দিনশেষে পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের মতো ট্যাবুতে ঘা মেরেছেন, খুলে দিয়েছেন তর্কের জমি, খোলামেলা আলোচনার পরিসর—এই কারণে প্রমিতা ভৌমিকের প্রথম বড় মাপের কাজটিকে ন্যায্য প্রশংসা জানাতেই হয়৷

চলচ্চিত্র: 'অহনা'
শেষ আপডেট: 4 September 2025 13:06
ধরা যাক, আমি নির্দেশক। শ্রমিক ধর্মঘট নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাতে চাই। তাহলে নির্মাতা হিসেবে কী কী দেখাব আর কী কী দেখাব না, ছবি শুরুর আগেই আমায় লিখে ফেলতে হবে তার নিপুণ ফর্দ। ধর্মঘটী মানুষদের স্বেদ-রক্ত-অশ্রুজল যদি অভিনয়, সংলাপ, আবহ ও চিত্রনাট্যের মধ্যে ধরা না পড়ে, তাদের সংগ্রাম আর বিপর্যয়ের মানবিক আবেদনই ফুটে না ওঠে… বদলে জমতে থাকে ইস্তেহারের পুঞ্জ, স্লোগানের তর্জন, দাবি আদায়ের গর্জন… তাহলে উদ্দেশ্য ‘মহৎ’ হলেও গোটা নির্মাণ ‘ব্যর্থ’ হতে বাধ্য। সার্থক ও সমাজ-শোধক প্রোপাগান্ডা হিসেবে হয়তো তাকে দশে দশ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু শিল্পের নিক্তিতে মূল্য যৎকিঞ্চিৎ!
ঠিক এই কথাটাই খেটে যায় প্রমিতা ভৌমিকের সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত, কেরিয়ারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘অহনা'র ক্ষেত্রে। শর্ট ফিল্মে হাতেখড়ি আগেই হয়েছিল। বছর দুই আগে ‘প্রবাহ’ ও ‘পরিচয়’ নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানান প্রমিতা। এবার হাত পাকালেন ফিচার ফিল্মে।
কেন্দ্রে পিতৃতন্ত্রের বিষবৃক্ষ। আর তাকে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে বেড়ে ওঠা পুরুষবন্ধ্যাত্বের অন্ধকার, নারী-স্বাধীনতার দমচাপা আর্তনাদকে সেলুলয়েডের পর্দায় রূপ দিতে চেয়েছেন পরিচালক। বেশ কিছু অকথিত কিন্তু জটিল সমস্যায় সার্চলাইট ফেলেছেন৷ টেনে বের করতে চেয়েছেন সাজানো-গোছানো সংসার আর সুশীল-পরিপাটি সমাজের আড়ালে লুকোনো চাপ চাপ আঁধার।
কিন্তু এই লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এতটাই প্রবলভাবে নিজেকে জাহির করে যে, শিল্পের ধুকপুকুনি, সৌন্দর্যের স্পন্দন কোথাও যেন হারিয়ে যায়৷ প্রোপাগান্ডার চোরাবালিতে খাবি খায় ফিল্মের আবেদন, তত্ত্ব যেন খোঁচা মারা বল্লমের মতো সারাক্ষণ মুখ উঁচিয়ে থাকে!
শুরুটা মন্দ ছিল না যদিও। ময়দানের ঘন নীল কুয়াশার স্তর ভেঙে এগিয়ে চলেছে এক মেয়ে। ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রবহমান বাতাসের শব্দ। অদ্ভুত এক স্বপ্নমদির সিকোয়েন্স কাব্যিক মূর্ছনায় নি:সঙ্গতা ও বিষাদের ধরতাই বেঁধে দেয়! দ্বিতীয় কাটে বাথরুমে খুলে দেওয়া কল থেকে অবিরাম ঝরে পড়া জলের শব্দ এবং মুখ গুঁজে বসে থাকা বাচ্চা মেয়ের চাহনিতে বিষণ্ণতা আরও ঘন হয়।
ঠিক তারপরের সিনেই কংক্রিটের শহরের নিপাট সংসারে বসে ডায়েরি লেখে অহনা (সুদীপ্তা চক্রবর্তী)—ছবির নায়িকা বললে পুরোটা বলা হয় না… আসলে ভরকেন্দ্রই বটে! শিক্ষিত মেয়ে। রুচিবান। সংবেদনশীল। প্রগতিমনা। এবং জীবনজিজ্ঞাসু। সবকিছু তলিয়ে ভাবে, ভাবার পর লিখে রাখে। কখনও দিনলিপির আকারে। কখনও তাঁর যন্ত্রণাই হয়ে ওঠে কবিতা। নয়তো উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি।
অহনার ঠিক উল্টোধাঁচের মানুষ তার স্বামী রুদ্রনীল (জয় সেনগুপ্ত)। পেশাদার দুনিয়ায় সফল। অধ্যাপক। উচ্চাশী। বাঁধা মাসমাইনের নিরাপত্তা আর কেরিয়ারের সিঁড়ি ভেঙে ওঠার গুমর তার শরীরী ভাষায় স্পষ্ট। গভীরে গিয়ে চিন্তা করতে নারাজ। অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ, যদি তার আচরণের সমালোচনা হয়, সেটা নিয়ে আলোচনায় অস্বচ্ছন্দ। স্বভাবে স্থূল, রুচিতেও। বাংলায় লেখালিখিকে তাচ্ছিল্য করে চলে নিয়ত। এভাবে পিষে দিতে চায় অহনাকেও৷ সেমিনারে পিতৃতন্ত্রের ছাল ছাড়ায়। বুলি কপচায়: ‘পেট্রিয়ার্কির চরিত্রলক্ষণ ডিনায়াল বা অস্বীকার করা!’ অথচ ঘরে এসে স্ত্রীকে প্রতি মুহূর্তে কোণঠাসা করে চলে। কখনও মুখের উপর জানায়: বাজারে যাওয়া, টিপে টিপে পরখ করে মাছ কেনা, সবজি বাছাই করা তার পক্ষে অসম্ভব। যেহেতু সে একজন অধ্যাপক, এতে জাত যায়। মান যায়। তারপর বিনা বাক্যব্যয়ে রাত্রে বউয়ের সম্মতির তোয়াক্কা না করে মুখের উপর লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ে!
অন্যদিকে অহনা রান্নার বন্দোবস্ত, বরের ফাইল খুঁজে বের করা, রোজকার বাজারহাট, শ্বশুরকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া—প্রায় দশভূজার মতো সব সামাল দেয়। বাইনারিটা ছবির গোড়াতেই বেঁধে দেন পরিচালক।
কিন্তু সব পুরুষই সমান নয়, নীল যে গোটা সমাজের মুখ হতে পারে না, সেটা বোঝাতেই যেন একাধিক চরিত্রের আমদানি। নীলের বাবার কথাই ধরা যাক। ঠিক তার উলটো প্রতিলিপি! অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। অহনাকে অনেক আগে থেকে চেনেন। ‘কম্প্যাটিবিলিটি’ বস্তুটির মর্ম বোঝেন। ছেলের অদ্ভুত হিংস্র আচরণের কারণ খোঁজেন। কিন্তু উত্তর অধরা। পুত্রবধূকে বারবার জিজ্ঞেস করেও জবাব মেলে না। অহনা পারে না তার স্বামীর ‘বন্ধ্যাত্বে’র সমস্যার কথা শ্বশুরমশাইকে বলতে।
যাকে বলে, সে তার অনেক দিনের পুরনো বন্ধু, আদিত্য, পেশায় সাইকোলজিস্ট। দুজনের অবিরাম আলোচনা চলে। কেন্দ্রে নীলের আচরণ, দাম্পত্য দুর্যোগ। দুজনে খোঁজে কারণ। ইনফার্টিলিটিই কি নীলকে এতটা রুক্ষ, বদমেজাজি, আগ্রাসী করে তুলেছে? তার স্পার্ম মর্টিলিটি কম থাকাকে কি সে পৌরুষের অপমান, নিজের পরাজয় হিসেবে দেখে? তাই চিকিৎসক আর্টিফিশিয়াল পদ্ধতিতে (আইভিএফ) সন্তান নেওয়ার নিদান দিতে সে এক কথায় তা নাকচ করে? সবকিছুই ব্যক্তিগত জয়-পরাজয়ের নিরিখে দেখতে চাওয়া, সুপিয়ারিটি কমপ্লেক্সের এই তীব্র-মদির বিষই কি পিতৃতন্ত্রের অনিবার্য ফলশ্রুতি? তাই অহনা সাহিত্য সম্মান পেলে সবাই যখন উচ্ছ্বসিত, তখন একা নীলেরই তাতে অস্বস্তি হয়? সে কুঁকড়ে যায়? নিজের ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখে? অর্ধাঙ্গিনীই হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ?
এই ন্যারেটিভ এবং এর পরিসমাপ্তির ছক শুনতে ভাল। কিন্তু গলদ রূপায়ণে। সবকিছুই বড্ড বেশি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, মুখে বলা। পরিচালক উদ্দেশ্যগোপনে ব্যর্থ। এবং সেই উদ্দেশ্য ছটফটিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়৷ সমস্যা বলছি, তর্ক চলছে, নিদান আসছে… ছবির বড় অংশ যেন মনোবিদের সেশন! প্রায় পুরো ছবিই ইন্ডোরে শ্যুট করা। ফলে এত কথার পুঞ্জে হাঁপ ধরে।
যদিও সেটা যে দম চেপে ধরে না তার কারণ দুজন। এক, সুদীপ্তা চক্রবর্তী। দুই, জয় সেনগুপ্ত। ছবির আত্মা তাঁদের অভিনয়। ‘উড়তে মানা গৃহলক্ষ্মী’ বনাম ‘আগলভাঙা নারী'-র সংঘাত অভিব্যক্তি, উচ্চারণ ও নীরবতায় জ্যান্ত করে তুলেছেন সুদীপ্তা, তাঁর স্বভাবোচিত মেজাজে। উড়ে বেরিয়েছেন স্বচ্ছন্দে। স্বামীর সঙ্গে তর্ক-সংঘাতের দৃশ্যগুলি জাত চিনিয়ে দেয়। অহনার আর্তি আর বেদনা, ক্রমাগত উত্তর খুঁজে চলার তাড়না স্রেফ চোখেমুখের অভিব্যক্তিতেই ফুটিয়ে তোলেন। যদি প্লটের টেনশন, মোচড়, উদ্দেশ্য সমসত্ত্বভাবে মিশে যেতে পারত, হয়তো পুরোপুরি খোলস ভেঙে বেরতে পারতেন তিনি!
উল্টোদিকে জয় সেনগুপ্ত ছবির নিউক্লিয়াস না হয়েও, একে শক্ত কাঠামোর উপর দাঁড় করান। সেটাও তাঁর অভিনয় প্রতিভার গুণে। নীলের আত্মসংঘর্ষ, নিজের সমস্যা ঢাকতে স্ত্রীকে ভিলেন বানানোর কৌশল, তাকে ক্রমাগত দুচ্ছাই করে চলা, সমস্যার শিকড় একমাত্র সে—এটা জেনেও বারবার পালিয়ে যাওয়া, অস্বীকার করার দোটানাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। ছবির প্রাপ্তি এটুকুই!
বাকি যা পড়ে থাকে, সেটা একজন নির্মাতার অপটু হাতের প্রথম কাজ। তাকে কে কতটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, একান্তই ব্যক্তিগত। একগাদা প্রশ্নকে ঠেসে পুরতে চেয়েছেন প্রমিতা৷ মা হলেই কি নারীত্ব সম্পূর্ণ হয়? সব পুরুষই কি আদতে পিতৃতান্ত্রিক? এত সমস্যা, এত জিজ্ঞাসা সৎ। উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু তা সূক্ষ্ম ও নিবিড়ভাবে মিশে যায়নি। না সহ-অভিনেতাদের অভিনয়ে, না দৃশ্যগ্রহণে, না ধ্বনিসম্পাদনায়। ক্যামেরার কাজ সাদামাটা, অধিকাংশ সময় ফ্ল্যাট। অথচ জটিল সমস্যামূলক ছবি আরও তির্যক হতে পারত স্রেফ ফ্রেমিংয়ের মুন্সিয়ানায়! নিপুণ এডিটিংয়ে তত্ত্বের ক্লেদ কিছুটা হলেও ঝেরে ফেলা যেত!
আবহসংগীত প্রায় নেই৷ পুরোটাই সিঙ্ক সাউন্ড। রেফ্রিজারেটরের যান্ত্রিক শব্দ, ট্রেনের হুইসেলের দূরায়ত ধ্বনি, ফেরিওয়ালার হাঁক, ঘড়ির কাঁটার টিকটক মিলিয়ে-মিশিয়ে আবহ গড়তে চেয়েছেন পরিচালক। কিন্তু অহনার যন্ত্রণা—সুদীপ্তার চমৎকার পারফরম্যান্সের পরেও—দর্শকদের ব্যাকুল করে না। আইভিএফ, সিঙ্গল মাদার, প্রেগন্যান্সি প্ল্যানিং—সবকিছুই নিছক ‘বার্তা’ হয়ে থেকে যায়। চিন্তার, অনুভূতির গভীরতর স্তরে ধাক্কা দিতে ব্যর্থ।
তবু দিনশেষে পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের মতো ট্যাবুতে ঘা মেরেছেন, খুলে দিয়েছেন তর্কের জমি, খোলামেলা আলোচনার পরিসর—এই কারণে প্রমিতা ভৌমিকের প্রথম বড় মাপের কাজটিকে ন্যায্য প্রশংসা জানাতেই হয়৷ তিনি নিজেই প্রযোজক, পরিচালক, লেখক। সবকিছু একা হাতে সামলাতে হয়েছে। বিগ বাজেটের দাক্ষিণ্য নেই। থাকলে বড় ক্যানভাসে এই সামাজিক বিতর্ক আরও সুচারুভাবে মেলে ধরা যেত কি না, ‘সম্ভাবনাময় ছবি’ কিংবা ‘জরুরি ছবি’ ছাড়িয়ে এই ফিল্ম হয়ে উঠতে পারত ‘সফল ছবি’?—দর্শকমনে অস্বস্তি জাগায় বৈকী!