মেয়ে হয়েও সাহসিকতার সঙ্গে পরম্পরার কাজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন টুম্পা। লিঙ্গবৈষম্যের দেওয়াল ভেঙে সমাজের চোখে চোখ রেখে কাজ করছেন তিনি। বিয়ে ভেঙে গেলেও হার মানেননি মহিলা 'ডোম'।

টুম্পা দাস
শেষ আপডেট: 29 October 2025 18:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বীরভূমের পুরন্দরপুরের শ্মশান ঘাটে ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই ধোঁয়া মেশা বাতাসে ভেসে আসে কাঠ পোড়ার গন্ধ। আগুনের কটমট শব্দে মিশে থাকে শোকাহতদের কান্না, মন্ত্রপাঠের গলায় গলায় ওঠানামা। সেই ধোঁয়া-ছাওয়া ঘাটের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে এক মহিলা। এক সময় তিনি ছিলেন নার্স, এখন রাজ্যের ভাষায় ‘সৎকার কর্মী’। তাঁর কাজ, অচেনা মানুষদের শেষ যাত্রায় মর্যাদা দিয়ে বিদায় জানানো।
এই পথটা বেছে নেওয়া তাঁর নিজের ইচ্ছেতে নয় বরং প্রয়োজনের তাগিদে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাধ্যতাই পরিণত হয়েছে সাহস, সহনশক্তি আর লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদে।
টুম্পা দাসের গল্পটা শুরু হয় ২০১৪ সালে। সেই বছর হঠাৎ মারা যান তাঁর বাবা বাপী দাস, যিনি পুরন্দরপুর শ্মশানে কাজ করতেন। সংসারের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপার্জন তখন বন্ধ। টুম্পা তখন স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্সের চাকরি করেন, কিন্তু সামান্য টাকায় সংসার টানা দায়। বাবার পদ শূন্য হল, আর পরিবারের পেট চালাতে হবে, এই দুই মিলে তিনি দাঁড়ালেন এক কঠিন সত্যের সামনে। নিজের নার্সের চাকরি ছেড়ে, তিনি নিলেন বাবার কাজটির দায়িত্ব, শ্মশানের কাজ।
তথাকথিত পুরুষদের সেই পেশায় টুম্পার প্রথম পদক্ষেপ ছিল সমাজের চোখে এক তীব্র ধাক্কা। আত্মীয়-স্বজন নাক সিঁটকাল, পাড়ার লোকেরা চাপা গলায় বলল, “মেয়েমানুষ হয়ে এমন কাজ করবে!” এমনকি পরিবারের মধ্যেও ছিল আশঙ্কা, ‘এই কাজ করলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে তো?’ কিন্তু টুম্পা হার মানেননি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই সোজাসাপটা বলেছিলেন, “বাবার জায়গায় কেউ না গেলে আমরা খেতে পাব না।” মনে জোর, খুব কাছের মানুষজনের সমর্থন আর দৃঢ় প্রতীজ্ঞ মনোভাব নিয়ে শুরু হল 'ডোমের' যাত্রা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিন্দা বদলে গেল সম্মানে। যে সমাজ তাঁকে ‘যা তা’ বলেছিল, আজ সেই সসমমাজই চুপচাপ কুর্নিশ জানায় তাঁকে ও তাঁর ধৈর্যকে।
এই কাজের জন্য শারীরিক শক্তি যেমন দরকার, মানসিক জোরও তেমনই প্রয়োজন। কাঠ তোলা, চুল্লি চালানো, ধোঁয়ার মধ্যে ঘুরে বেড়ানো, সবই করতে হয় তাঁকে। সকাল ৮টা থেকে রাত অবধি একটানা চলে সেই কাজ। 'প্রথমে মৃতদেহের তথ্য লিখে রাখতে হয় রেজিস্টারে,' বলেন টুম্পা। 'তারপর চুল্লি গরম করা, প্রক্রিয়া দেখা, পরিবারের হাতে অস্থি তুলে দেওয়া, সব কিছু নিজে দেখি।' ১০ বছরে তিনি অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের দেহ দাহ করেছেন। মুখে হাসি নিয়ে বলেন, “মৃতদেহ ভয় দেখায় না, জীবিতদের কিছু মানুষই বরং ভয় দেখায়।”
টুম্পার এই পেশা তাঁর কাছে শুধু রোজগার নয়, এক উত্তরাধিকারও। বলেন, “আমার ঠাকুরদা করতেন, তারপর বাবা, এখন আমি।” এই পেশা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবারে খাবার জুগিয়েছে, তাঁরা লালিত পালিত হয়েছেন। তাঁর পেশাকে সম্মান দিতে কিপটেমি করেন না তিনি কিন্তু মেয়েমানুষ হয়ে শ্মশানের আগুন সামলানো, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো, এই নিয়ে যতই কথা চলুক, সাহস তাঁকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করেছে।
২০১৯ সালে পুরন্দরপুর শ্মশানে বসে যায় বৈদ্যুতিক চুল্লি। আগের মতো কাঠ জোগাড়, সাজানো, পরিষ্কার, সব ঝামেলা কমে আসে। “আগে একটা দেহ পুড়তে তিন ঘণ্টা লেগে যেত, এখন ৪৫ মিনিটে হয়ে যায়,” বলেন টুম্পা। কিন্তু মেশিনেও কমে না মানসিক ভার। “অনেকে ভাবে, মেয়েরা নরম মনের, এই কাজ পারে না। কিন্তু আমি দেখেছি পুরুষেরাও ভয় পায়,” টুম্পার গলায় নিঃশব্দ আত্মবিশ্বাস।
তবে এই সাহসিকতার গল্পে ব্যথার সুরও আছে। সম্প্রতি তাঁর বিয়ের কথাবার্তা চলেছিল, কিন্তু পাত্রপক্ষ জানতে পারে তিনি শ্মশানের কর্মী, আর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় সম্বন্ধ। “ওরা বলল, এই কাজ করা মেয়েকে বিয়ে করবে না,” নিঃস্পৃহ মুখে বলেন টুম্পা। “কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু শক্তও হয়েছি আরও।” মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতন পান কাল্যাণপুর পঞ্চায়েত থেকে, তবুও কাজ ছাড়েননি। “যখন পরিবারের লোকেরা ধন্যবাদ জানায়, আশীর্বাদ করে, সেই অনুভূতি টাকার চেয়ে বড়,” যোগ করেন তিনি।
আজও প্রতিদিন, যখন আর এক মৃতদেহ আসে, টুম্পা মুখে মাস্ক পরে, গ্লাভস হাতে নিয়ে তৈরি হয়ে যান। মনের মধ্যে একটাই বিশ্বাস, “আজকাল পুরুষ-মহিলার মধ্যে আর কোনো তফাত নেই। সবাই সমান।”
ধোঁয়া আর আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নতুন সংজ্ঞা লিখছেন মর্যাদার, জীবনের ও মৃত্যুর। পুরন্দরপুরের সেই চুল্লির আগুনের মতোই তাঁর সাহস আজও জ্বলছে, নিভছে না, চুপচাপ, কিন্তু দপদপ করে।