ইসিজি বিশ্লেষণ থেকে রিমোট মনিটরিং—কার্ডিওলজির প্রতিটি ধাপে AI আনছে বিপ্লব। চিকিৎসায় AI-এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রইল বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর প্রতিবেদন।

ডক্টর দিলীপ কুমার।
শেষ আপডেট: 23 July 2025 13:21
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বদল আসে সভ্যতায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হতে থাকে তার অঙ্গন। সে সভ্যতার প্রথম সারিতেই রয়েছে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্র। সেখানেই এবার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এ সম্পর্কে এখন আমরা অনেকেই কমবেশি জানি। প্রশ্ন হল, এআই কি আমাদের হৃদয়ের খবরও রাখে। হৃদয় অর্থাৎ হার্ট। হার্টের চিকিৎসার প্রচলিত ধরনটাকেও কি বদলে দিতে পেরেছে এআই? রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসা, মনিটরিং, বা প্রতিরোধ পর্যন্ত কীভাবে পরিবর্তন আসছে কার্ডিয়াক কেয়ারে? এই নিয়েই আলোচনায় মেডিকা সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের ডিরেক্টর অফ ক্যাথ ল্যাব, পূর্ব ভারতের অন্যতম ডিভাইস স্পেশ্যালিস্ট, ডক্টর দিলীপ কুমার।
বর্তমান সময়ের অন্যতম বহুচর্চিত শব্দ হল AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রতিদিনই আমরা AI নিয়ে কথা বলি, শুনি। কিন্তু চিকিৎসা ক্ষেত্রে, বিশেষত হার্ট বা হৃদ্রোগ চিকিৎসায় AI যে একেবারে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে— তা এখন স্পষ্ট। ডাক্তারদের মতে, AI শুধুই সহায়ক প্রযুক্তি নয়, এটি ধীরে ধীরে আধুনিক চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
আগে ECG বা ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি ছাড়া হৃদরোগ নির্ণয় করা হতো। তাতেও কয়েকটা নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বেশি কিছু জানার বা বোঝার কথা ভাবাই যেত না। তবে এখন AI-এর মাধ্যমে ECG আরও গভীর বিশ্লেষণ করছে। এমনকি রোগীর বয়স, লিঙ্গ পর্যন্ত নির্ণয় করছে ECG-এর সিগন্যাল দেখেই।
চিকিৎসকদের মতে, একদমই ধরতে পারে। বিশেষত ইমেজিং বা ছবি বিশ্লেষণ যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, সেখানে AI অনেক বেশি নিখুঁত। ছোটখাটো ত্রুটি, যা মানুষের বা চিকিৎসকের চোখ এড়িয়ে যায়, তা AI সহজেই ধরতে পারে। অর্থাৎ বলা যায়, চিকিৎসকের চোখ যেখানে থামে, সেখান থেকে AI দেখা শুরু করে।
এর উত্তরটা খুব স্পষ্ট— AI ডাক্তারকে বদলাবে না বা সরাবে না। তবে যাঁরা AI ব্যবহার করতে জানেন, তাঁরা আগামীর ডাক্তারদের নেতৃত্ব দেবেন। AI-কে একটা স্কিল হিসেবেই ধরতে হবে। স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করতে জানার মতোই একটি বিশেষ স্কিল।
AI এখন কেবল বড় হাসপাতালের জিনিস নয়। রিমোট ডেটা ট্রান্সমিশন ও টেলি-মেডিসিন প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রামীণ স্তরের হাসপাতাল বা সাবসেন্টার থেকেও রোগীর তথ্য কেন্দ্রে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসকরা রিমোটলি সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে পরামর্শ দিতে পারছেন।
উদাহরণস্বরূপ, বহরমপুরের একজন হৃদ্রোগীর শরীরে CRT ডিভাইস লাগানো হয়েছে, যা একাধারে পেসমেকার, শক থেরাপি ইউনিট ও মনিটরিং সিস্টেম হিসেবে কাজ করছে। এই ডিভাইস সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে নিজে থেকেই চিকিৎসককে অ্যালার্ট পাঠায়।
চিকিৎসকদের মতে, AI চিকিৎসার লিডিং টুল হয়ে উঠবে। রোগ নির্ণয়, রোগ পর্যবেক্ষণ, এমনকি ওষুধ নির্বাচনেও AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আগামী দিনে চিকিৎসকদের সহায়তা নয়, AI হয়ে উঠবে চিকিৎসার কাণ্ডারি।
অবশ্যই। যেমন, AI অনেক সময় অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে রোগীকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আবার সিস্টেমের ভাইরাস বা টেকনিক্যাল গলদ থেকে ভুল তথ্য আসার আশঙ্কাও থাকে। তাই চিকিৎসকদের বুঝতে হবে, "AI-কে ব্যবহার করুন, AI যেন আপনাকে ব্যবহার না করে।" কারণ AI-এর কোনও মানবিক বোধ নেই, এটি নিছক প্রযুক্তি।
সব মিলিয়ে, AI এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, এটি আজকের বাস্তবতা। হার্টের চিকিৎসায় AI বদলে দিচ্ছে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগ পর্যবেক্ষণের পথ। তবে এর ব্যবহার বুঝে, দায়িত্বের সঙ্গে এবং সীমাবদ্ধতা জেনে করা দরকার। তাহলেই AI হবে মানবিক চিকিৎসার সেরা হাতিয়ার।