বিড়ি কারখানার সুতোর ফাঁদে আটকে থাকা শিশুদের মুক্তি দিতে বই তুলে দেন হাতে। মাত্র ৯ বছর বয়সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব নেয় এক কিশোর, হয়ে উঠে অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁকে শিক্ষক দিবসে স্যালুট জানাচ্ছে দ্য ওয়াল।
.jpeg.webp)
৯ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন বাবর আলি
শেষ আপডেট: 5 September 2025 11:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রীষ্মের দুপুর। খাঁ খাঁ করছে রাস্তা। মাঠ ফাঁকা, ছেলেমেয়েরা নদীর ঘাটে কচুরিপানা ভাসিয়ে খেলছে বা ঘরে মা-বাবার সঙ্গে কাজে হাত পাকাচ্ছে। সেই সময়ে মুর্শিদাবাদের ছোট্ট এক গ্রামে, আম-আঁটির ভেঁপু বাজিয়ে আলপথে ছুটে বেড়ানোর বয়সে, মানুষ গড়ার কাজ করছে এক নাবালক। একটি পেয়ারা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে হাতে খাতা-কলম নিয়ে নিজের সমবয়সি বা তার চেয়ে খুদে বাচ্চাদের পাঠ দিচ্ছে জীবনের। শেখাচ্ছে অ-আ-ক-খ।
এই বিস্ময় বালকের ব্যাপ্তি শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদে আটকে নেই, গোটা বিশ্ব চেনে বাংলার বাবর আলিকে।
২০০২ সালের সেই গ্রীষ্মের দুপুরই যেন এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল। বাবরের বাবা ছিলেন এক ছোট ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। সংসারে টানাপড়েন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। তবুও স্কুল থেকে ফিরে খেলাধুলো না করে বাবর যা শুরু করেছিলেন, তা আসলে বিপ্লবের চেয়ে কম নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, কেবল নিজে পড়াশোনা করলেই সমাজের উন্নয়ন হবে না, গ্রামের অন্য বাচ্চাদের মধ্যেও শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে।
মুর্শিদাবাদ তথাকথিত পিছিয়ে পড়া জেলার অন্যতম। এখানকার বেশিরভাগ বাচ্চাই হয় একটা বয়সের পর পরিযায়ী হয়ে ভিন রাজ্যে চলে যায় নাহলে কাকা-দাদার সঙ্গে শহরে এসে জোগারের কাজ শুরু করে। যারা এই সব পারে না, তারা বাবা-মাকে বিড়ি বাঁধতে সাহায্য করে। এই গোটা চিত্র পাল্টানোর স্বপ্ন মাত্র ৯ বছরে শুরু করেছিলেন বাবর।
প্রথম দিনের স্কুলে ছাত্র ছিল মাত্র আট জন। তাদের মধ্যে ছিল তাঁর বোন আমিনাও। পাঠ্যবই কেনার টাকাও ছিল না। বাবর তখন ভাবল, প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী বাড়ি থেকে এক মুঠো চাল আনবে। সেই চাল বিক্রি করে কেনা হবে খাতা-কলম, বই। চক জোগাড় হত তারই স্কুলের ভাঙা, ফেলে দেওয়া চকের টুকরো থেকে। বাবর ছুটি হওয়ার সময় সব কুড়িয়ে আনত। তার শিক্ষক বৈজয়ন্ত তিওয়ারি একদিন দেখলেন, প্রায় প্রতিদিনই চক কুড়িয়ে পকেটে ভরে নিয়ে যায় ছেলেটা। কারণ শুনে পরদিনই তিনি দিলেন এক বাক্স চক। ওই ছোট্ট উপহার বাবরের কাছে ছিল বিরাট এক আশীর্বাদ।
তবে সবকিছুর শুরুতেই যেমন লড়াই থাকে, বাবরেরও ছিল। গ্রামের অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, পেট ভরাতে যেখানে ভাতই জোটে না, সেখানে আবার পড়াশোনার জন্য এত কষ্ট কেন? কেউ কেউ বলেছিলেন, এসব করে কোনও লাভ হবে না। কিন্তু বাবরের জবাব ছিল নিঃশব্দ অথচ দৃঢ়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানেই শুধু চাকরির সুযোগ নয়। শিক্ষা মানুষকে বদলাতে শেখায়। শিক্ষাই গ্রাম থেকে অন্ধকার সরিয়ে আনতে পারে আলো।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিবিসি তাঁকে 'বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সি প্রধানশিক্ষক' ঘোষণা করেছিল। সেই থেকে তাঁর গল্প ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। অ্যাঞ্জেলিনা জোলির লেখা বইতেও জায়গা পান তিনি। হয়েছেন টেড ফেলো, নাম উঠেছে ফোর্বস ৩০ আন্ডার ৩০ তালিকায়। গ্রাম বাংলার স্কুলমাস্টারকে এভাবেই চিনেছে গোটা বিশ্ব।
আজ বাবরের স্কুলের নাম 'আনন্দ শিক্ষা নিকেতন'। আর সেই পেয়ারা গাছের তলার ক্লাসঘর এখন বহু দূরে চলে গিয়েছে। আজ সেখানে রয়েছে পাকাপাকি বাড়ি, আছে লাইব্রেরি, কম্পিউটার, ইউনিফর্ম, পাঠ্যবই। সবই বিনামূল্যে। আট হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যেই পড়াশোনা করেছে এই স্কুল থেকে। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, একসময় এখানে পড়া ছেলেমেয়েরাই আজ শিক্ষক হয়ে ফিরেছে। বিশেষ করে মেয়েরা।
কারণ বাবর বরাবরই বিশ্বাস করেছেন এবং বলে এসেছেন, 'একজন শিক্ষিত মা মানেই শিক্ষিত সমাজ। মা-ই তো প্রথম শিক্ষক। বর্তমানে তাঁর স্কুলে ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ।'
এতটা পথ পেরিয়েও বাবরের স্বপ্ন থেমে নেই। তিনি চান এই স্কুল আরও বড় হোক, হয়ে উঠুক এক আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেখানে কেবল বইয়ের পড়া নয়, থাকবে দক্ষতার প্রশিক্ষণও, সঙ্গে মানবিকতার শিক্ষা। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা যদি ভালবাসার ভাষায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে বদলাবে সমাজও।
আজ তাঁর বয়স উনত্রিশ। কিন্তু অন্তরে এখনও বেঁচে আছে সেই ন’বছরের শিশু, যিনি একদিন খাতা-কলম তুলে নিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে বাবর আলির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিক্ষক মানে কেবলই পাঠশালা, পুঁথিগত শিক্ষা বা ক্লাসরুম নয়। একজন শিক্ষক মানুষ গড়েন, সমাজের উন্নয়নে লড়ে নেন যে কোনও অবস্থায়, উপলব্ধি করতে শেখান, বাঁচতে শেখান, সহমর্মী হতে শেখান। দ্য ওয়ালের তরফে এমন শিক্ষককে স্যালুট।