাই থাকবেন।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 2 August 2025 14:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভালবাসা মানে কি এক তরফা যত্ন নেওয়া? না কি সম্পর্ক মানেই দায়িত্বের বোঝা টেনে নিয়ে যাওয়া? ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে বহু মহিলার মনে জেগে উঠছে একটাই প্রশ্ন, 'কেন প্রেমিককে ভালবাসা মানেই তাঁকে সামলানো?'
এই ‘সামলানোর’ কাজটাকেই এখন নাম দেওয়া হয়েছে, ম্যানকিপিং(Mankeeping)। স্ট্যানফোর্ডের গবেষক অ্যাঞ্জেলিকা ফেরারা এই শব্দটি তৈরি করেছেন। ‘কিনকিপিং’-এর অনুকরণে, যেখানে পরিবারে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার যাবতীয় দায় চাপানো হয় মহিলাদের ঘাড়ে। কিন্তু ম্যানকিপিং-এর কাজ আরও সূক্ষ্ম, আরও নিঃশব্দ। এখানে মেয়েরাই হয়ে ওঠেন প্রেমিকের থেরাপিস্ট, এইচআর ম্যানেজার, ইমোশনাল লাইফ কোচ, তাও বিনা পারিশ্রমিকে।
প্রেম না কি ইমোশনাল হেল্পডেস্ক?
প্রতিদিন প্রেমিককে বুঝিয়ে বলা, 'এসএমএস করা মানেই প্রেম নয়, সেটা সৌজন্যও হতে পারে।' কাজের ফাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া, 'তোর বন্ধুকে উত্তর দে, দু’দিন ধরে অপেক্ষা করছে।' মান-অভিমান মেটানো, অফিসের ঝামেলা কীভাবে সামলাবে তার টিপস দেওয়া, কঠিন কথোপকথন শুরু করা, অথবা বলার মতো কিছু না থাকলেও সারাদিনের গল্প শোনা, এ সবই এখন মেয়েদের দৈনন্দিন কাজের তালিকায় জুড়ে যাচ্ছে।
৩০ বছরের দিল্লির এক কমিউনিকেশন এক্সিকিউটিভ অপর্ণা রাও যেমন বলছেন, 'এক জনকে প্রেমিক বানানোর চেয়ে মানুষ বানাতে বেশি পরিশ্রম লাগে।'
মনোবিদ গুঞ্জন আর্যর মতে, 'ম্যানকিপিং মানে প্রেমিকের আবেগের একমাত্র সহায়ক হওয়া, তার মানসিক চাপ, ক্ষোভ, ভয়, প্রত্যাশা সব সামলা, যেন একটা মানুষ নয়, পুরো সাপোর্ট সিস্টেম।'
প্রেমিক না, অভিভাবক চাই?
সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা ‘রিলেশনশিপ ওয়েলনেস ইনস্টিটিউট’-এর ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষা বলছে, ৭২ শতাংশ সিঙ্গল মহিলা এই ‘ইমোশনাল মেন্টর’-এর ভূমিকায় ক্লান্ত। কারণ? প্রেমিকরা অনেকেই জানেন না কীভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়, বিপদের সময় কীভাবে পাশে থাকতে হয়। যেন মেয়েরা প্রেম করছেন না, কাউকে মানুষ করার চেষ্টা করছেন।
২৬ বছরের আইনজীবী রক্ষা আগরওয়ালের কথায়, 'আমি বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত, ‘এক বার প্ল্যানটা তুই কর’, বা ‘এক বার আমায় জিজ্ঞাসা কর, কেমন আছি’। মাঝেমধ্যে ভাবি, প্রেমিক পেয়েছি না কি কাউকে মানুষ করছি?'
এখানেই থেমে নেই সমস্যা। গত এক দশকে পুরুষদের বন্ধু হারানোর হারও ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, ২৫-৪০ বছরের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ পুরুষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। অর্থাৎ আবেগ ভাগ করে নেওয়ার একমাত্র মানুষ হয়ে উঠেছেন তাঁদের প্রেমিকারা। কিন্তু মনোবিদ রোহিত কলিওয়াতের মতে, 'ভালবাসা ভাগ করে নেওয়া দারুণ, তবে এক জন মানুষের উপরই সব আবেগ চাপিয়ে দেওয়া অবিচার। সম্পর্ক তখন ভারী হয়, ভারসাম্যহীন হয়।'
কী হয় তখন? মেয়েরা ক্লান্ত হন। কিছু সম্পর্ক ভাঙে, কিছু ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যায়। কারণ, যত্ন যদি একতরফা হয়, তাহলে সেটা আর ভালবাসা থাকে না, সেটা হয়ে যায় শ্রম। যার জন্য কোনও স্বীকৃতি নেই, ছুটি নেই, পারিশ্রমিক নেই।
মনোবিদ গুঞ্জন আর্য তাই পরামর্শ দিচ্ছেন, 'মহিলাদের আবেগিক সহায়তায় আগ্রহ থাকার মানে এই নয়, তাঁরা সব দায়িত্ব নেবেন। পুরুষদেরও নিজের আবেগের যত্ন নিতে শিখতে হবে, বন্ধু গড়তে হবে, থেরাপিতে যেতে হবে, সম্পর্ক নিয়ে বই পড়তে হবে। সব কাজ প্রেমিকা করে দেবে না।'
‘আমি প্রেম চাই না, শুধু একটু বিশ্রাম চাই’
এমন কথা বলছেন অনেকেই। সত্যিই তো, প্রেমের পরিণতি কি এমন হওয়া উচিত? যেখানে এক জন শুধু দিচ্ছেন, আর অন্য জন নিচ্ছেন? আজকের দিনে অনেক মহিলাই ডেট পর্যন্ত করতে চাইছেন না এই ভয়ে। ভাবছেন, একাই থাকবেন।