আজকাল বহু মহিলাই স্ট্রেসের কারণে অনিয়মিত পিরিয়ড, হেভি ব্লিডিং অথবা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 16 August 2025 20:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘ সময় ধরে অফিসের চাপ, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা সামলানো আজকের যুগে মহিলাদের জীবনের বিশেষ অঙ্গ হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে যোগ হয়েছে বাড়তি মানসিক চাপ। সব মিলিয়ে বর্তমানে একটা সাধারণ, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন প্রায় সবার কাছেই স্ট্রেসের কারণ হয়ে উঠেছে। আর তার গুরুতর প্রভাব পড়ছে শরীরে, বিশেষ করে প্রতি মাসের পিরিয়ড সাইকলে।
গুরগাঁওয়ের সি কে বিরলা হাসপাতালের অবস্টেট্রিকস ও গাইনেকোলজির ডিরেক্টর এবং ‘মৈত্রী’-র প্রতিষ্ঠাতা ডা. অঞ্জলি কুমার জানিয়েছেন, আজকাল বহু মহিলাই স্ট্রেসের কারণে অনিয়মিত পিরিয়ড, হেভি ব্লিডিং অথবা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন।
কেন স্ট্রেসের এমন প্রভাব পড়ে পিরিয়ডের সাইকলে?
ডা. কুমার ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতি মাসে পিরিয়ড সাইকল নিয়ন্ত্রিত হয় কিছু হরমোনের জটিল ভারসাম্যের মাধ্যমে - ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, FSH, LH। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে Hypothalamic–Pituitary–Ovarian (HPO) axis। কিন্তু যখন শরীর চাপে থাকে, তখন সক্রিয় হয় Hypothalamic–Pituitary–Adrenal (HPA) axis, যা থেকে নিঃসরণ হয় কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে HPO axis-এর স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়, আর তাতেই গোলমাল বাঁধে পিরিয়ডের গোটা সাইকলে।
স্ট্রেসের প্রভাবে শরীরে সাধারণত ৫টি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়
১) অনিয়মিত পিরিয়ড
ক্রমাগত স্ট্রেসের প্রভাবে ওভ্যুলেশন (ovulation) দেরিতে বা আগে হতে পারে। ফলে পিরিয়ড কখনও আগে, কখনও পরে আসতে পারে। পিরিয়ড সাইকল ছোট (২১ দিনের কম) বা বড় (৩৫ দিনের বেশি) হতে পারে।
২) পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া (Amenorrhea)
অতিরিক্ত স্ট্রেস অনেক সময় ওভ্যুলেশন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে একেবারেই পিরিয়ড হয় না।
৩) অতিরিক্ত বা কম ব্লিডিং
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ইউটেরাসের আস্তরণ বদলে যায়। ফলে কখনও অতিরিক্ত, কখনও খুব কম ব্লিডিং হয়।
৪) পিরিয়ডের সময় তীব্র পেটে, কোমরে ব্যথা (Dysmenorrhea)
স্ট্রেস শরীরে পেশির টান ও ইনফ্লেমেশন বাড়িয়ে দেয়। এতে পিরিয়ডের সময় সাধারণ তলপেটে ব্যথা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
৫) পিএমএস (PMS) বেড়ে যাওয়া
স্ট্রেসের সরাসরি প্রভাবে চাপ পড়ে মানসিক স্থিতিতেও। ফলে খিটখিটে মেজাজ, মুড সুইং, ক্লান্তি - এইসব লক্ষণ আরও বেড়ে যায়।
শরীর কেন এভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়?
ডা. কুমার জানালেন, “বিবর্তনের নিয়ম বলে (evolutionarily) শরীর যখন চরম স্ট্রেসের মধ্যে থাকে, তখন সেটা একধরনের বিপদের সংকেত মনে করে। তখন শরীর বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, আর প্রজনন বা রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। তাই পিরিয়ডের সাইকলে বাধা আসে, নানারকম সমস্যা দেখা দেয়।”
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করতে শিখলে স্বাভাবিক থাকবে পিরিয়ড সাইকল, কীভাবে সম্ভব – জানালেন ডা. কুমার
১) রিল্যাক্সেশন টেকনিক প্র্যাকটিস করুন — যোগাসন, মেডিটেশন, গভীর শ্বাস নেওয়ার (deep breathing) প্র্যাকটিস কর্টিসলের মাত্রা কমায়।
২) শরীরচর্চা করুন — হালকা ব্যায়াম, শরীরচর্চা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অ্যাংজাইটি কমায়।
৩) পুষ্টিকর খাবার ডায়েটে যোগ করুন — সুষম খাবার হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৪) পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন — প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা গভীর ঘুম জরুরি। কম ঘুম স্ট্রেসের অন্যতম বড় কারণ।
৫) পেশাদার সাহায্য নিন — স্ট্রেস সামলানো কঠিন হয়ে উঠলে কাউন্সেলিং বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন গাইনেকোলজিস্টের কাছে যাবেন?
• টানা তিন মাস পিরিয়ড না হলে (প্রেগন্যান্সি না থাকলেও)।
• খুব বেশি পিরিয়ড ব্লিডিং বা তীব্র ব্যথা থাকলে।
• অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, চুল পড়া, বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে।
ডা. কুমার সতর্ক করে বলেছেন, এসব লক্ষণকে হালকা ভাবে নিলে চলবে না। এগুলো থাইরয়েড সমস্যা, পিসিওএস বা পেরিমেনোপজ-এরও ইঙ্গিত হতে পারে।