রেকর্ড ১০ বারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার অবশেষে ২০২৬-এর এপ্রিলে কুর্সি ছেড়েছেন। আর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বিজেপি বেছে নিয়েছে এক লড়াকু মুখকে - সম্রাট চৌধুরী। যাঁর সামনে এখন ‘বিগ শ্যুজ টু ফিল’-এর চ্যালেঞ্জ। কারণ, যাঁর জায়গায় তিনি বসছেন, সেই নীতীশ কুমার বিহারের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে মিশে আছেন।

নীতীশ কুমার এবং সম্রাট চৌধুরী
শেষ আপডেট: 14 April 2026 18:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের রাজনীতিতে (Bihar Politics) একটি দীর্ঘ এবং বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে মঙ্গলবার। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিহারের রাজনীতির ধ্রুবতারা এবং রেকর্ড ১০ বারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) অবশেষে ২০২৬-এর এপ্রিলে কুর্সি ছেড়েছেন। আর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বিজেপি বেছে নিয়েছে এক লড়াকু মুখকে - সম্রাট চৌধুরী (Samraj Choudhary)। যাঁর সামনে এখন ‘বিগ শ্যুজ টু ফিল’-এর চ্যালেঞ্জ। কারণ, যাঁর জায়গায় তিনি বসছেন, সেই নীতীশ কুমার বিহারের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে মিশে আছেন।
কে এই সম্রাট চৌধুরী?
১৯৬৮ সালে মুঙ্গেরে জন্ম সম্রাটের। রাজনীতি তাঁর রক্তে। তাঁর বাবা শকুনি চৌধুরী ছিলেন তারাপুর কেন্দ্রের ৬ বারের বিধায়ক, মা পার্বতী দেবীও ওই একই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন। ২০২৫-এর নির্বাচনে সম্রাট পুনরায় সেই পারিবারিক দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৯০ সালে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া সম্রাটের ঝুলিতে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা।
১৯৯৯ সালে রাবড়ি দেবীর সরকারে তিনি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। আরজেডি এবং জেডিইউ ঘুরে ২০১৭ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। গত এক দশকে বিজেপির একনিষ্ঠ এবং দাপুটে নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বিহার বিজেপির সভাপতি থেকে শুরু করে অর্থ, পঞ্চায়েত রাজ এবং নগরোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলেছেন ৫৭ বছর বয়সি এই নেতা।
কেন সম্রাট চৌধুরীকেই বেছে নিল বিজেপি?
বিজেপি বর্তমানে জাতপাতের অঙ্ক মেলাতে সিদ্ধহস্ত। সম্রাটের নির্বাচনও সেই সুচিন্তিত কৌশলেরই অংশ। আসলে সম্রাট চৌধুরী কুশওয়াহা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, যা বিহারের জনসংখ্যার প্রায় ৪.৩ শতাংশ। যাদবদের পর এটিই বিহারের বৃহত্তম ওবিসি (OBC) গোষ্ঠী।
তাছাডা় নীতীশ কুমার ছিলেন কুর্মি সম্প্রদায়ের নেতা। তাঁর প্রস্থানের পর জেডিইউ-এর অন্দরে তেমন কোনও বিকল্প নেতা নেই যিনি বিজেপির রথ থামাতে পারেন। তাই কুশওয়াহা নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করে বিজেপি আসলে আরজেডি-র ‘যাদব-মুসলিম’ ভোটব্যাঙ্ককে টেক্কা দিতে চাইছে।
সেই পাগড়ি আর প্রতিজ্ঞা
সম্রাট চৌধুরীর পরিচয় এখন তাঁর সেই ‘পাগড়ি’র সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ২০২২ সালে নীতীশ কুমার যখন বিজেপি ছেড়ে আরজেডি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, তখন সম্রাট প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নীতীশকে কুর্সি থেকে না সরানো পর্যন্ত তিনি মাথায় পাগড়ি বাঁধবেন। দীর্ঘ সময় সেই পাগড়ি পরে লড়াই করার পর, নীতীশ এনডিএ-তে ফিরে আসায় সম্প্রতি অযোধ্যায় গিয়ে রামলালার চরণে সেই পাগড়ি উৎসর্গ করেন তিনি। সম্রাটের সেই জেদ আজ তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ পদে বসাল।
বিজেপির জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার করলেও বিহারে কখনও তাদের নিজস্ব মুখ্যমন্ত্রী ছিল না। সম্রাট চৌধুরীর শপথ গ্রহণ সেই খরা কাটালো। এটি কেবল সম্রাটের জয় নয়, বিহারে নীতীশ কুমারের ছায়া থেকে বেরিয়ে বিজেপির নিজস্ব পরিচিতি তৈরির এক বড় সুযোগ।
জেডিইউ-এর ভবিষ্যৎ কী?
নীতীশ কুমারের প্রস্থান জেডিইউ-এর অস্তিত্ব রক্ষার সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় এতদিন দল যে ভোট পেত, তা এখন কোন দিকে যাবে? সম্রাটের উত্তরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিহারের শাসনভার এবং রাজনৈতিক বয়ান এখন পুরোপুরি পদ্ম শিবিরের নিয়ন্ত্রণে।
২০৩০ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সম্রাটের হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে নিজেকে প্রমাণ করার। নীতীশ কুমারের তৈরি করা শাসনের ধারা বজায় রেখে বিহারের অর্থনীতি ও পরিকাঠামোয় তিনি কতটা বদল আনতে পারেন, এখন সেটাই দেখার। তবে বিহারের চির-পরিবর্তনশীল রাজনীতিতে ‘মুখ্যমন্ত্রী হওয়া’ আর ‘মুখ্যমন্ত্রী টিকে থাকা’ যে এক নয়, তা সম্রাট চৌধুরী খুব ভাল করেই জানেন।