১৯৯৪ সাল থেকে আব্দুল মালিক (Abdul Malik) প্রতিদিন সকালবেলা নিজের বই, জামাকাপড় ও খাবার একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নেন। সেটি বেঁধে দেন এক টিউবের সঙ্গে, আর সেই ভেসে থাকার ভরসাতেই তিনি ঝাঁপ দেন কাদালুন্ডি নদীতে।

নদী সাঁতরে স্কুলে যান আব্দুল
শেষ আপডেট: 5 September 2025 11:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আব্দুল মালিক, পেশায় একজন শিক্ষক, স্কুলে পড়ান। শুনতে সাধারণ মনে হলেও তাঁর কাহিনিতে আদর্শ ও কর্তব্যবোধের ছাপ স্পষ্ট। শিক্ষকতার জন্য গত ২০ বছর ধরেই প্রতিদিন নদী সাঁতরে স্কুলে যাচ্ছেন। রাজ্যের পরিবহণ ব্যবস্থা ভাল না হওয়ায় এই পথই বেছে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কেরলের মলপ্পুরম জেলার পদিঞ্জাট্টুমুরি গ্রামের গণিতের শিক্ষক আজ গোটা দেশের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছেন। এই অসাধারণ কীর্তির জন্যই স্থানীয়রা তাঁকে স্নেহ করে ডাকেন 'টিউব মাস্টার' (Abdul Malik Tube Master)।
১৯৯৪ সাল থেকে আব্দুল মালিক (Abdul Malik) প্রতিদিন সকালবেলা নিজের বই, জামাকাপড় ও খাবার একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নেন। সেটি বেঁধে দেন এক টিউবের সঙ্গে, আর সেই ভেসে থাকার ভরসাতেই তিনি ঝাঁপ দেন কাদালুন্ডি নদীতে। প্রায় ১৫–৩০ মিনিট ধরে সাঁতরে অপর পারে পৌঁছে যান।
নদী পার হওয়ার পর তিনি দ্রুত জামাকাপড় বদলে নেন, তারপর হেঁটে পৌঁছে যান মুসলিম লোয়ার প্রাইমারি স্কুলে। বছরের পর বছর ধরে এইভাবেই নিজের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একটিও দিন বাদ যায়নি, বৃষ্টি, ঝড়, এমনকি ভয়ংকর বর্ষার দিনেও না।
কেন এই কঠিন পথ?
তখন স্কুলে যাওয়ার অন্য রাস্তা ছিল ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ, তিনটি বাস বদলাতে হত। যাওয়া আসা মিলিয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টার বেশি সময় লাগত। চারপাশে নদীঘেরা সেই স্কুলে পৌঁছতে এভাবেই সাঁতরেই যাওয়া সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য উপায় হয়ে ওঠে তাঁর কাছে।
যদিও নদী সবসময় দয়ালু ছিল না। আব্দুল মালিকের (Abdul Malik) অভিজ্ঞতায় এসেছে ভয়ংকর স্রোত, ভেসে আসা কাঠ-আবর্জনা, এমনকি সাপও। কিন্তু তিনি ভয়কে কোনোদিনই অজুহাত করেননি। 'নদী হয়তো বাধা, কিন্তু আমার ছাত্রছাত্রীদের থেকে আমাকে আলাদা করতে পারেনি কখনও', বলেন তিনি।
শুধু পড়ানো নয়, পরিবেশ নিয়েও সমানভাবে চিন্তিত এই শিক্ষক। কেরালা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সাম্প্রতিক রিপোর্টে কাদালুন্ডি নদীর দূষণের চিত্র উঠে আসার পর থেকে আব্দুল নিয়মিত তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নদীর ধারে সাফাই অভিযান চালাচ্ছেন। প্লাস্টিক, আবর্জনা তুলে পরিষ্কার করছেন সবাই মিলে। তিনি ছাত্রদের বলেন, 'প্রকৃতি ঈশ্বরের দান। আমাদের দায়িত্ব এটাকে রক্ষা করা।'
এছাড়া, তিনি পঞ্চম শ্রেণির ঊর্ধ্বের ছাত্রদের সাঁতারও শেখান, যাতে তারা জলের ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে এবং প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা অর্জন করতে পারে।
সম্প্রতি জেলা শিক্ষা আধিকারিক এস. রাজীব মালিকের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, 'আব্দুল স্যার শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, পরিবেশকর্মী হিসেবেও রোল মডেল। তিনি ছাত্র-শিক্ষক সবার কাছে অনুপ্রেরণা।' সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর গল্প নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জাতীয় পর্যায়, সব জায়গায় এখন আলোচনায় এই অদম্য শিক্ষক।
২০১৩ সালে মালিক হিসেব করেছিলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৭০০ কিলোমিটার নদী সাঁতরে ফেলবেন। সর্বোপরি, শিক্ষাদানকে তিনি কখনও চাকরি মনে করেননি। তাঁর কাছে এটি এক 'দায়িত্ব', যা পূরণ করতে হয় যেকোনও বাধা-বিপত্তির মাঝেও।
আব্দুল মালিকের গল্প দেখায়, কীভাবে অধ্যবসায়, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধ শুধু একজনের জীবন নয়, গোটা সমাজকে বদলে দিতে পারে। তাঁর প্রতিদিনের নদী পেরোনো আসলে শুধুই যাতায়াত নয়, এটি এক অভিভাবকসুলভ নিবেদন, যা ছাত্রছাত্রীদের শেখায়, শিক্ষার জন্য যেকোনও ঝুঁকি নেওয়া যায়, এতে সময় বা শক্তি অপচয় হয় না।