ছাতিম ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছে হেমন্তের শহর। মুখচোরা ঋতুর হাত ধরে প্রতিবার কড়া নাড়ে ছেলেবেলার স্মৃতি।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 20 October 2025 18:18
সন্ধে নামছে। পূর্বাচল পেরিয়ে বাবার সঙ্গে চলছি যাদবপুর থানার দিকে। দুর্গাপুজো শেষ, একদিকে প্যান্ডেল খুলছে অন্যদিকে চলছে কালীপুজোর তোড়জোড়। হঠাৎ এক কড়া-মিষ্টি গন্ধ নাকে ধাক্কা দেয়। রাস্তায় অনেক গাছ, কোনটা থেকে গন্ধ বেরচ্ছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। ৬-৭ বছরে ওই প্রথম গন্ধটার সঙ্গে আমার পরিচিতি হয়। কৌতুহল নিয়ে কীসের ফুল বাবাকে জিজ্ঞাসা করায় জানতে পারি 'ছাতিম।'
গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা-ঘিয়ে ফুল। পরে যখনই দেখেছি মাথা উঁচু করে, গন্ধ পেয়েছি, চোখের একটানে চিনে ফেলেছি- এ ছাতিমই। আর গন্ধেই বুঝি বছর ঘুরে এসেছে হেমন্ত।
ছাতিম ফুল না চিনলে দিনে দেখে একে চেনা দায়। কারণ রাতেই যত দাপাদাপি। দিনভর সুবাস লুকিয়ে রাখে, যত সন্ধ্যা থেকে রাত হয়, ততই তীব্র হয় মিষ্টি 'ঝাঁঝালো' গন্ধ। গাছের কাছে দাঁড়ালে খুব কড়া কিন্তু একটু দূরে গেলেই হালকা, বাতাসে ভেসে যায় মাইলের পর মাইল। কারও কাছে মাদকতা, কারও মাথা ঝিমঝিম। দ্বৈত চরিত্রের এই সুবাসই ছাতিমকে আলাদা করে।
ছাতিমে পাতা থাকে সাতটা করে এক গুচ্ছে। ছাতার মতো দেখতে লাগে তাই সেখান থেকে এর নাম 'ছাতিম।' বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris, ইংরেজি নাম Devil’s Tree বা ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি,আগে এর কাঠে ব্ল্যাকবোর্ড বানানো হতো। এতে বিষ ভরতি, গাছের ছাল ও পাতা বিষাক্ত ফলে এর থেকে সাবধান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও এর গন্ধে অনেকের শ্বাসকষ্টও হয়।
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, চিন, মালয়েশিয়া, সবখানেই এর পদচিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু বাঙালিদের কাছে বিশেষ কারণ পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য উদ্ভিদ’ হিসেবে ছাতিমের পরিচয় আছে। শহর-গ্রাম সব জায়গাতেই কম-বেশি দেখা যায়।
কেন রাস্তার ধারেই ছাতিম দেখা যায় বেশি?
অনেকে বলেন, দূষণ সহ্যশক্তি ভাল এই গাছের, তাই রাস্তার ধারে দূষণ রোধে এর ব্যবহার হয়। কলকাতার গড়িয়াহাট, কসবা থেকে শ্যামবাজার- ডানলপ বা বাটা থেকে পাটুলি, এই গাছ সর্বত্র। শহরের শব্দ শোষণ, ধুলো–ধোঁয়া কমানো, রাতের আলোয় প্রতিফলন নিয়ন্ত্রণ—এসব শহুরে পরিবেশে ছাতিমকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
এছাড়াও গাছের গড়ন ছাতার মতো হওয়ায় মাথায় প্রশস্ত ছায়া দিতে পারে। ধূসর খসখসে কাণ্ড, পনেরো–বিশ মিটার পর্যন্ত উঠতে পারে। পাতার উপর চকচকে সবুজ, নীচেটা সাদাটে। ফুল ছোট, সাদা-সবুজ, থোকা থোকা। রাতের রানি হিসেবেও পরিচিত অনেকের কাছে।
কেন রাতেই এত দাপাদাপি?
নিশাচর পতঙ্গ ডাকতে সুবাস ছড়িয়ে দেয় এই গাছ। সেই সুবাসের ভাঁজেই বাঁধা স্মৃতির সুতো। কারও শৈশবের উঠোন, কারও গ্রামপুকুরের ঘাট, কারও প্রথম প্রেমের রাস্তা। ছাতিম আছে বলেই হেমন্তের আছে ‘গায়ের গন্ধ’। এই গন্ধের সঙ্গেই আমাদের ঋতুচক্রের ব্যক্তিগত ক্যালেন্ডার মিলে যায়।
বাংলা সাহিত্যে ছাতিম মানে স্মৃতি, নিসর্গ, একধরনের নীরব তীব্রতা। শান্তিনিকেতনের প্রাচীন ছাতিমতলা থেকে শুরু করে দীক্ষা ও সমাবর্তনের ঐতিহ্য, রবীন্দ্রজীবন ও বিশ্বভারতীর প্রতিটি আচারেই ছাতিমের ছায়া আছে। দেবেন্দ্রনাথের সাধনাবেদী হয়ে আছে সে জায়গা। আজও সমাবর্তনে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় ছাতিমের পাতা, নিজস্ব এক প্রতীকী ঐতিহ্য। শান্তিনিকেতনের নামটাই যেন ছাতিমের ঘ্রাণ মেখে আছে।
শুধু সাহিত্য কেন, সমসাময়িক গানেও এই 'বিষ' গাছ ঘুরে ফিরে আসে। 'ছাতিমফুলের গন্ধে মাতাল' সুর-শব্দে যে হেমন্তের বিকেল, সেখানে ছাতিম মানে রোদ্দুরের ভেতর সোহাগের টিপ। কবিতায়, উপন্যাসে, লোককথায়-কখনও দেবগন্ধ, কখনও ‘ডেভিল’—দুই মিথই সমান শক্তিশালী।
কেউ বলে, সাত পাতার ছাতার মতো গড়নের কারণেই ‘ছাতিম’, কেউ বলে ‘ডেভিল’, কথার লোকোচ্চারণে ‘ছাইত্তান’, ‘ছাতিয়ান’ হয়ে আজকের নাম। সত্যি–মিথ্যার মাঝেই লোকবিশ্বাসের নকশা তৈরি হয়—এইও ছাতিমের গল্পের অংশ।
ছাতিম শুধু গন্ধ নয়, কাঠের জন্যও সমানভাবে বিখ্যাত। কাঠ হালকা ও কাজের, আগে বাক্স–প্যাকিং, দেশলাই কাঠি, আসবাবে ব্যবহার হত। ভেষজে এর কদর পুরোনো, ছাল আর আঠা জ্বর, হাঁপানি, আমাশয়, কিছু হৃদরোগের উপসর্গে প্রাচীন চিকিৎসায় ব্যবহার হয় (এ সবই লোকশ্রুতি ও ভেষজশাস্ত্রের অংশ; আধুনিক চিকিৎসার পরামর্শই চূড়ান্ত)।
বীজের মধ্যেও রয়েছে চমক। ফল ফাটলেই ছোট কাঠির মতো বীজ বেরোয়। প্রান্তে নরম পশম, বাতাসে ভেসে যায় অনেক দূর। ঠিক জায়গায় পড়লে আবার নতুন ছাতিম। স্বয়ংসম্পূর্ণ বিস্তারের এই কৌশল প্রকৃতির চিরচেনা বুদ্ধি।
শহর হোক বা গ্রাম, ব্যস্ততার মাঝেও ছাতিম দাঁড়িয়ে থাকে নীরব সজাগে। গন্ধে জানান দেয়, ‘হেমন্ত এসে গেছে।’ গাছভরা সাদা ফুলে হাসছে প্রকৃতি। মৌমাছির গুঞ্জনে ব্যস্ত সকাল। শহরের ধোঁয়ার ভেতরেও কিছু জায়গায় মিষ্টি সুবাসে টের পাওয়া যায়—বাংলা এখনো পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়নি। প্রতিদিন খবরের কাগজে বড় গাছ কাটার গল্প। কখনও উন্নয়নের নামে, কখনও অবহেলায়। অথচ আমাদের শহরের ভবিষ্যৎ—বট, অশ্বত্থ, আম, কাঁঠালের সঙ্গে ছাতিমও। গন্ধই বার বার মনে করিয়ে দেয় তা।
লেকের পাশ দিয়ে রাসবিহারী যাওয়ার সময় হঠাৎ ছাতিমের গন্ধে বাবার সঙ্গে সপ্তপর্ণী চেনার সেই প্রথম অভিজ্ঞতাই মনে পড়ছিল। কী অবাক না, একটা ঋতু, একটা ভাষা, একটা বাংলাকে এই গাছ একসঙ্গে ধরে রাখে। তাই ছাতিম শুধু ফুল নয়—এ আমাদের ঘ্রাণের আর্কাইভ, হেমন্তের স্বাক্ষর।