৩৯ বছর ধরে শিক্ষকতা করে অবসরের পর নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির গোটা ৪০ লক্ষ টাকা দরিদ্র শিশুদের দান করলেন বিজয় কুমার চানসোরিয়া।

মধ্যপ্রদেশের ওই শিক্ষক, অবসরের সময়
শেষ আপডেট: 8 November 2025 12:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধ্যপ্রদেশের খান্ডিয়া গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বয়সের হিসাব বলছে অবসরের সময় এসে গিয়েছে। ৩৯ বছর ধরে ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে খড়ি দিয়েছেন বিজয় কুমার চানসোরিয়া, পড়িয়েছেন, এক কথায় মানুষ করেছেন। এবার শিক্ষকতার জীবন শেষ, বাচ্চাদের পড়ানোর দায়িত্বও খাতায় কলমে শেষ! সরকারের নিয়ম বলছে, থামতে হবে।
কিন্তু থামলেন না চানসোরিয়া। অবসরের পর প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকা হাত পেয়ে নিজের জন্য কিছু না রেখেই সবটা দান করে দিলেন দরিদ্র ও দুঃস্থ শিশুদের জন্য। মোট অঙ্ক? ৪০ লাখ টাকা।
বিজয়বাবু বলেন, “আমি প্রায় চার দশক ধরে সেবা করছি। প্রচুর মানুষের ভালবাসা পেয়েছি। আমার দুই ছেলেই এখন প্রতিষ্ঠিত, তাদের জীবনে কোনও অভাব নেই। তাই অবসরের পর এই টাকাটা আমি নিজের জন্য রাখতে চাইনি। ঠিক করলাম, জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির পুরো টাকা দান করব এমন সব বাচ্চাদের জন্য, যাদের জীবন শুরুই হয় বঞ্চনা দিয়ে।”
টিকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা বিজয় কুমার সব সময়ই কোনও না কোনওভাবে এলাকার শিশুদের পাশে থেকেছেন। উৎসবের সময় নতুন জামা, শীতের সময় সোয়েটার বিলি করতেন নিজের টাকাতেই। সেই হাসিমুখগুলো না কি তাঁকে দিত অন্যরকম শান্তি।
বছরের পর বছর ধরে তিনি দেখেছেন, উপজাতি অধ্যুষিত খান্ডিয়া স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রী আর্থিক কষ্টে ভোগে। বোর্ড পরীক্ষার ফি দিতে পারে না, স্কুলের ইউনিফর্ম কেনা তাদের কাছে বিলাসিতা। এই দৃশ্যই তাঁর মনে দাগ কাটে। আর সেখান থেকে জন্ম নেয় এমন কঠিন সিদ্ধান্ত।
টাকা পয়সা নিয়ে কী করতে চান জেনে স্ত্রী-সহ পরিবারের সকলে তাঁর পাশে থেকেছে। বিজয়বাবু জানান, তঁর স্ত্রী হেমলতার সঙ্গে যখন বিষয়টা আলোচনা করা হয় তখন উনি এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজি হয়ে যান। তারপর থেকেই তিনি প্রতি মাসে প্রভিডেন্ট ফান্ডে ১০ হাজারের বদলে ২০ হাজার টাকা জমা দিতে শুরু করেন।
নিজেও কিন্তু ছোট থেকে খুব সহজ জীবন কাটাননি মাস্টারমশাই। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে শৈশব। কোনওভাবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, তারপর সংসারের হাল ধরতে দুধ বিক্রি, রিকশা চালানো শুরু করেন।
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। বাবা চাষ করতেন সামান্য জমিতে, যা দিয়ে সংসার চলত না। ১৪ বছর বয়সে রোজগার শুরু করেন পরিবারের জন্য। এরপর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়, আবার পড়াশোনায় ফেরেন। ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন, এক বছর পর, ১৯৮৩ সালে প্রাথমিকে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
এখন অবসরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাঁর বার্তা একটাই, “আমরা হয়তো গোটা পৃথিবীকে সাহায্য করতে পারব না। কিন্তু প্রত্যেকে যদি অন্তত একজনকে সাহায্য করি, তাহলেই সমাজে একটা বদল আসবে।”
তাঁর গল্প শুনে সবার মুখে এখন একটাই কথা, একজন সাধারণ গ্রামের স্কুলশিক্ষক দেখিয়ে দিলেন, মানবিকতা বলতে ঠিক কী বোঝায়। আর তাঁর এই নিঃস্বার্থ দান আজ অনেকের কাছে আলোর দিশা।