উপন্যাসটিই যেখানে সময়ের চেয়ে এগিয়ে, সেখানে এর চলচ্চিত্ররূপ যে পাঁচের দশকের দোরগোড়ায় দর্শকদের ‘মনরঞ্জন’ করবে না, তা বলাই বাহুল্য!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 29 July 2025 18:57
‘পুতুলনাচের ইতিকথার ছায়াচিত্রের চুক্তি সই করলাম: কে.কে. প্রোডাকশনের সঙ্গে। আমিই একমাত্র খ্যাতনামা লেখক যে সিনেমার কাছে আত্মবিক্রয় করেনি। এতদিন পরে যেচে এসে আমার নির্দেশে ‘সস্তা করা চলবে না’ মেনে নিয়ে সিনেমা কোম্পানি চুক্তি করল। আশা করছি ছবিটা ভাল হবে। দেখা যাক!’
১৭ জানুয়ারি। ১৯৪৮। শনিবার। শীতের এক মন্থর দুপুরে টালিগঞ্জের দিগম্বরীতলার বাড়ির টেবিলে বসে ডায়েরিতে এই এন্ট্রি লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (Manik Bandyopadhyay)। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত মহাকাব্যোচিত এক উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয় তেরো বছর পর, ১৯৪৯ সালে। যুগান্তর পেরিয়ে দুর্ভাগ্য এই যে, এমন ছায়াছবির কথা বাঙালি ভুলে গিয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুক্রবার ঝাঁ-চকচকে মাল্টিপ্লেক্সের সুরম্য আসরে যখন ‘ফের একবার’ (প্রথমবার নয়) মানিকের রচনা অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায়ের (Suman Mukhopadhyay) নির্দেশনায় এই চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে চলেছে, তখন এহেন তথ্যবিস্মৃতিকে আমাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও দেউলিয়াপনার নজির বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না!
তার চেয়েও পীড়াদায়ক বিষয় হচ্ছে, ১৯৪৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির (Putulnacher Itikatha) হদিশও আজকাল কোথাও মেলে না! গুগলের সার্চের রেজাল্ট তথৈবচ। স্রেফ বাংলা ছায়াছবির তথ্য আর্কাইভে রাখে এমন একটি ওয়েবসাইটে ফিল্মের কিছু টুকরো তথ্য জানা যায়।

সেই সূত্র মোতাবেক, ওই ছবির পরিচালক অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় (Asit Bandyopadhyay)। মুখ্য চরিত্র শশীর ভূমিকায় অভিনয় করেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (Kali Banerjee)। অন্যান্য ভূমিকায় নীলিমা দাস (কুসুম), গৌতম মুখোপাধ্যায়। চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে প্রবোধ দাস। সংগীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। যাঁর গণসঙ্গীত-চেতনা বাংলা ছায়াছবির ছকে বাঁধা ঘরানায় ভিন্ন আঙ্গিক ও মেজাজ এনে দিয়েছিল।
চলচ্চিত্র হিসেবে কতটা সার্থক, তার বিচার করা এখন আর সম্ভব নয়। প্রধান কারণ, ছবিটি ‘দুর্লভ’। ফিরে দেখার সুযোগ নেই। সম্বল ইতিহাস আর জনশ্রুতি-লোকস্মৃতি। কে. কে প্রোডাকশনের প্রযোজনায় ও ছায়াবাণীর পরিবেশনায় পুতুলনাচের ইতিকথা’ মুক্তি পায় ১৯৪৯-এর ২৮ জুলাই। কলকাতার শ্রী, প্রাচী ও ইন্দিরা—এই তিনটি প্রেক্ষাগৃহে। মানিকের অনেক ‘আশা’ থাকলেও সিনেমা বাণিজ্যসফল হয়নি। গবেষক, প্রাবন্ধিক যুগান্তর চক্রবর্তীর ভাষায়, ‘ছবিটা যাকে বলে ‘ফ্লপ’ করে—চার সপ্তাহে উঠে যায়।’
যদিও এই ফিল্ম অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে আত্মপ্রকাশের মঞ্চ গড়ে দিয়েছিল। শশীর চরিত্রে তাঁর সংযত অভিনয়, মুখের গাম্ভীর্য ও কণ্ঠস্বরের গমক কাঙ্ক্ষিত গভীরতা আনে। উপন্যাসটিই যেখানে সময়ের চেয়ে এগিয়ে, সেখানে এর চলচ্চিত্ররূপ যে পাঁচের দশকের দোরগোড়ায় দর্শকদের ‘মনোরঞ্জন’ করবে না, তা বলাই বাহুল্য!

নাকি উপন্যাসের বিমূর্ততা ও চিত্রময়তাকে ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি নির্দেশক? ‘পুতুলনাচে’র কাহিনির বাস্তবতা ও কাহিনির আড়ালে থাকা অকথিত অনুভবকে কি মঞ্চ বা ক্যামেরার মাপে ধরানো যায়? ‘জোরে আর আজকাল শশী হাঁটে না, মন্থর পায়ে হাঁটিতে হাঁটিতে গ্রামে প্রবেশ করে। গাছপালা বাড়িঘর ডোবা পুকুর জড়াইয়া গ্রামের সর্বাঙ্গ-সুন্দর রূপের দিকে নয়, শশীর চোখ খুঁজিয়া বেড়ায় মানুষ।… তালবনে শশী কখনও যায় না। মাটির টিলাটির উপর উঠিয়া সূর্যাস্ত দেখিবার শখ এ জীবনে আর একবারও শশীর আসিবে না।’—এমন অলৌকিক উপসংহারের মূর্ছনাকে ক্যামেরার লেন্স কতটা ফোটাতে পেরেছিল? প্রশ্নটা খোঁচা দিলেও জবাবে অনুমান ছাড়া আজ আর কিছুই বলা সম্ভব নয়!

যদিও বাণিজ্যিক ব্যর্থতার আঁচ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পোহাতে হয়। যেহেতু লেখকবৃত্তিকেই জীবনের ব্রত মনে করেছিলেন, সাহিত্যিকদের ‘কলমপেষা মজুর’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না তিনি, অন্নসংস্থানে আর কোনওরকম চাকরি কিংবা উমেদারি না করে স্রেফ ‘লিখে যাওয়া’টাই ছিল যাঁর অবলম্বন, মেধাবী ছাত্র হয়েও যিনি স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যকে বরণ করে নেন, তাঁর জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে গল্প-উপন্যাস বাবদ পারিশ্রমিকের জন্য হন্যে হয়ে প্রকাশকদের তাড়া দেওয়ায়।
এক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। ফারাক বলতে এ যাত্রা প্রকাশক নয়, প্রযোজকদের শঠতার শিকার হন। দিনলিপিতে যার ইঙ্গিতও রয়েছে। ১৭ এপ্রিল, ১৯৫০ সালের ডায়েরিতে মানিক লিখছেন, ‘ছায়াবাণী হাতে পায়ে ধরে বাকি ৯০০ টাকা অর্ধেক মাপ চেয়ে নিল। বলছে আমার একটা ছবি তুলবে, কাহিনীর সংক্ষিপ্তসার চায়। এটা চাল হতে পারে। যাই হোক, সবটা আদায় হবে না। অর্ধেক মাপ করাই ভাল। ২৫০ টাকা পেলাম। ১লা মে বাকি ২০০ টাকা।’
দিনলিপি ছানবিন করে যুগান্তর চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এই সিনেমা থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাকুল্যে ২,৮৫০ টাকা লাভ করেন। চুক্তির শর্তবাবদ পুরোটা পাননি।

১৯৫০ সালের পর ছবির দুনিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি আজকাল উপন্যাস বা গল্পের ‘অ্যাবস্ট্রাক্টনেস’কে পর্দায় বিম্বিত করে। রচনার বিমূর্ততা আর পর্দার চিত্ররূপের বিভেদরেখাও গিয়েছে মুছে। পরিচালকদের সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, যা ইতিমধ্যে বিদেশের ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রশংসিত, তা কালজয়ী উপন্যাসের সুবিচার করতে পারবে—দর্শক হিসেবে প্রত্যাশা বলতে এটুকুই।