সেদিনের সেই সপ্তদশী ‘বিব্বি’ ওরফে ‘আখতারি বাই’—ই হলেন পরবর্তী কালের বেগম আখতার। আজ তাঁর ১১১-তম জন্মদিন।

সেই দিন শ্রোতা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সরোজিনী নাইডু।
শেষ আপডেট: 7 October 2025 13:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৩১ সাল, অ্যালফ্রেড থিয়েটার, কলকাতা। লোকে লোকারণ্য সভাঘর। একটি সাহায্যমূলক অনুষ্ঠানের জন্য দেশের তাবড় তাবড় শাস্ত্রীয় শিল্পীরা গাইবেন। অনুষ্ঠান উদ্বোধন হল, কিন্তু শুরুর দিকের যে শিল্পীদের গাওয়ার কথা তাঁদের তখনও দেখা নেই। গিলে করা পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে বার বার ঘাম মুছছেন উদ্যোক্তারা।
সেই সময় গ্রিনরুমে বসেছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত ওস্তাদ আতা মহম্মদ খাঁ। উদ্যোক্তাদের অবস্থা দেখে তিনি একজনের কাছে গিয়ে বললেন, দেখুন আমার সঙ্গে আমার শিষ্যা আছে। ও বেশ ভালোই গান করে। যদি আপনারা চান তাহলে ওকে আমি মঞ্চে তুলতে পারি। এতবড় একজন ওস্তাদ বলছেন, উদ্যোক্তারা যেন হাতে চাঁদ পেলেন। কিন্তু, শিল্পীর নাম শুনে উদ্যোক্তাদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। তার নাম বিবি।
এ আবার কেমন নাম? এসব নাম নিয়ে কলকাতায় স্টেজে উঠলে পাবলিক সিরিয়াসলি নেবে? নাম সমস্যার সমাধান সেখানেই হল, বিবি বা বিব্বির সৎভাইয়ের নাম সৈয়দ আখতার। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে সেখানেই নাম ঠিক করা হল ‘আখতারি’। দুরুদুরু বুকে স্টেজে উঠলেন আখতারিবাই। ভয়ে ভয়ে একটা গজল ধরলেন। শ্রোতারা বিহ্বল। গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাততালিতে ভরে গেল সভাঘর। আস্তে আস্তে মানসিক বল ফিরে পাচ্ছেন আখতারি। আরেকটি গান শুরু করলেন তিনি।
একটি গান শেষ হতে না হতেই শ্রোতাদের অনুরোধ, আরও একটা। শেষ পর্যন্ত গোঁজ শিল্পী হিসাবে নেমে আখতারি একঘণ্টার অনুষ্ঠানে পাঁচটি গজল ও দাদরা পরিবেশন করেন। সেই দিন শ্রোতা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সরোজিনী নাইডু। আখতারির গানে খুশি হয়ে অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে একটি খাদির শাড়ি উপহারস্বরূপ দেন তিনি।
খুব শীঘ্রই আখতারি মেগাফোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবিদ্ধ হন। ১৯৩৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। পয়সার জন্য কলকাতার থিয়েটার কোম্পানিতে অভিনয়ও করেন। অভিনয় করেন বেশ কিছু ছবিতেও। তাঁকে কলকাতা রেডিওতে গান গাওয়াতে নিয়ে যান জড্ডন বাই (অভিনেতা নার্গিসের মা)। সেটা ১৯৩৬ সাল। সেই শুরু।
Remembering the legendary ghazal and thumri singer
Begum Akhtar on her birth anniversary.
Her soulful music continues to touch hearts across generations.— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) October 7, 2025
সেদিনের সেই সপ্তদশী ‘বিব্বি’ ওরফে ‘আখতারি বাই’—ই হলেন পরবর্তী কালের বেগম আখতার। আজ তাঁর ১১১-তম জন্মদিন। মৃত্যু হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর। বাপের বাড়ির নাম ছিল আখতারি বাই ফৈজাবাদী। কলকাতাতেই প্রথম মঞ্চে হাতেখড়ি হয় গজল সম্রাজ্ঞী বেগম আখতারের। তাই এই শহরের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র ছিল আমৃত্যু। বাংলাতেও বেশ কয়েকটি রাগপ্রধান গজল গেয়েছেন তিনি। যা আজও মনে রেখেছে বাঙালি।
বিশেষভাবে সত্যজিৎ রায় ছিলেন বেগম আখতারের ভক্ত। জলসাঘর সিনেমায় বেগম আখতারকে দিয়ে অভিনয় ও গান দুটোই করিয়েছিলেন সত্যজিৎ। যদিও বায়নাটা ছিল সুর পরিচালক বিলায়েত খাঁসাহেবের। তাই সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধ টলাতে পারেননি আখতার সাহেবা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা মুশতারি বাঈয়ের হাত ধরে কলকাতায় এসেছিলেন সেই গান পাগল কিশোরী। সঙ্গে ছিলেন গুরু আতা মোহাম্মদ খাঁ। গুরুর পরামর্শেই কলকাতায় আসা। কথিত ছিল ভারতবর্ষের একমাত্র সঙ্গীত সমঝদার শহর এই কলকাতা।
শুধু আতা মহম্মদ খান নয়, বিবি পাতিয়ালা ঘরানার বরকত আলি খাঁ সাহেবের কাছে ঠুমরি শিখেছেন। দিনের পর দিন তালিম নিয়েছেন কিরানা ঘরানার আব্দুল ওয়াহিদ খাঁ সাহেবের কাছেও। এবং সবটাই কলকাতায় বসে। এখানে তিনি থিয়েটারেও যুক্ত ছিলেন। তারপর তৎকালীন বম্বে চলে যান সিনেমা করবে বলে। জদ্দন বাঈয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়। জদ্দন বাঈ বিবিকে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। কিন্তু সিনেমায় তিনি বেশিদিন থাকেননি।
বিবাহের প্রস্তাব পান লখনউয়ের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার কাবুলির নবাব ইশতিয়াক আহমেদ আব্বাসির কাছ থেকে। এই বিবাহের মধ্য দিয়ে তিনি লখনউয়ের অভিজাত শ্রেণিতে ঢুকে পড়েন। ধন-দৌলত, হিরে-জহরত আর উচ্চকোটির সমাজ পান। তবে ত্যাগ করতে হয় গান। সেটাই বিবাহের শর্ত ছিল। গানেওয়ালির জীবনে তিনি ফিরতে পারবেন না। এমন করে কিছু বছর চলার পর আর একাধিক বার মৃত সন্তান প্রসবের শেষে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ডাক্তার ইশতিয়াক সাহেবকে পরামর্শ দেন বেগমকে বাঁচাতে হলে গানে ফিরিয়ে দিতে হবে। ঠিক তখনই আরেকজন বাঙালি এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। তিনি হলেন আকাশবাণী লখনউয়ের ডিরেক্টর সুনীল বসু। তিনি ইশতিয়াক সাহেবকে বহু অনুরোধ করে বেগম আখতারের গান রেকর্ড করেন। বেগম আখতার গান গাইবেন বলে গ্রামাফোন কোম্পানিও গান রেকর্ডের প্রস্তাব দেয়। বেগম আখতার ধীরে ধীরে গান শিখতে এবং শেখাতে শুরু করেন। তিনি আর তখন আখতারি বাঈ ফৈজাবাদী নন, তাঁর নবজন্ম হয় ‘বেগম আখতার’ নামে।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জলসাঘরে অভিনয় ও গান করার পর কলকাতার সঙ্গে বেগম আখতারের সম্পর্ক আবার যেন জেগে উঠল। তিনি ঘন ঘন আসতে শুরু করলেন এই শহরে। বেগম আখতার কলকাতায় নিয়মিত আসছেন অথচ বাংলায় গান গাইবেন না তা কী করে হয়? উদ্যোগ নিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। তাঁর ডিক্সন লেনের বাড়িতেই রচিত ও সুরারোপিত হল একের পর এক কালজয়ী বাংলা গান। বেগম আখতারের কণ্ঠে! ‘কোয়েলিয়া গান থামা’, ‘প্রিয়া ভোলো অভিমান’, ‘ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে’, ‘চুপিচুপি চলে না গিয়ে’, ‘ফিরে যা ফিরে যা বনে’ কিংবা ‘জোছনা করেছে আড়ি’। গানগুলি বেশিরভাগই জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ-কৃত হিন্দি-উর্দু গানের বাংলা ভাবানুবাদ।