দ্য ওয়াল আরোগ্যের (The Wall Arogya) ‘হার্ট ভাল রাখার আর্ট’ (Heart Bhalo Rakhar Art) অনুষ্ঠানে ডক্টর কুণাল সরকারের (Doctor Kunal Sarkar) বক্তৃতায় উঠে এল, এআই কীভাবে হৃদরোগ চিকিৎসায় (AI in Cardiology) গেমচেঞ্জার হয়ে উঠছে, খুলে দিচ্ছে নির্ভুল ও বৈষম্যহীন এক নতুন অধ্যায়।

ডক্টর কুণাল সরকার।
শেষ আপডেট: 9 September 2025 17:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হৃদযন্ত্রের চিকিৎসা আর শুধুই স্টেথোস্কোপ-শল্যচিকিৎসকের ভরসায় আটকে নেই। এখন তাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন অধ্যায়, যেখানে ডাক্তারবাবুর পাশে বসে গাইড করছে মেশিন, আর রোগ নির্ণয়ের কাঁটা ধরছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যেন এক নতুন সহচর এসে বলছে, “ভুল কোরো না, আমি আছি।” দ্য ওয়াল আরোগ্যের আয়োজিত হার্ট ভাল রাখার আর্ট অনুষ্ঠানে কার্ডিওলজিস্ট ড. কুণাল সরকার সেই নতুন অধ্যায়েরই ছবি এঁকেছেন।
কুণালবাবুর কথায়, “যে কোনও নতুন টেকনোলজি, কম্পিউটার হোক বা কোয়ান্টাম টেকনোলজি হোক, তা প্রাথমিক ভাবে মানুষকে উত্তেজিত করে, তার পরে তার গ্রাফ নীচে নামে, তার পরে স্টেবল হয় সেটি। এআই-ও তাই। আজ আমরা এআই-কে সেভাবেই ব্যবহার করছি।"
যন্ত্রের যন্ত্রণা
তাঁর কথায়, "রাজ্যের বহু হাসপাতালে, জেলায় জেলায় অনেক ভাল যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু সে যন্ত্র কাজে লাগানোর আত্মবিশ্বাস নেই। ইকো কার্ডিওগ্রাম মেশিন আছে, অথচ ইকো হচ্ছে না। কারণ যন্ত্র থেকে যে রিপোর্ট আসবে, তা নির্ভুল নাও হতে পারে। আমি গ্রামের দিকে বহুবার দেখেছি, সামান্য ইসিজি করা নিয়ে খোদ ডাক্তারবাবুরাও ভয় পাচ্ছেন। কারণ যদি রেজাল্ট ভুল আসে! তার ভিত্তিতে চিকিৎসায় ভুল হয়ে যায়! যন্ত্রের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস নেই।”
হার্টের চিকিৎসায় গেমচেঞ্জার— AI
এখানেই এআই-এর বিরাট কৃতিত্ব বলে মনে করেন তিনি। কারণ এআই এসে যাওয়ার পরে, তাতে যদি ইসিজি আপলোড করা হয়, তা ৯৯ শতাংশ ঠিক রিপোর্ট দেবে। সুতরাং বলা যায়, এআই-এর আসল শক্তি হল, নলেজকে সমানভাবে ভাগ করে দিচ্ছে সকলের মধ্যে। এটা থাকলে আর কোন ডাক্তার কী ভাবছেন, কী চাইছেন, যন্ত্রে কোনও সমস্যা আছে কিনা— এসবে কোনও ফারাক হবে না।
সব মিলিয়ে, এখন ইসিজি হোক বা ইকো হোক, সিটি স্ক্যান হোক বা কোনও প্যাথলজিক্যাল স্লাইডের পরীক্ষা হোক, যে কোনও পরীক্ষার রিপোর্ট এখন এআই দ্বারা সঠিক হবে এবং তা সকলের ক্ষেত্রেই হবে। এখানে কোনও মানুষকে লাগবে না, ফলে সেই রিপোর্টে কোনও ভুলও থাকবে না। যার ফলে চিকিৎসাও সকলে আরও অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পাবেন, এতে কোনও সন্দেহ নেই।
চিকিৎসায় নবজাগরণ
কুণালবাবুর কথায়, “আমাদের মতো দেশে, অসাম্য ও বৈষম্যে ভরপুর একটা দেশে, যেখানে সর্বত্র সমান পরিষেবা নেই, সেখানে এই সুবিধা অত্যন্ত কার্যকর। শুধু তাই নয়, এআই এতই নিখুঁত ও অত্যাধুনিক, অন্তত হার্টের ক্ষেত্রে বলা যায়, বহু সমস্যাই আগাম রিপোর্ট দেখে ইন্টারপ্রেট করতে পারে। উদাহরণ দেওয়া যায়, আমাদের খালি চোখে হয়তো কোনও রিপোর্ট দেখে মনে হবে ব্লক হয়েছে আর্টারিতে, অথচ এআই কিন্তু অনেক আগেই সেই একই হার্টের রিপোর্ট দেখে বলে দিতে পারে, কতদিনের মধ্যে কতটা ব্লক শুরু হবে।”
তাঁর ব্যাখ্যা, “একটা মানুষের বুকে ব্যথা হলে, তিনি হাসপাতালে এলে, পরীক্ষানিরীক্ষা করে যদি ব্লক ধরা পড়ে, সেটা তো খুব স্বাভাবিক, তার জন্য বিপুল দক্ষতা বা পারদর্শিতা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এআই এমন একটা অস্ত্র, সে অনেক আগে থেকেই প্রেডিক্ট করে বলে দিতে পারে, সাবধান করতে পারে। এটাই নবজাগরণ।”
এআই-এর পাশাপাশিই হার্টের চিকিৎসায় এসেছে রোবোটিক্স। কুণালবাবুর ব্যাখ্যা, “আমরা যখন রোবোট দিয়ে সার্জারি করাচ্ছি, সে অনেক বেশি অ্যাক্সিসে, অনেক সূক্ষ্মভাবে, অনেক বেশি গতিতে, অনেক বেশি গভীরে সহজে মুভমেন্ট করছে। ফলে অস্ত্রোপচার হচ্ছে ন্যূনতম ক্ষত তৈরি করে, আরও অনেক বেশি নিখুঁত ও নির্ভুলভাবে।”
হার্টের যত্নে...
সেই সঙ্গেই মনে রাখতে হবে, হার্টের চিকিৎসায় একটা বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের দেশ। কারণ এই বছরই প্রথম, ভারতবর্ষে আমেরিকার চেয়েও বেশি সংখ্যক হার্ট সার্জারি হচ্ছে। এমন একটা সময়ে এই ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, হার্ট পাম্পের মতো টেকনোলজিও কাজে লাগানো, হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল ও দীর্ঘ পদ্ধতিকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে পারা, বলা যায় নতুন এআই-নির্ভর হার্ট শরীরে বসানোর মতো বিষয়ও সামনে আসছে। এই নিয়ে বহু কাজ হচ্ছে বলে জানালেন ডাঃ কুণাল সরকার।
চিকিৎসার গণতন্ত্রীকরণ
ড. সরকারের বক্তব্য যেন আধুনিক চিকিৎসার আয়নার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিল। একদিকে শহুরে হাসপাতালে ঝকঝকে যন্ত্র, অন্যদিকে গ্রামের ক্লিনিকে দ্বিধা আর অনিশ্চয়তা। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে পারছে এআই— যেন মেশিন থেকে আসা রিপোর্টে সবার জন্য সমান সঠিক হয়।
এর ফলে কোনও গ্রামে থাকা সাধারণ রোগীর ইসিজি আর শহরের কর্পোরেট হাসপাতালে করানো ইসিজি—দুটোই যখন এআই বলছে ৯৯ শতাংশ নির্ভুল, তখন চিকিৎসা আর কোনও গ্রাম-শহর পার্থক্যে আটকে নেই। চিকিৎসার এই গণতন্ত্রীকরণই আসল গেমচেঞ্জার।
এর পাশাপাশি এসেছে রোবোটিক্স, তা যেন সার্জনের হাতে নতুন তুলি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঁচড় টেনে আগের চেয়ে আরও সূক্ষ্ম, আরও নির্ভুলভাবে আঁকছে জীবনরক্ষার ছবি।
সব মিলিয়ে, এখন আর হৃদরোগের চিকিৎসা কেবল ছুরি-কাঁচি আর ওষুধের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির হাতিয়ার, এআই আর রোবোটিক্সের মতো সহচর। ড. কুণাল সরকারের চোখে এটাই চিকিৎসার নবজাগরণ। আর এই নবজাগরণের কেন্দ্রে আছে এক সরল সত্যি— প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার হয়, তবে জীবনরক্ষার লড়াইয়ে সবাই সমান সুযোগ পাবে।