ভারতে হু হু করে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের (infertility) সমস্যা। লাইফস্টাইলের (lifestyle disorder) প্রভাব, দেরিতে মা-বাবা হওয়ার প্রবণতা (delayed parenthood) এবং খাদ্যাভ্যাস-সহ একাধিক কারণ এর পিছনে রয়েছে। ঠিক কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
.jpeg.webp)
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 11 December 2025 15:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিকিৎসা প্রযুক্তি (Medical Technology) যত এগোচ্ছে, সন্তান ধারণে অক্ষম দম্পতির সংখ্যা তত দ্রুত বাড়ছে, বলছে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা। দেশের অসংখ্য ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ (Fertility Specialists) গত কয়েক বছরে বিভিন্নভাবে সমীক্ষা করে দেখেছন, ২০-এর শেষভাগ আর ৩০-এর দশকে থাকা দম্পতিদের মধ্যেই ইনফার্টিলিটি সবচেয়ে বেশি, সংখ্যাটা বাড়ছেও হু হু করে।
পিসিওএস (PCOS), এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis), লো ওভ্যারিয়ান রিজার্ভ (Low Ovarian Reserve) বা খারাপ স্পার্ম-কোয়ালিটি (Poor Sperm Quality) ছাড়াও আজ নতুন করে যুক্ত হয়েছে এক বিপজ্জনক কারণ, আধুনিক জীবনযাত্রা (Modern Lifestyle)। চিকিৎসকরা বলছেন, সারাদিনের স্ট্রেস, সকাল থেকে রাত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং খাদ্যাভ্যাসের অবনতি- সবকিছু মিলেই জন্ম দিচ্ছে এক নতুন প্রকার সমস্যা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘লাইফস্টাইল ডিসঅর্ডার অফ ইনফার্টিলিটি’ (Lifestyle Disorder of Infertility)।
স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS)-এর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ভারতের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate) নেমে এসেছে ১.৯-এ, যা রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ২.১-এর নীচে। দিল্লি, কর্নাটক, পঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৮টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এখন রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের নীচে। প্রথমবার গ্রামীণ ভারতও নেমে এসেছে ২.১-এ, আর শহুরে ভারতের TFR মাত্র ১.৫। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ১৫ থেকে ২৯ বছরের মহিলাদের মধ্যে প্রজনন হার দ্রুত কমছে, আর বাড়ছে ৩০ ঊর্ধ্বদের মধ্যে। এর থেকে স্পষ্ট, দেরিতে সন্তান নেওয়া এখন দেশের প্রজনন প্যাটার্ন বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
চণ্ডীগড়ের মিলান ফার্টিলিটি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাঃ সাবিয়া মাঙ্গট জানাচ্ছেন, আজ বহু দম্পতি প্রথমে কেরিয়ার (Career), আর্থিক স্থিতিশীলতা (Financial Stability) বা ব্যক্তিগত লক্ষ্য (Personal Goals) অর্জন করেই মা-বাবা হতে চান। কিন্তু জীববিজ্ঞানের নিয়ম ভিন্ন। মহিলাদের ডিম্বাণুর মান এবং সংখ্যা ৩২-এর পর থেকেই দ্রুত কমতে থাকে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও অনিয়মিত জীবনযাপন, ধূমপান-অ্যালকোহল, রাতজাগা, চাপে ভরা কাজ-সবই কমিয়ে দিচ্ছে স্পার্ম কাউন্ট ও মোটিলিটি।
শহুরে জীবনের চাপ আরও বিপজ্জনক। দীর্ঘ কর্ম সময়, স্ক্রিন-নির্ভর জীবন, অনিয়মিত ঘুম এবং টালমাটাল জীবনযাপনে বাড়ছে হরমোনাল ইমব্যাল্যান্স (Hormonal Imbalance)। এর প্রভাব পড়ছে ওভ্যুলেশন, টেস্টোস্টেরন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, এমনকি IVF সাফল্যের হার (IVF Outcome)–এর ওপরও। একই সঙ্গে বাড়ছে স্থূলতা (Obesity)- ইনফার্টিলিটির সবচেয়ে বড় লাইফস্টাইল-ফ্যাক্টর।
পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসও (Diet) এক বড় কারণ। প্রসেসড ফুড, চিনি, অতিরিক্ত সোডিয়াম, ফাস্টফুডের বাড়বাড়ন্ত শরীরে তৈরি করছে ইনফ্ল্যামেশন এবং মেটাবলিক সমস্যা। যা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রজনন স্বাস্থ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল, শাকসবজি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও পুষ্টিকর খাবারই পারে হরমোনকে সুষম রাখতে এবং ডিম্বাণু-স্পার্মের গুণমান বাড়াতে।
পরিবেশ (Environment) থেকেও আসছে বিপদ। বায়ুদূষণ, প্লাস্টিসাইজার, কীটনাশক, কসমেটিক্স-হাউসহোল্ড ক্লিনারের রাসায়নিক-সবই এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টর (Endocrine Disruptor)। এগুলি মাসিক চক্র, স্পার্ম ম্যাচিউরেশন এবং এমব্রায়ো ইমপ্লান্টেশনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক চাপ (Emotional Stress)। ব্যস্ত জীবনে দম্পতিরা নিজেদের জন্য সময়ই পাচ্ছেন না। ফলে উদ্বেগ, হতাশা, বার্নআউট, সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে বিরাট সমস্যা, যেখানে শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই কমছে প্রজনন ক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনফার্টিলিটিকে লাইফস্টাইল ডিসঅর্ডার হিসেবে চেনা এবং সময় থাকতে সচেতন হওয়াই সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ। নিয়মিত স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম, স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্ট, ধূমপান-অ্যালকোহল ছেড়ে দেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম- এ সবই পারে পরিস্থিতি বদলাতে। আর দেরিতে প্যারেন্টহুড চাইলে, এগ বা স্পার্ম ফ্রিজিং (Fertility Preservation) এখনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।