ভারত-নেপাল (India Nepal Border) সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম খোলা ও সহজলভ্য আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এখানে মানুষের যাতায়াত প্রায় অবাধ। নেপালে অস্থিরতা দেখা দিলে এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় নানা অপরাধী চক্র, চোরাকারবারি ও জঙ্গি সংগঠন।

নেপাল সঙ্কট, নয়াদিল্লির উদ্বেগ
শেষ আপডেট: 9 September 2025 15:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এ বড় কঠিন সময়। বড় কঠিন সময় ভারতের জন্যও। কারণ, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের পর এবার নেপালে অস্থিরতা (Nepal Crisis) তৈরি হয়েছে, সরকারের পতন ঘটেছে, এর পর কী হবে তা একেবারেই অনিশ্চিত। এ হেন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি তথা সাউথ ব্লকের উদ্বেগ ক্রমশই বাড়ছে। সূত্রের খবর, নেপাল পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার বা বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠক ডাকতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কাঠমান্ডু ক্রাইসিস নিয়ে তিনি লাগাতার রিপোর্ট নিচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের থেকে।
১. সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের আশঙ্কা
ভারত-নেপাল (India Nepal Border) সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম খোলা ও সহজলভ্য আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এখানে মানুষের যাতায়াত প্রায় অবাধ। নেপালে অস্থিরতা দেখা দিলে এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় নানা অপরাধী চক্র, চোরাকারবারি ও জঙ্গি সংগঠন।
অতীতে গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের আইএসআই নেটওয়ার্ক নেপাল হয়ে ভারতে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ করিয়েছে।
জাল নোট পাচারের জন্যও বহুবার নেপাল রুট ব্যবহার করা হয়েছে।
সম্প্রতি এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, খালিস্তানপন্থী গোষ্ঠী বা জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গিরা নেপালের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারতে ঢুকে পড়তে পারে।
ফলে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের মতো রাজ্যগুলোতে সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২. চিনের প্রভাব বৃদ্ধির কৌশল
নেপাল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের প্রভাববলয়ের অংশ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিন সেখানে ব্যাপক হারে পরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ শুরু করেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে কাঠমান্ডু সরকারের উপর চিনের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
চিন চাইছে নেপালকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অংশীদার করে তুলতে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশের একমাত্র পথ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’। এই অঞ্চলের কাছাকাছি চিনা প্রভাব বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
৩. মানবিক ও সামাজিক প্রভাব
ভারতে বসবাসরত এবং কর্মরত নেপালিদের সংখ্যা অনেক। তারা বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করেন, পড়াশোনা করেন এবং অনেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের অংশ।
নেপালে অস্থিরতা দেখা দিলে বিপুল সংখ্যক মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে প্রবেশ করতে পারে।
এতে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে সামাজিক চাপ ও মানবিক সঙ্কট তৈরি হবে।
একইসঙ্গে ভারতের শ্রমবাজারেও বাড়তি প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে।
৪. অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপড়েন
ভারত নেপালের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার।
নেপাল থেকে ভারত পায় হাইড্রোপাওয়ার (জলবিদ্যুৎ), পর্যটন ও কৃষিজাত পণ্য।
ভারত থেকে নেপালে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও ভোগ্যপণ্য রফতানি হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হিংসা এই অর্থনৈতিক লেনদেনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
৫. ভূ-রাজনৈতিক অভিঘাত
নেপালের অস্থিরতা শুধু ভারত-নেপাল সম্পর্ক নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব দুর্বল হলে, চিন ও পাকিস্তান মিলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
এতে ভারতের ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কূটনীতিকদের অনেকের মতে, নেপালের সঙ্কট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ভারতকে বারবার মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপ করতে হবে, যা তার কূটনৈতিক ও কৌশলগত মনোযোগকে অন্য জায়গা থেকে সরিয়ে দেবে।
সব মিলিয়ে, নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের কাছে শুধু একটি প্রতিবেশী দেশের সংকট নয়; এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব—এই চারটি ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দিল্লি খুব কাছ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ নেপালের স্থিতিশীলতা মানেই ভারতের উত্তর সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা।