এই ডায়েট প্ল্যানের কার্যকারিতা এখন পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এইমসে ভর্তি ১৪০ জন রোগীর উপর, যাদের মধ্যে অর্ধেকই করোনারি আর্টারি ডিজিজে (CAD) আক্রান্ত।

ছবিটি এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 12 July 2025 11:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হৃদরোগে (Heart disease) ভোগা ভারতীয়দের জন্য আলো দেখাতে চাইছে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)। দেশে প্রথম ভারতীয় ঘরানার ‘মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট’ চালু করল এইমস। যার নাম ইন্ডিয়ান অ্যাডাপটিভ মেডিটেরিনিয়ান ডায়েট( Indian Adapted Mediterranean Diet (IAMD)। এই নতুন ডায়েট চার্টে ভারতীয় রান্নার উপাদানের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে এক সুষম খাদ্য তালিকা, যা হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে জানাচ্ছেন গবেষকরা।
এই ডায়েট প্ল্যানের কার্যকারিতা এখন পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এইমসে ভর্তি ১৪০ জন রোগীর উপর, যাদের মধ্যে অর্ধেকই করোনারি আর্টারি ডিজিজে (CAD) আক্রান্ত। গবেষণার মূল লক্ষ্য হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকরী ও সহজলভ্য একটি ভারতীয় খাদ্য পদ্ধতি গড়ে তোলা।
কেন বিশেষ এই ডায়েট ( IAMD)?
মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট মূলত ইউরোপীয় উপকূলীয় দেশগুলির খাদ্যাভ্যাসের ধরনকে বলে। তাতে ফাইবার, ভালো ফ্যাট, বাদাম, মাছ, শাকসবজি আর নানা ধরনের ফলমূল প্রচুর পরিমাণে থাকে। ভারতীয় রান্নার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সহজলভ্য উপাদানগুলোর সঙ্গে তাল রেখে এবার মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটের একটা দেশি সংস্করণ বের করেছে এইমস।
যেমন, অলিভ অয়েলের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে সরষে বা চিনাবাদামের তেল। কুইনোয়ার জায়গায় ভাঙা গম, দেশি চাল, আর পোলেন্টার জায়গায় রাখা হয়েছে মকাইয়ের আটা। এমনকি বিদেশি হার্বস যেমন রোজমেরি, টাইমের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে তুলসী, জোয়ান, জয়ফল, জয়িত্রী প্রভৃতি ভারতীয় মশলা।
ডায়েটের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
গবেষকরা বলছেন, এই ডায়েটে ডায়েটারি ইনফ্লেমেটকি ইনডেক্স (Dietary Inflammatory Index - DII) স্কোর -৮.০-র কাছাকাছি, যা অত্যন্ত অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি। করোনারি হার্ট ডিজিজে ভোগা রোগীদের বর্তমান ডায়েটের গড় DII স্কোর যেখানে +১.১, সেখানে IAMD স্কোর অনেকটাই নিম্নগামী, যা প্রদাহ কমিয়ে হার্টের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিদিনের খাবার, কিন্তু স্বাস্থ্যকর উপায়ে
আইএএমডি-তে ১২০০ থেকে ২০০০ ক্যালোরির মধ্যে পাঁচটি স্তরের খাবার রাখা হয়েছে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকছে ৬টি মিল, তিনটি বড় (সকালের জলখাবার, দুপুর ও রাতের খাবার) ও তিনটি হালকা (ভোরবেলা, দুপুরের আগের সময় ও সন্ধেয়)।
শুধু রোগীদের নয়, গোটা পরিবারের জন্য উপযোগী
এইমসের-এর কার্ডিওলজির অধ্যাপক ও এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. অম্বুজ রায় জানিয়েছেন, এই ডায়েট শুধু রোগীদের জন্য নয়, বরং পুরো পরিবারের ক্ষেত্রেই উপকারী। তাঁর মতে, “উপযুক্ত পরিমাণে ভালো ফ্যাট, বাদাম, মাছ ও মৌসুমি ফল খাওয়া এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত খাবার খেলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ প্রতিরোধ সম্ভব।”
ভাত-ডাল, না বাঁচাবে শরীর?
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীদের একেবারে তেল-মশলা ছাড়া সিদ্ধ খাবার খেতে বলা হয়, যা শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। বরং গবেষকরা মনে করছেন, ‘জিরো ফ্যাট’ ডায়েট নয়, ‘স্মার্ট ফ্যাট’ এবং পুষ্টিকর উপাদানে ভরা ডায়েটই হওয়া উচিত চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক রান্নাকেও এই ডায়েট মডেলে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে আইএএমডি সম্পর্কে তথ্য ও রেসিপি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
মোদ্দা কথা হল, এ দেশে সব পরিবারের রান্নাঘরেই লুকিয়ে রয়েছে হার্ট সুস্থ রাখার চাবিকাঠি—এটাই প্রমাণ করতে চলেছে এইমসের আইএএমডি। রোগের ওষুধ হয়তো হাসপাতালে পাওয়া যায় বা যাবে, তবে তার প্রতিরোধ গড়ে ওঠে আমাদের প্রতিদিনের প্লেটে।