সমস্যা বাথরুমে নয়, লুকিয়ে আছে রান্নাঘরে! নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য— কাঁচা মাংস ও চপিং বোর্ডেই লুকিয়ে থাকতে পারে সংক্রমণের আসল কারণ।

ছবি-এআই
শেষ আপডেট: 30 October 2025 12:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রস্রাবের সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI)-এর কথা উঠলেই আমরা প্রথমেই ভাবি শৌচালয়ের কথা, জোর দিই নিজের পরিচ্ছন্নতার দিকেও। ভাবি, নিশ্চয়ই কোথাও হাত ধোওয়া বা সুলভ শৌচালয় ব্যবহারের অভ্যাসে ভুল ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা সেই পুরনো ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছে। একটি নতুন কারণ সামনে এসেছে, তা হল রান্নাঘর!
গবেষকরা গবেষণা করতে গিয়ে দেখলেন, যে ব্যাকটেরিয়ার কারণে ইউটিআই হয়, সেই 'ই. কোলাই'-এর (E. coli) স্বভাবটা কেমন যেন বদলে গেছে। আমরা সাধারণত এই ই. কোলাই-কে পেট খারাপ বা ডায়েরিয়ার জন্য দায়ী বলে জানতাম। কিন্তু এই নতুন গবেষণায় দেখা গেল, ইউটিআই-এ আক্রান্ত হওয়া প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের শরীরে যে ই. কোলাই পাওয়া গেছে। তার জিনের ছাপ হুবহু মিলে যাচ্ছে বাজার থেকে কেনা মাংসের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে!
ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, তাই না? বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ১৮% ইউটিআই বাথরুমের কারণে হয় না। বরং হয় বেশিরভাগ সময় আমাদের রান্নাঘরে কাটানোর জন্য! মুরগি, টার্কি, শুয়োর বা গরুর মাংস – এই সব কাঁচা মাংসে লুকিয়ে থাকা এই ব্যাকটেরিয়াগুলোই নাকি চুপিসারে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে পোলট্রি (মুরগি ও টার্কি)-তেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।
ইউটিআই কী, কেন হয়?
ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা মূত্রনালীর সংক্রমণ হল মূত্রতন্ত্রের কোনও অংশে জীবাণুর আক্রমণ। এই তন্ত্রের মধ্যে রয়েছে কিডনি, ইউরেটার, ব্লাডার (মূত্রথলি) ও ইউরেথ্রা। সাধারণত সংক্রমণ হয় নিচের দিকের অংশে— অর্থাৎ ব্লাডার ও ইউরেথ্রায়। মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। হালকা ক্ষেত্রে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ ইত্যাদি দেখা যায়, তবে সংক্রমণ কিডনিতে পৌঁছলে তা গুরুতর রূপ নেয়।
UTI সাধারণত ঘটে যখন ব্যাকটেরিয়া ইউরেথ্রা দিয়ে মূত্রনালীতে প্রবেশ করে ব্লাডারে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক সময় এই ব্যাকটেরিয়াকে ঠেকাতে পারে না। সবচেয়ে সাধারণ জীবাণু সেই E. coli, যা সাধারণত অন্ত্রে থাকে কিন্তু কখনও কখনও মূত্রনালীতে চলে আসে। যৌনসংক্রমিত রোগ যেমন গনোরিয়া বা ক্ল্যামাইডিয়াও ইউরেথ্রার সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
সময়মতো চিকিৎসা না হলে সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে গিয়ে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ শিশুর ওজন ও সময়ের আগেই জন্মের ঝুঁকি বাড়ায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে বারবার সংক্রমণে ইউরেথ্রা সরু হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হল সেপসিস— যেখানে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি করে।
কিন্তু মাংস থেকে ইউটিআই হয় কী করে?
বিজ্ঞানীরা জানালেন, এটা খুব একটা স্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং আমাদের কিছু ছোট্ট ভুলের পরিণতি। যেমন ধরুন, আপনি একটি চপিং বোর্ডে কাঁচা মুরগি কাটলেন। সেই বোর্ডটি ভাল করে না ধুয়েই তার ওপর পেঁয়াজ বা টমেটো কাটলেন। ব্যাস! মুরগির ব্যাকটেরিয়া সবজিতে চলে গেল।
কাঁচা মাংস ধরার পর সেই অপরিষ্কার হাতেই হয়তো আপনি মশলার কৌটো ধরলেন, ফ্রিজের হাতল স্পর্শ করলেন, কিংবা থালা-বাসন সরালেন। রান্নাঘরের সারফেসগুলোতে জীবাণুর আস্তানা তৈরি হল। আর সেই জীবাণু আপনার হাতেই রয়ে গেল।
এরপর যখন সেই হাতে আপনি নিজের জামা-কাপড় ঠিক করছেন বা গোপনাঙ্গ স্পর্শ করছেন, ঠিক তখনই ব্যাকটেরিয়া সুযোগ বুঝে মূত্রনালীর দিকে এগিয়ে যায়।
ভারতের জন্য কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের দেশে ইউটিআই খুবই সাধারণ একটি সমস্যা, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। মাংস-বাহিত সংক্রমণের নির্দিষ্ট তথ্য যদিও কম, কিন্তু আমাদের রান্নাঘরের অভ্যাসগুলো ভাবার মতো। একই ছুরি, একই চপিং বোর্ড, একই স্পঞ্জ দিয়ে সব কাজ করা, এবং অনেক সময় মাংস ধোয়ার জল চারিদিকে ছড়িয়ে যাওয়া। এই গবেষণা আমাদের বলছে—শরীর সুস্থ রাখতে হলে এখন থেকে বাথরুমের পাশাপাশি রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি নিয়েও সচেতন হতে হবে।
চপিং বোর্ডের দিকে নজর দিন!
তাই, যদি আপনার পরিচিত কারও বারবার ইউটিআই হয়, তবে শুধু জল পান বা পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেবেন না। রান্নাঘরের দিকে তাকান! আপনার চপিং বোর্ড, স্পঞ্জ এবং মাংস কাটা-ধোয়ার অভ্যাস, এই তিনটি জিনিস বদলে ফেলতে পারলেই আপনি হয়তো সেই "পাঁচজনের মধ্যে একজন" হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারবেন।