আন্তর্জাতিক এক সংবাদ সংস্থা এই তথ্য-প্রমাণগুলি সংগ্রহ করেছে এবং আবু দাখা ও তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে ইটালিতে পৌঁছানোর পর কথাও বলেছে। একইসঙ্গে, তারা গাজায় অবস্থানরত তার পরিবারের সদস্যদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 15 September 2025 16:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক বছরের বেশি সময়, হাজার হাজার ডলার খরচ, অদম্য সাহস এবং একটি জেট স্কি (Jet Ski) — এভাবেই গাজা (Gaza) থেকে ইউরোপে (Europe) পৌঁছাতে সক্ষম হলেন ৩১ বছর বয়সী যুবক মহম্মদ আবু দাখা। তিনি প্যালেস্টাইনের (Palestine) বাসিন্দা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে তাঁর এই দুঃসাহসিক যাত্রার কাহিনি ভিডিও, ছবি এবং অডিওর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক এক সংবাদ সংস্থা এই তথ্য-প্রমাণগুলি সংগ্রহ করেছে এবং আবু দাখা ও তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে ইটালিতে পৌঁছানোর পর কথাও বলেছে। একইসঙ্গে, তারা গাজায় অবস্থানরত তার পরিবারের সদস্যদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধের (Israel-Hamas War) প্রায় দু'বছর পর গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এই যুদ্ধে ৫৭ হাজারের বেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে আবু দাখা ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৫ হাজার ডলার খরচ করে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে মিশরে প্রবেশ করেন। তারপরই শুরু হয় তাঁর অবিশ্বাস্য যাত্রা।
চিন থেকে ফিরে আসা
আবু দাখা জানান, তিনি প্রথমে চিনে গিয়েছিলেন এই আশায় যে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবেন। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তিনি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে আবার মিশরে ফিরে আসেন। এরপর আবু দাখা লিবিয়া যান। কিন্তু আবু দাখার ইউরোপে পৌঁছানোর পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
আবু জানান, চোরাকারবারিদের সঙ্গে তার ১০টি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি একটি পুরনো ইয়ামাহা জেট স্কি প্রায় ৫ হাজার ডলারে লিবিয়ার একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস থেকে কেনেন। এছাড়াও, তিনি জিপিএস, স্যাটেলাইট ফোন এবং লাইফ জ্যাকেটের মতো অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য আরও ১ হাজার ৫০০ ডলার খরচ করেন।
তার সঙ্গে আরও দুই প্যালেস্টিনি ছিলেন - ২৭ বছর বয়সী দিয়া এবং ২৩ বছর বয়সী বাসেম। আবুর কথায়, তারা প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে জেট স্কি চালিয়েছিলেন। একটি তিউনিসীয় টহলদারি নৌকা থেকে বাঁচতে এবং অতিরিক্ত রসদ নিয়ে একটি ডিঙি নৌকা টেনে তারা এই যাত্রা করেন।
আসলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিবিয়ায় হাজার হাজার অভিবাসীকে মানবপাচারকারী এবং মিলিশিয়াদের হাতে নিয়মিতভাবে নির্যাতন এবং শোষণের শিকার হতে হয়, যখন তারা ইউরোপে যাওয়ার জন্য কোনও নৌকায় জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করে। ইটালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এই বছর এখন পর্যন্ত ৪৭ হাজারের বেশি অভিবাসী নৌকায় করে ইটালিতে পৌঁছেছে, যাদের বেশিরভাগই লিবিয়া এবং তিউনিসিয়া থেকে এসেছে।
আবু সহ এই তিন যুবক তাঁদের যাত্রায় কত জ্বালানি লাগবে তা হিসেব করার জন্য চ্যাট জিপিটি (ChatGPT) ব্যবহার করেছিল, কিন্তু এরপরও ল্যাম্পেডুসা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। এরপর তারা সাহায্যের জন্য ফোন করতে সক্ষম হন। ফলে তাদের উদ্ধার করা হয় এবং তারা গত ১৮ অগস্ট ইতালির সবচেয়ে দক্ষিণের দ্বীপে পৌঁছন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রোনটেক্স (Frontex)-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, রোমানিয়ান টহল নৌকা তাদের উদ্ধার করে। এই ঘটনাকে তিনি 'অস্বাভাবিক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইউএনএইচসিআর ইটালির মুখপাত্র ফিলিপ্পো উঙ্গারো বলেন, "তারা যে উপায়ে এসেছেন তা সত্যিই ব্যতিক্রমী।" এছাড়াও তিনি নিশ্চিত করেন যে, লিবিয়ার আল-খোমস বন্দর থেকে জেট স্কি নিয়ে ল্যাম্পেডুসা উপকূলে পৌঁছনোর পর কর্তৃপক্ষ তাদের আগমনের তথ্য নথিভুক্ত করেছে। সরাসরি পথে আল-খোমস থেকে ল্যাম্পেডুসার দূরত্ব প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার।
আবু দাখা ল্যাম্পেডুসার অভিবাসী কেন্দ্রে থাকার সময় এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, সেখানকার একজন কর্মী তাকে জানিয়েছেন যে, স্থানীয় গণমাধ্যমে তার জেট স্কি-তে করে আসার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপর থেকে তিনি সব তথ্য ও নথি শেয়ার করেন।
ল্যাম্পেডুসা থেকে জার্মানি
ল্যাম্পেডুসা থেকে তাদের এই দুঃসাহসিক যাত্রা অব্যাহত থাকে। তিনজনকে একটি ফেরিতে করে সিসিলির মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিম ইটালির জেনোয়াতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তারা বাস থেকে পালিয়ে যান। ইটালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন মুখপাত্র জানান, তাদের তিনজনের গতিবিধি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
কিছু ঘণ্টা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকার পর আবু দাখা জেনোয়া থেকে ব্রাসেলসে একটি বিমানে করে যান। তিনি জানান, ব্রাসেলস থেকে তিনি জার্মানি ভ্রমণ করেন। প্রথমে ট্রেনে করে কোলোন, তারপর ওসনাব্রুকে যান, যেখানে তাঁর এক আত্মীয় তাঁকে গাড়ি করে নিকটবর্তী শহর ব্রামশে-তে নিয়ে যান।
আবু দাখা এখন জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন এবং একটি আদালতের শুনানির অপেক্ষায় আছেন, যার কোনও তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি। বর্তমানে তার কোনও চাকরি বা আয় নেই এবং তিনি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি স্থানীয় কেন্দ্রে রয়েছেন। জার্মানির ফেডারেল অফিস ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজিস তার মামলার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি।
আবুর পরিবার এখনও গাজার খান ইউনিসের একটি তাঁবু শিবিরে রয়েছে, কারণ তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আবু দাখার বাবা ইন্তেসার খুদের গাজা থেকে বলেন, "তার একটি ইন্টারনেট দোকান ছিল এবং আর্থিকভাবে সব কিছুই ভাল ছিল। সে অনেক কিছু তৈরি করেছিল, এবং এখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।"
এই মুহূর্তে আবু জার্মানিতে থাকার অধিকার পাওয়ার এবং তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে (যাদের বয়স চার এবং ছয়) নিয়ে আসার আশা রেখেছেন। তাঁর কথায় - পরিবার ছাড়া জীবনের কোনও অর্থ নেই।