মায়ের গয়না বেচে কেনা জুতোয় আজ আইপিএলের আঙিনায় সাকিব হুসেন! রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে রাতারাতি তারকা বিহারের এই তরুণ পেসার। কী ছিল তাঁর এই সাফল্যের পেছনের লড়াই? বিস্তারিত পড়ুন।

সাকিব হুসেন
শেষ আপডেট: 14 April 2026 14:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘জুতো অনেক দামি। ভালো বোলিং স্পাইক কিনতে ১০ থেকে ১৫ হাজার লাগে। ওই টাকা জুতোয় খরচ করলে খাব কী?’
কথাগুলো বিহারের এক তরুণ পেসারের। শূন্য থেকে শুরু করে নায়ক বনে যাওয়া—আইপিএলের জাদুকাঠি অনেকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তালিকায় নবতম সংযোজন সাকিব হুসেন (Sakib Hussain)। রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে ৪ উইকেট নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তিনি। এহেন আবির্ভাব অতর্কিত এবং অবশ্যই চমকপ্রদ। কিন্তু আকমসিক এই চর্চার, আচমকা সক্কলের নজরে চলে আসার রসদ? এর আড়ালে রয়েছে সুদীর্ঘ পরিশ্রম আর হার-না-মানা লড়াই। শারীরিক-মানসিক—দু’দিকেই নিজেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত নিংড়ে সাফল্যের উচ্চতম সোপানে সাকিব। কিন্তু কীভাবে? কোন দুর্গম পথ বেয়ে সুউচ্চ শৃঙ্গ ছুঁলেন তিনি?
বিহারের গোপালগঞ্জ। পাটনা থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে। তরুণ বোলারের সেখানেই বেড়ে ওঠা। কৃষক পরিবারের সন্তান। বাবার হাঁটুতে সমস্যা—অসময়েই চাষাবাদ ছেড়ে দেন। তাহলে মুখের গ্রাস জোগাবে কে? বাড়িতে আলো জ্বলবে কীভাবে? অন্য কোনও উপায় না থাকায়, খানিক পরিস্থিতির চাপে সাকিবকে পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিতে হয়।
তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। ছেলেবেলায় কাছের মাঠে দৌড়তেন। প্রতিদিন ভোরবেলা। নিপুণ অধ্যবসায়ের কারণে স্থানীয় কোচের নজরে। যিনি সাকিবকে খুব কাছ থেকে খুঁটিয়ে দেখে পরামর্শ দিলেন, ‘আর কিছু না… তুমি ক্রিকেটটাই খেলো!’
সেই শুরু। হাত পাকানো, বাকিদের মতোই, টেনিস বলে। পেশাদার ক্রিকেটের হাতেখড়িও, অন্য অনেকের মতো, খেপ খেলে। ১৫০ কিলোমিটার দূরে খেলতে গিয়ে ৫০০-৭০০ টাকা জুটত। কখনো-সখনো দু’হাজার। অভাবের সংসারে, নিজের স্বপ্নপূরণে ওই প্রাপ্তিটুকুই পথচলার শক্তি।
কিন্তু দুর্যোগ তো যুক্তি মানে না। চরমতম বিপদের দিনেও মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তেমনই একদিনকার কথা। জুতো হাতে কাঁদছিলেন সাকিব। ম্যাচ খেলতে বহুদূর যেতে হবে। খেললে টাকা আসবে। কিন্তু জুতো নেই। বোলিং স্পাইক ছাড়া মাঠে নামবেন কীভাবে?
এমন দুর্দিনে এগিয়ে আসেন মা। অভয় জোগান। আজ পুরনো স্মৃতি মনে করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ও কাঁদছিল। বলছিল, মা, জুতো নেই। খেলব কী করে? আমাদের কাছে টাকা ছিল না। তখন গয়না বেচে জুতো কিনে দিলাম!’
কষ্ট হল। কিন্তু পাশাপাশি সেদিন থেকে স্বপ্নটা শুধু সাকিবের নয়—পুরো পরিবারের হয়ে গেল।
ঘরোয়া ময়দান থেকে আইপিএল। জার্নিটা লম্বা। প্রথমে যোগ দেন কেকেআরে (Kolkata Knight Riders)। নেট বোলার হিসেবে। ২০২৪ ও ২০২৫—এই দুই মরসুমে দলে ছিলেন ঠিকই। কিন্তু একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ জোটেনি।
মনোবল ঘা খেলেও ভেঙে না পড়ে নতুন উদ্যমে ফিরে আসেন সাকিব। ২০২২-২৩ সিজনে বিহারের (Bihar Cricket) হয়ে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে (Syed Mushtaq Ali Trophy) দ্বিতীয় ম্যাচেই ৪ উইকেট ছিনিয়ে নেন—মাত্র ২০ রানে। বয়স তখন সবে ১৭। ২০২৫-২৬ সিজনে রঞ্জি ট্রফিতে (Ranji Trophy) অরুণাচল প্রদেশের বিরুদ্ধে ৬ উইকেট, ৪১ রানে।
ঘরোয়া মঞ্চে জাত চেনান তরুণ পেসার। প্রত্যাশিতভাবে, ফের নতুন করে আইপিএল স্কাউটদের নজরে আসা! এবার আর কেকেআর নয়… সানরাইজার্স হায়দরাবাদ (Sunrisers Hyderabad)। নিলামে ৩০ লক্ষ টাকায় কিনে নেয় সাকিবকে।
রাজস্থান রয়্যালসের (Rajasthan Royals) বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচ। শুরুতে স্বপ্নের অভিষেকে বৈভব-রিয়ানদের ফিরিয়ে ধস নামান প্রফুল্ল হিঙ্গে। কিন্তু কাজ তখনও বাকি। আইপিএলে পরিস্থিতি যে কোনও মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।
ঠিক এই সময় এন্ট্রি সাকিবের। দ্বিতীয় ওভারেই আউট করেন যশস্বী জয়সওয়ালকে (Yashasvi Jaiswal)। এরপর ভেঙে দেন ডোনোভান ফেরেইরা (Donovan Ferreira) ও রবীন্দ্র জাদেজার (Ravindra Jadeja) ১১৮ রানের জুটি। যে কারণে হঠাৎ করে ছন্দে ফিরে পাওয়া রাজস্থান গুটিয়ে যায় ১৫৯-এ। সাকিবের বোলিং পরিসংখ্যান—২৪ রান খরচ করে ঝুলিতে ৪ উইকেট!
‘ওর উপর বিশ্বাস ছিল। পরিশ্রম করেছে। আমরা জানতাম, একদিন কিছু একটা হবে!’ বলছেন গর্বিত কাকা। আর মা? তাঁর চোখ অশ্রুছলছল। গয়না বেচে জুতো কিনে দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু মায়ের মান রেখেছে ছেলে। কাঁটাওয়ালা জুতোয় ময়দান-দাপানো দুরন্ত স্পেল। যার প্রতিটি ডেলিভারিতে হিরের দ্যুতি… গর্বিত মায়ের চোখের জল।