হরমোনমুক্ত পুরুষ গর্ভনিরোধক পিল মানবদেহে পরীক্ষায় সফল। বাজারে আসার পথে এই ওষুধ নিয়ে কতটা প্রস্তুত পুরুষ সমাজ, উঠছে সেই প্রশ্ন।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 31 December 2025 12:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দশকের পর দশক জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায় মহিলারা বইছেন একাই। পুরুষদের হাতে ভরসাযোগ্য বিকল্প বলতে ছিল কন্ডোম বা ভ্যাসেকটমি। কিন্তু সেই অসম ভারসাম্য বদলাতে চলেছে বলে এবার ইঙ্গিত দিচ্ছে বিজ্ঞান। হরমোনমুক্ত পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ওয়াইসিট-৫২৯ (YCT-529) মানবদেহে প্রথম ধাপের নিরাপত্তা পরীক্ষায় সফল হয়েছে। এই সাফল্য পুরুষদের জন্য গর্ভনিরোধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
কারা তৈরি করছে এই পিল?
আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক সংস্থা ইওরচয়েস থেরাপিউটিকস (YourChoice Therapeutics) তৈরি করছে এই পিল। বহু বছরের গবেষণার ফল এটি। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি কলেজের অধ্যাপক গুন্ডা জর্জের (Gunda Georg) নেতৃত্বে শুরু হওয়া গবেষণায় পরে যুক্ত হন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বাস্তব পণ্যে রূপ দিতেই তৈরি হয় এই সংস্থা।
কী এই ওয়াইসিট-৫২৯
একটি দৈনিক খাওয়ার মতো পিল। সবচেয়ে বড় কথা হরমোনমুক্ত। আগের বহু পরীক্ষামূলক পুরুষ গর্ভনিরোধক পিল টেস্টোস্টেরন দমন করত, যার ফলে মুড সুইং, ওজন বাড়া, যৌন ইচ্ছে কমে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেত। এই পিল সেই পথে হাঁটেনি।
কীভাবে কাজ করে?
পুরুষদের শুক্রাণু তৈরির জন্য প্রয়োজন রেটিনোয়িক অ্যাসিড (Retinoic Acid) ভিটামিন ‘এ’-র একটি উপাদান। এটি রেটিনোয়িক অ্যাসিড রিসেপ্টর আলফার (RAR-α) সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া চালু রাখে। ওয়াইসিট-৫২৯ এই রিসেপ্টরটিকেই ব্লক করে দেয়। ফলে শুক্রাণু তৈরি শুরুর আগেই প্রক্রিয়াটি থেমে যায়, কিন্তু টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অপরিবর্তিত থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ওষুধ বন্ধ করলে ফের সব ঠিক হয়ে যায়।
মানবদেহে পরীক্ষার ফল
সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণা বলছে, প্রথম ধাপের মানবদেহে পরীক্ষা বা ফেজ ১-এর (Phase 1a) ট্রায়ালে অংশ নেন ১৬ জন সুস্থ পুরুষ। তাঁদের একাংশকে পিল দেওয়া হয়, বাকিদের প্লাসেবো। ফলাফল বলছে, কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, হরমোনের মাত্রা, মানসিক অবস্থা বা যৌন ইচ্ছার উপরও কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে এই ধাপে গর্ভনিরোধের কার্যকারিতা মাপা হয়নি।
ভারতীয় পুরুষদের মনোভাব
শহুরে, শিক্ষিত পুরুষদের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতে ফার্টিলিটি। কলকাতার এক সংগীতশিল্পী বলছেন, “দীর্ঘমেয়াদে কোনও স্থায়ী ক্ষতি হলে সেটা ভয়ংকর।” আবার এক প্রতিরক্ষা কর্মীর আশঙ্কা, “একবার যদি স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব হয়ে যায়?” যদিও কেউ কেউ মনে করছেন, হরমোনমুক্ত হলে ভয় অনেকটাই কমে।
চিকিৎসকরা কী বলছেন?
এইমস দিল্লির গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ নীনা মালহোত্রা (Dr. Neena Malhotra) মনে করেন, ভারতের জনসংখ্যার হার কমে আসার পরও জন্মনিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি মহিলাদের কাঁধেই রয়ে গিয়েছে। 'শত জন মহিলার টিউবেকটমির বিপরীতে একজনও পুরুষ ভ্যাসেকটমি করান না,' বলছেন তিনি। আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বেদিকা বালি (Dr. Vedika Bali) জানাচ্ছেন, এই পিল পুরুষত্ব বা লিবিডোতে প্রভাব ফেলে না, আর বন্ধ করলে আবার সব ঠিক হয়ে যায়, শুক্রানুর সংখ্যা বেড়ে যায় আগের মতো। তাই তাই ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
এখন এই ওষুধের ট্রায়াল চলছে। সেখানে দেখা হবে, নিয়মিত খেলে শুক্রাণুর সংখ্যা কতটা কমে, বন্ধ করলে কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, আর দীর্ঘদিন ব্যবহারে কোনও ঝুঁকি থাকে কি না। বাজারে আসতে এখনও বছর কয়েক লাগবে।
তবু এতটুকু স্পষ্ট, ওয়াইসিট-৫২৯ বাজারে এলে পুরুষদের জন্ম নিয়ন্ত্রণে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।