মৌসম ভবন ইতিমধ্যেই কয়েকটি রাজ্যে ‘তীব্র শৈত্যপ্রবাহ’ সতর্কতা জারি করেছে। এরাজ্যেও তাপমাত্রা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 13 January 2026 12:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ (Cold Wave)। দিল্লি-এনসিআর (Delhi-NCR) থেকে পাঞ্জাব (Punjab), হরিয়ানা (Haryana), রাজস্থান (Rajasthan), উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh)—একাধিক রাজ্যে হু হু করে নামছে পারদ। পিছিয়ে নেই বাংলাও। দক্ষিণবঙ্গে খানিক স্বস্তি মিললেও উত্তরবঙ্গ কাঁপছে। মৌসম ভবন (India Meteorological Department) ইতিমধ্যেই কয়েকটি রাজ্যে ‘তীব্র শৈত্যপ্রবাহ’ (Severe Cold Wave) সতর্কতা জারি করেছে।
রবিবার দিল্লির আয়ানগরে (Ayanagar) সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পালাম (Palam) আবহাওয়া কেন্দ্রেও পারদ ছিল ৩ ডিগ্রিতে। রিপোর্ট বলছে, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম ঠান্ডা শুধু অস্বস্তিকর নয়, শরীরের উপর ভয়ানক চাপ তৈরি করে। সতর্ক না হলে হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), স্ট্রোক (Stroke) কিংবা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার মতো গুরুতর বিপদ ডেকে আনতে পারে।
শরীরে কী হচ্ছে এই তীব্র ঠান্ডায়?
হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি (Hypothermia)
যখন শরীর যতটা তাপ তৈরি করতে পারে, তার চেয়ে দ্রুত তাপ হারাতে থাকে, তখন শরীরের মূল তাপমাত্রা নেমে যায় ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নীচে। প্রথমে তীব্র কাঁপুনি শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ থাকলে বিভ্রান্তি, শ্বাস ধীর হয়ে যাওয়া, মানিয়ে নেওয়ার শক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বয়স্ক, শিশু ও যাঁদের রক্ত সঞ্চালন দুর্বল, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এক্ষেত্রে। সময়মতো গরম না পেলে হার্ট ফেলিওর (Heart Failure) এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
হৃদযন্ত্রের উপর চাপ (Heart Strain)
ঠান্ডায় রক্তনালীগুলো সঙ্কুচিত হয়ে যায় (Vasoconstriction)। ফলে হৃদপিণ্ডকে বেশি জোরে ও দ্রুত কাজ করতে হয়। এতে রক্তচাপ ও হার্ট রেট বেড়ে যায়। রক্ত কিছুটা ঘন হয়ে ক্লট (Clot) তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। আগে থেকেই হৃদরোগ থাকলে বিপদ কয়েকগুণ।
শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা (Respiratory Problems)
হিমশীতল বাতাস শ্বাসনালীকে শুষ্ক ও উত্তেজিত করে তোলে। ফুসফুসের সুরক্ষামূলক শ্লেষ্মা ঘন হয়ে যায়। হাঁপানি (Asthma) বা সিওপিডি (COPD) রোগীদের ক্ষেত্রে শ্বাসনালী আরও সঙ্কুচিত হয়—হাঁপ ধরা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট বাড়ে। সুস্থ মানুষও সহজে সর্দি-কাশি বা ফ্লুতে (Flu) আক্রান্ত হতে পারেন।
ফ্রস্টবাইট ও ত্বকের ক্ষতি (Frostbite)
খোলা ত্বক কয়েক মিনিটের মধ্যেই জমে যেতে পারে। প্রথমে অবশ ভাব, সাদা দাগ দেখা দেয়। হাতের ও পায়ের আঙুল, কান ও নাকে রক্ত চলাচল কমে গিয়ে ব্যথা, ফোসকা এমনকি চিকিৎসা না হলে অঙ্গ কেটে ফেলার প্রয়োজনও হতে পারে। বারবার ঠান্ডায় ব়্যাশ ও চুলকানিও হতে পারে।
স্ট্রোকের আশঙ্কা (Stroke Risk)
সঙ্কুচিত রক্তনালী মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, ঘন রক্ত ক্লটের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে চরম শীতে স্ট্রোকের সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। হাইপোথার্মিয়ায় মস্তিষ্কের সংকেত ধীর হয়—ঘুমঘুম ভাব, বিচারবুদ্ধি কমে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
মাংসপেশি ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া (Muscle and Joint Stiffness)
ঠান্ডায় মাংসপেশির কার্যকলাপ কমে যায়, জয়েন্টের তরল চলাচল কমে। ফলে হাঁটু বা পিঠে ব্যথা, চলাফেরায় জড়তা বাড়ে। পড়ে গিয়ে চোট লাগার ঝুঁকিও বেশি, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (Weak Immune System)
দীর্ঘদিন ঠান্ডায় থাকলে শরীরের শক্তির বড় অংশ তাপ তৈরি করতে খরচ হয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে ব্রংকাইটিস (Bronchitis) বা নিউমোনিয়ার (Pneumonia) মতো সংক্রমণ সহজে বাসা বাঁধে। ঘরের শুকনো বাতাসে ত্বক ও শ্লেষ্মা ফেটে গিয়ে জীবাণু ঢোকার পথ তৈরি হয়। কম রোদে ভিটামিন ডি (Vitamin D) কমে যাওয়াও সমস্যা বাড়ায়।
সব মিলিয়ে, এই শীতে ‘সহ্য করে নেওয়া’ নয়, বরং সাবধানতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বলছেন চিকিৎসকরা। অবশ্যই বাড়তি নজর দিতে হবে বয়স্কদের দিকে।