Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

প্রায় ৮৯ লাখে বিক্রি হল রবীন্দ্রনাথের তৈরি একমাত্র ভাস্কর্য, দুর্মূল্য পত্রাবলি বিকোল ছ'কোটিতে

শেষপর্যন্ত ৮৮ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকায় বিক্রি হল রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়া একমাত্র ভাস্কর্য ‘পাষাণহৃদয়’।

প্রায় ৮৯ লাখে বিক্রি হল রবীন্দ্রনাথের তৈরি একমাত্র ভাস্কর্য, দুর্মূল্য পত্রাবলি বিকোল ছ'কোটিতে

ফাইল ছবি।

শেষ আপডেট: 27 June 2025 21:37

রূপক মিশ্র

শেষপর্যন্ত ৮৮ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকায় বিক্রি হল রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়া একমাত্র ভাস্কর্য ‘পাষাণহৃদয়’। গতকাল মুম্বইয়ের অষ্টগুরু নিলামঘরে নিলামে ওঠার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে যায়।  আজ দর হাঁকাহাঁকির পর প্রায় ৮৯ লক্ষ টাকায় তা বিক্রি হল। অষ্টগুরু নিলামঘরের ওয়েবসাইটে আপাতত এই অর্থমূল্যের কথা বলা হয়েছে। কে বা কারা কিনেছেন, সেই তথ্য এখনও জানা যায়নি।

উল্লেখ্য, আজই রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা ৩৫টি চিঠি, যা তিনি বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও রসবেত্তা ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছিলেন, সেগুলিও নিলামে ওঠে। ওয়েবসাইটে দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, পত্রগুচ্ছ প্রায় ৬ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোয়ার্টজাইট পাথর কুঁদে বানানো ভাস্কর্যের মতো এগুলিও কে কিনলেন, সে তথ্য অজানা। খবর পাওয়ামাত্র এখানে আপডেট করা হবে।

প্রসঙ্গত, পাষাণহৃদয় ভাস্কর্যটির আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। ১৮৮৩ সাল। বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্যতম প্রধান শহর কারোয়ার ভ্রমণে যান রবীন্দ্রনাথ। সপরিবার। প্রশস্ত বালুতট, বড় বড় ঝাউবন, প্রাচীন গিরিদুর্গ, গিরিবন্ধুর উপকূলরেখায় মোহময়ী জ্যোৎস্নারাত্রি কবির মনকে প্লাবিত করে। তিনি ঘুরতে ঘুরতে একটি কোয়ার্টজাইট পাথর তুলে নেন। তারপর তাকে হৃদয়ের আকারে কেটে লিখে রাখেন মিতায়তন কবিতা—‘পাষাণ হৃদয় কেটে/ খোদিনু নিজের হাতে/ আর কি মুছিবে লেখা/ অশ্রুবারিধারাপাতে?’

এই চতুষ্পদী কবিতা-খচিত পাথরই রবীন্দ্রনাথের হাতে তৈরি প্রথম ও একমাত্র ভাস্কর্য। তিনি এর আগে-পরে প্রতিকৃতি, আত্মপ্রতিকৃতি—অনেক কিছু এঁকেছেন। তাঁর কবিতার কাটাকুটিও পাঠকের চোখে নান্দনিক স্কেচ। কিন্তু ভাস্কর্য? না, আর একটিও গড়েননি। কারোয়ারে পাথর কুঁদে বানানো অনুপম শিল্পকৃতির নাম রাখেন ‘পাষাণহৃদয়’ (The Heart Stone)। উপহার দেন অক্ষয় চৌধুরীকে। পরে বিভিন্ন হাত ঘুরে তা মুম্বইয়ের নিলামঘরে ঠাঁই পায়।

শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের শিল্পীজীবনের নিরিখেই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক অপব্যাখ্যাত অধ্যায়ের ভ্রম নিরসনেও এই একটি ভাস্কর্যের গভীর মাহাত্ম্য। ১৮৬৮ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হিসেবে কাদম্বরী দেবীর ঠাকুর পরিবারে আবির্ভাব। এরপর কিশোর রবির সঙ্গে বৌঠানের যে নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে, কালে কালে তা উভপাক্ষিক না থেকে একপাক্ষিক হয়ে ওঠে এবং আর কারও প্রতি তীব্র আসক্তি কিংবা ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে নয়, স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নিঃস্পৃহতা ও উদাসীনতা দেখে অভিমানভরেই যে ১৮৮৪ সালের এপ্রিলে তিনি আত্মহত্যা করেন, এই ভাস্কর্য তার অকাট্য ‘পাথুরে’ প্রমাণ!

সাধারণ মানুষ তো বটেই, বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদেরও একটা বড় অংশ কাদম্বরীর আত্মহননের আড়ালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ‘অনৈতিক’ সম্পর্ককে ইঙ্গিতে নয়, সরাসরি কারণ হিসেবে দেগে দেন। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনীদেবীকে বিবাহের জেরেই নাকি পাকাপাকি ভাঙন, চিরস্থায়ী ফাটল। যার ফলশ্রুতি আত্মহত্যা।

অথচ জীবনস্মৃতির ছত্রে ছত্রে রবীন্দ্রনাথ নতুন বৌঠানের ঔদাসীন্য, তাঁর প্রত্যাখ্যানের ছবি এঁকেছেন। কোথাও চড়া দাগে, স্পষ্ট করে। কোথাও হাল্কা তুলির আঁচড়ে। ‘পাষাণহৃদয়ে’র চার পঙক্তির কবিতাটিও কাদম্বরীর অনাসক্তি ও অনাগ্রহের অন্যতম দৃষ্টান্ত। যিনি এক কিশোর গুণগ্রাহীর অশ্রুবারিধারতেও সাড়া না দিয়ে নির্বিকার থেকে গেলেন, রইলেন উদাসীন, তাঁকেই কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘পাষাণী’। তুলেছেন প্রশ্ন, অভিমানভরে—আর এই লেখা কি কোনওদিন চোখের জলে ধুয়ে যাবে?

অক্ষয় চৌধুরী বয়সে বড় হলেও রবীন্দ্রনাথের পরম সুহৃদ ছিলেন। কবির ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখের খবর রাখতেন। রবীন্দ্রনাথের এই ভাস্কর্য পাওয়ার পর তিনি দিয়ে যান স্ত্রী শরৎকুমারী চৌধুরানীকে। এরপর তা কন্যা উমারানির হস্তগত হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে দম্পতির কন্যা দেবযানী পাথরটির মালিকানা পান। তাঁর স্বামী বিখ্যাত শিল্পী অতুল বসু। তিন ছেলে—অভিজিৎ, সঞ্জীব ও দীপঙ্কর। মৃত্যুর আগে দেবযানী তাঁর বড় ছেলে অভিজিতের স্ত্রী ইলোরার হাতে পাষাণহৃদয়ের স্বত্ব তুলে দেন। অভিজিৎবাবু কর্মসূত্রে প্রবাসী। আমেরিকার ব্লুমিংটনে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন। সেখানকারই একটি ব্যাঙ্কের লকারে প্রায় ৪৪ বছর ‘পাষাণহৃদয়’ রাখা ছিল। দু’বছর আগে দুজন দেশে ফিরে আসেন। আর ঠিক পরের বছর, ২০২৪-এর ২৬ মে, শহরের একটি আর্ট গ্যালারিতে সেই ভাস্কর্য সর্বসমক্ষে প্রদর্শিত হয়।

দু’বছর কলকাতায় থাকার পর ‘পাষাণহৃদয়’ বাণিজ্যনগরীর অষ্টগুরু নিলামঘরে তোলা হয়। সেখানে শুধুমাত্র এই ভাস্কর্য নয়, রাখা ছিল ৩৫ খানা চিঠিও। প্রতিটি রবীন্দ্রনাথের হাতে-লেখা। প্রাপক বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও প্রাবন্ধিক ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সময়কাল: ১৯২৭-৩৬। কখনও পদ্মার বোটে নিভৃতযাপনে, কখনও দার্জিলিংয়ের গ্লেন ইডেনে ছুটি কাটানোর ফাঁকে চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। বিষয়: হয় সাহিত্য, নয় সঙ্গীত। বাংলা সাহিত্যে তথাকথিত বিশুদ্ধতাবাদীদের দাপাদাপি থেকে শুরু করে উদয়শংকরের নৃত্যশৈলী—সবকিছু ব্যক্তিগত রুচি ও গ্রহণ-বর্জনের আলোয় দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ।

নিলামঘরের শর্ত মেনে এই বিরল সম্পদ যিনিই হস্তগত করুন না কেন, কোনওভাবেই দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পারবেন না। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছিল দাম লাখ পেরিয়ে কোটি ছুঁতে পারে। আদতে তাই হল। পত্রাবলী বিক্রি হল প্রায় ছ'কোটিতে। আর ভাস্কর্য প্রায় ৮৯ লক্ষ টাকায়।

কিছুদিন আগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ‘আবাস’ বিশ্বভারতীর চোখের সামনে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। না রাজ্য, না কেন্দ্র কেউ ‘রা’ পর্যন্ত কাড়েনি। এবার রবীন্দ্রনাথের অমূল্য ভাস্কর্য ও দুর্মূল্য চিঠির সংকলন ‘বেহাত’ হল৷ এবারও দু'পক্ষই চোখে ঠুলি এঁটে বসে। নির্বাক, নিশ্চুপ বিশ্বভারতীও।

এমন ‘হিরন্ময় নীরবতা’ই কি রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্য ছিল?

তথ্যঋণ: তপোব্রত ঘোষ


```