কাঠমাণ্ডুতে (Kathmandu) সংসদ ভবনের সামনে নেমে আসেন তরুণ-তরুণীরা (Nepal Protest)। তাদের হাতে পতাকা, কণ্ঠে স্লোগান— “হামরো আওয়াজ”।

অগ্নিগর্ভ নেপাল।
শেষ আপডেট: 9 September 2025 14:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় (Nepal Protest)। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির (KP Sharma Oli) সরকারকে বিক্ষোভকারীরা ডাকছে ‘হত্যারা সরকার’ নামে (Nepal Crisis)। আগেই পদত্যাগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক। এই প্রতিবেদন লেখার মুহূর্তে খবর যে, সেনাবাহিনীর পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কেপি শর্মা ওলিও। তবে তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি, বরং বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। মৃত্যু, হিংসা আর ক্রোধে দগ্ধ হচ্ছে কাঠমান্ডু।
৮ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুতে সংসদ ভবনের সামনে নেমে আসেন তরুণ-তরুণীরা। তাদের হাতে পতাকা, কণ্ঠে স্লোগান— “হামরো আওয়াজ”। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন শতাধিক। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ, যাদের পরিচয় জেন জি প্রজন্ম হিসেবে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হঠাৎই রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হয়। জাতিসংঘ সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা নিহতদের প্রতি শোকপ্রকাশ করেছে এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি নিন্দা করেছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর সরকার একসঙ্গে ২৬টি সামাজিক মাধ্যম—ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (টুইটার) সহ জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিষিদ্ধ করে নেপাল সরকার। সরকারের যুক্তি, স্থানীয় আইন মানতে এই প্ল্যাটফর্মগুলো রাজি হয়নি। অথচ নেপালের মোট ৩ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬৫ লক্ষ সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা জনগণের কাছে পৌঁছেছে ‘মুখ বন্ধ করার চেষ্টা’ হিসেবে।
Jay Nepal pic.twitter.com/wKe03kd8rh
— lsagi (@howboutdizznutz) September 8, 2025
ডিজিটাল অর্থনীতি, আয়ের পথ, বিদেশে থাকা প্রবাসী নেপালিদের সঙ্গে যোগাযোগ—সব কিছুই এই প্ল্যাটফর্মগুলির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠেছে অভিব্যক্তি ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। তাই সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যুবসমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী ওলির বাড়ি, রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেলের বাড়ি এবং তথ্য মন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুংয়ের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলের বাসভবনে ছোঁড়া হয়েছে পাথর। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষমেশ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি।
ওলির নেতৃত্ব নিয়ে আগেও স্বৈরাচারিতার অভিযোগ উঠেছিল। সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া—এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নতুন নয়। সম্প্রতি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারীকে দলের নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে না দেওয়ার ঘটনাও ওলির ক্ষমতালিপ্সার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
২০০৮ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নেপালে এখনও পর্যন্ত কোনো সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। গত ১৭ বছরে দেশটি দেখেছে এক ডজনেরও বেশি প্রধানমন্ত্রী। বারবার বদলে যাওয়া জোট সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। এতে নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়নের কাজ কার্যত থমকে রয়েছে।
কিছুদিন আগেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল তরুণ প্রজন্ম। চরম বিক্ষোভের মুখে তাকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে হয়। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, নেপাল কি তবে সেই পথেই হাঁটছে? কাঠমান্ডুর তরুণরা কি একটি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছে?
ওলির পদত্যাগ পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেনি। বরং এখন প্রশ্ন উঠছে, নেপালের সামনে কি অপেক্ষা করছে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়? নাকি আবারও অস্থিরতার ঘূর্ণাবর্তে আটকে পড়বে দেশটি? উত্তর সময়ই দেবে, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নেপালের তরুণ প্রজন্ম আর চুপ করে থাকতে রাজি নয়।