পুতুলনাচের ইতিকথা সাফল্য-ব্যর্থতা, বিস্তার-সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে-মিশিয়ে ‘সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি’। মানিকের আখ্যান যার ‘অবলম্বন’ মাত্র। সিনেমা হলে ঢোকার আগে এবং বেরনোর পর এই নিপাট সত্যিটা উপন্যাসপাঠকের মাথায় রাখা জরুরি৷

আবীর চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 3 August 2025 15:02
উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছায়াছবি দেখতে বসে একজন ‘নিবিষ্ট’ পাঠক সবসময় ‘রসজ্ঞ’ দর্শক হতে পারেন না। তার উপর আখ্যান যদি জনপ্রিয়, তদুপরি শিল্পসার্থক হয়, তাহলে খোলা মনে ছবি উপভোগের বদলে সিনেমা হলে ঢোকার আগেই মগজে একের পর এক গ্রন্থির প্যাঁচ পাক খেতে থাকে। তৈরি হয় জটিল অভিসন্ধি, উসকে ওঠে কুটিল তর্ক: উপন্যাসের বিস্তারকে কতটা ধরে রাখবে ফিল্মের পর্দা? চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব, যা পাতা ওল্টানোর সময় হৃদয়কে দ্রব করেছিল, কলাকুশলীরা পারবেন সেই অনুভবকে ফের একবার দেড়-দু'ঘণ্টার ধিমে আঁচে জাগিয়ে তুলতে? যে গ্রাম, যে পুকুর, যে তালবন, যে নাতি-উচ্চ টিলার বর্ণনা পড়ে একটা জগৎ গড়েপিটে নিয়েছি, পুন:পাঠেও এতটুকু মালিন্য ধরেনি, সেলুলয়েড তার প্রতি সুবিচার করতে আদৌ সমর্থ হবে তো? পারব সেই দুনিয়া ফিরে দেখতে?
গল্প-উপন্যাসের স্তর-স্তরান্তর, তার অন্তর্বয়ন পাঠক হিসেবে আমাদের মনে খেলা করে। গড়ে ওঠে চালচিত্র। সেখানেই চরিত্রের হেঁটেচলে বেড়ানো, কাহিনির এগনো-পিছনো। ফলত, আখ্যান-ভিত্তিক চলচ্চিত্রে, আমরা চাই বা না চাই, পাঠ-অভিজ্ঞতার ‘হুবহু’ ছাপ দেখার প্রত্যাশা রাখি। এতটুকু কম নয়, একচুল বেশি নয়।
সমস্যা অনেক ধরনের। আমাদের মানসিক জগতের গড়ন-ধরন আলাদা। যে গ্রাম দেখেছে, যে গ্রামেই মানুষ হয়েছে আর যে গ্রাম দেখেনি—প্রত্যেকের চোখে ভিন্ন মেজাজে ধরা দেয় বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুর। তাই ‘পথের পাঁচালী’র রসও যায় বদলে। আর এই তিনজন যদি উপন্যাস পড়ে সত্যজিতের ছায়াছবি দেখতে বসেন, তাহলে সবকিছু ‘হুবহু’ দেখার শর্ত কখনও এক থাকতে পারে না।
গাওদিয়া গ্রাম দর্শনও এই একই যুক্তিতে বদলে যেতে বাধ্য। উপরের কথাগুলো ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ চলচ্চিত্র দেখে বেরনোর পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। এটি একান্তভাবে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘অবলম্বন’ মাত্র।
আমরা জানি, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য আর উপন্যাসের কাহিনিবস্তু এক নয়। দেড়শো-দুশো পাতার আখ্যানে এমন অনেক কিছু থাকে, যা স্ক্রিনপ্লে-র স্বার্থে বাদ দিতে হয়, এমন কিছু জুড়তে হয় যা লেখায় থাকে না। আর এই সংযোজন-বিয়োজন তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কতখানি নিজস্ব, মৌলিক ও শিল্পসার্থক হয়ে উঠল, উপন্যাস-ভিত্তিক ছায়াছবির ক্ষেত্রে সেটা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ৷
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাস এর আগে মাত্র একবারই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। সেটাও পাঁচের দশকে, মানিকের জীবৎকালে। আজ তা ফিরে দেখার সুযোগ নেই। ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠী ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ মঞ্চস্থ করেছিল ঠিকই। কিন্তু সেলুলয়েডের পর্দা আর রঙ্গমঞ্চ মাপে আলাদা। ফলে পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের কাছে সে অর্থে ‘মডেল’ বলে কিছু ছিল না৷ প্রায় পনেরো বছর ধরে ফিল্ম তৈরির পরিকল্পনা চালিয়েছেন। গোড়ায় লেখকের পরিবারের তরফে কিছু আপত্তিতে কাজ শুরু করা যায়নি। যখন সবকিছু চুকেবুকে শুটিং আরম্ভ হল, তখন হানা দিল কোভিড৷ অতিমারির ঢেউ থিতিয়ে গেলে বারবার ঘষামাজা, সম্পাদনার পর অবশেষে বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ আপাতত বাংলায় মুক্তি পেয়েছে৷
উপন্যাসের কেন্দ্রে গ্রামের ডাক্তার শশীর অন্তদ্বর্ন্দ্ব ও তার ভবিতব্য হলেও তাঁকে কেন্দ্র করে অসংখ্য চরিত্র, একাধিক সাবপ্লট ঘুরপাক খেয়ে চলে। আগেই বলেছি, উপন্যাসের গল্প আর চিত্রনাট্য এক নয়৷ ছায়াছবির স্বার্থে অনেক কিছু বাদ দিতে হয়, জুড়তে হয় নতুন কিছু। এখানেও যেমন (শশীর বোন) কুন্দ-নন্দের অসুস্থ দাম্পত্য, মতি-কুমুদের ঘটনাবহুল, নাটকীয় ও তাকলাগানো কলকাতা-জীবন অনুপস্থিত। একান্তভাবেই গাওদিয়া গ্রামে সার্চলাইট ফেলেছেন পরিচালক। আর কাহিনিকালকে আরেকটু টেনে বাড়িয়েছেন। বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ উপন্যাসে নেই৷ ছায়াছবিতে যুদ্ধবিমানের ভেঙে পড়ার দৃশ্য, গ্রামের আড্ডায় খবরের কাগজে যুদ্ধের খবর পাঠ পরিচালকের সংযোজন। যদিও তা আলাদা করে কোনও মাত্রা আরোপ করে না।
সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে মানবজীবন ও সমাজের বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণের যে অহমিকা বিজ্ঞানের ছাত্র, চিকিৎসক শশীর মনে বাসা বেঁধেছিল, তা ঝুরঝুর করে খসে পড়ে হারুর আকস্মিক মৃত্যু, ভুতোকে বাঁচাতে না পারা, মতি-কুমুদের অপ্রত্যাশিত প্রণয়, ইচ্ছামৃত্যুর নামে যাদব পণ্ডিতের সস্ত্রীক আত্মহনন এবং অবশ্যই কুসুমের প্রস্থানে। পুতুলের মতোই সবকিছু দেখে চলে শশী। তার হাত বাঁধা এক অলৌকিক সুতোয়৷ পর্দার আড়ালে যিনি সূত্রধর, তিনিই কি তবে আসল নট? সবকিছু তাঁরই ইচ্ছের অধীন?
এই প্রশ্নের জবাব শশী পায়নি। একের পর এক ধাক্কা খেয়েছে আর সওয়ালের পর সওয়াল ছুড়ে দিয়েছে নিজেকে। যে গ্রামকে তার নিস্তরঙ্গ, এঁদো পুকুরডোবা, মজে যাওয়া নদীর দেশ বলে মনে হত, আশ্চর্য ঘটনা ও আশ্চর্যতর চরিত্র তাকে বলতে বাধ্য করে ‘গ্রামের জীবন তো কম জটিল নয়!’
এই জটিলতার উন্মোচন মানিক করেছেন অনেক ধোঁয়াশা আর প্রচ্ছন্নতার মায়াজাল বুনে। সেনদিদি-গোপালের পর্বের কথাই ধরা যাক। একবারও দুজনের অবৈধ সম্পর্ক ও সেই সূত্রে সন্তানের জন্মের কথা উপন্যাসে ‘প্রকটভাবে’ দেখানো হয়নি। কিন্তু একটা চাপা টেনশন, ঘোলাটে সন্দেহ ঔপন্যাসিক আগাগোড়া বজায় রেখেছেন। ওই প্রচ্ছন্ন পর্দাটুকুই সৌন্দর্য। যা রচনার শিল্পগুণ অনেকখানি বাড়িয়েছে। পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের সঙ্গমদৃশ্য দেখানোর ফলে সম্পর্কের ধূসরতার আবেদন কি মাঠে মারা যায় না? স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা, একান্তভাবে অনুভববেদ্য ঘটনা যখন হাট করে জানলা খুলে দেখানো হয়, তখন একটা আঘাত আসে বৈকী!
চিত্রনাট্যের স্বার্থে অধিকাংশ সংলাপই নতুন করে লিখতে হয়েছে। কুসুম উপন্যাসে চলিতে কথা বলে। সিনেমায় পূর্ববঙ্গের লোকজ ভাষায়৷ সেটা বাংলাদেশের অভিনেত্রী জয়া আহসানের অ্যাডভান্টেজ। পরিচালক বুদ্ধিমানের মতো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা নিয়ে আপত্তি নেই৷ স্টেথোস্কোপ নিয়ে শশীর সঙ্গে তাঁর খুনসুটিও সুমনের সংযোজন। উন্মুক্ত প্রকৃতির ব্যাকড্রপে ক্যামেরার মুন্সিয়ানায় দৃশ্যটি সুন্দর। কিন্তু সেখানেই যখন শশী কুসুমের চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে, ‘তোমার হাসি দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়!’ তখন তা উপন্যাসপাঠককে কিঞ্চিৎ বিব্রত করে! মানিকের গদ্যের ভার এই সংলাপকে মুহূর্তে খেলো, বেমানান করে তোলে।
বস্তুত, পুতুলনাচের ইতিকথা-র বড় সম্পদ এর গদ্য। শশীর অব্যক্ত চিন্তা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন প্রথম পুরুষের বাচনে। যেমন, ‘শশীর মনে হয় চিরকালের জন্য সে মার্কামারা গ্রাম্য ডাক্তার হইয়া গিয়াছে—এই গ্রাম ছাড়িয়া কোথাও যাইবার শক্তি নাই। নিঃসন্দেহে এজন্য দায়ী কুসুম। শশীর কল্পনার উৎস সে যেন চিরতরে রুদ্ধ করিয়া দিয়াছে। বিদ্যুতের আলের মতো উজ্জ্বল যে জীবন শশী কল্পনা করিত সে যাযাবরের জীবন নয়,—শশীর নীড়-প্রেম সীমাহীন। কল্পনার তাই একটি কেন্দ্র ছিল শশীর, এক অত্যাশ্চর্য অস্তিত্বহীনা মানবী, কিন্তু অবাস্তব নয়; শশীর ভাবুকতা উদভ্ৰান্ত হইতে জানে না। কুসুম যেন তাহাকে মিথ্যা করিয়া দিয়াছে—সেই মহা-মানবীকে।’
প্রায় প্রবন্ধের ভাষা। তীক্ষ্ম, প্রত্যক্ষ। উপন্যাসের আদ্যোপান্ত এভাবেই ঘুরে বেড়িয়েছেন সর্বজ্ঞ কথক (Omniscient Narrator)। যিনি মন্তব্য করেছেন, কারণ খুঁজেছেন৷ সিনেমায় এই জায়গাটা পুরোপুরি বাদ দিলে উপন্যাসের সুবিচার করা হত না। কথাসাহিত্য তো স্রেফ ঘটনার পুঞ্জ নয়, ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবমনে আলো ফেলা, তার আঁতের কথা তুলে ধরাই সাহিত্যিকের আদত উদ্দেশ্য। সুমন খুব সুচতুরভাবে উপন্যাসের সর্বজ্ঞকথকের জবানিকে ঝাড়াইবাছাই করে রাখলেন। কিন্তু সেটা প্রথম পুরুষের বাচনে (First Person Narration)। অর্থাৎ, ‘শশী ভাবিল’ কিংবা ‘শশী বুঝিল’ বদলে গেল ‘আমি ভাবছি’, ‘আমি বুঝলাম'! চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্যও এই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বদল। আবীর চট্টোপাধ্যায় যে মনোলগ উচ্চারণ করেছেন, তা না থাকলে চলচ্চিত্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হত।
উপন্যাসের শেষে শশী মন্থরপায়ে গ্রামে প্রবেশ করে। শেষ পরিচ্ছেদে কোথাও কুসুমের উল্লেখ নেই৷ মানিক শুধু লিখেছেন: ‘পরানের বাড়িতেও এখনো লোক আসে নাই।’ এই অনুল্লেখ, এই অস্বস্তি, এই চাপা বেদনা, এই ভুলে থাকাটাই অবগুন্ঠন। এই অনুচ্চারণই পুতুলনাচের ইতিকথাকে একাধারে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক করে তুলেছে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে আবীরের দ্রুত প্যাডেলে সাইকেল চালানোর ফ্রেম শশীর হৃদয়ের লুকনো ক্ষতকে জীবন্ত করতে পারেনি!
আর এখানেই পুতুলনাচের ইতিকথা সাফল্য-ব্যর্থতা, বিস্তার-সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে-মিশিয়ে ‘সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি’। মানিকের আখ্যান যার ‘অবলম্বন’ মাত্র। সিনেমা হলে ঢোকার আগে এবং বেরনোর পর এই নিপাট সত্যিটা উপন্যাসপাঠকের মাথায় রাখা জরুরি৷