স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) ডায়াবেটিসে (Diabetes) মৃত্যুর দুই দশক পর আবিষ্কার হয় ইনসুলিন। দ্য ওয়াল আরোগ্যের (The Wall Arogya) ‘হার্ট ভাল রাখার আর্ট’ (Heart Bhalo Rakhar Art) অনুষ্ঠানে আলোচনা করলেন ডক্টর কুণাল সরকার (Doctor Kunal Sarkar)।

ডায়াবেটিসে মারা যান স্বামী বিবেকানন্দ।
শেষ আপডেট: 9 September 2025 17:43
হার্ট নিয়ে যত আলোচনা, ততটাই ভয়ের কথাও লুকিয়ে থাকে সেখানে। দ্য ওয়াল আরোগ্যের (The Wall Arogya) ‘হার্ট ভাল রাখার আর্ট’ (Heart Bhalo Rakhar Art) অনুষ্ঠানে তাই যখন মঞ্চে উঠলেন কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর কুণাল সরকার (Doctor Kunal Sarkar), তিনি কেবল চিকিৎসা-তথ্য শোনালেন না, একেবারে জীবনের গল্পে ঢুকে গেলেন। হার্ট ভাল রাখার পাঠ দিতে গিয়েই তিনি টেনে আনলেন ডায়াবেটিসের প্রসঙ্গ। বললেন, এই রোগ আসলে হৃদযন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। চোখ, কিডনি, স্নায়ু সব কিছুকে ধ্বংস করলেও শেষ আঘাতটা গিয়ে পড়ে হার্টের ওপরেই।
তারপর তিনি শোনালেন এক অমোঘ দৃষ্টান্ত। স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) কথা। তাঁর কথায়, “৩৯ বছর বয়সে যখন স্বামী বিবেকানন্দ মারা যান হার্ট ফেলিওর হয়ে, তখন তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মোট ১৭টি অসুখের নাম ছিল। তবে সে সবের মূলে ছিল ডায়াবেটিস। জানা যায়, ১৯ বছর বয়স থেকে তাঁর ডায়াবেটিস ছিল। ২০ বছর ধরে তিনি এই অসুখে ভুগে, কার্যত শেষ হয়ে যান। তাঁর চোখ থেকে শুরু করে কিডনি— একটা অঙ্গও সুস্থ ছিল না। ডায়াবেটিসই তাঁর প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। সালটা ১৯০২।"
কুণালবাবু যোগ করেন, এর ২১ বছর পরে, ১৯২৩ সালে ইনসুলিন আবিষ্কার হয় ডায়াবেটিসের ওষুধ হিসেবে। ফলে কার্যত বিনা চিকিৎসায় মারা যান বিবেকানন্দ। হার্টের সুস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ ছুঁয়ে ডায়াবেটিসের এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কুণাল সরকার বুঝিয়ে দিলেন ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতনতা কেন জরুরি। আর সেই সঙ্গেই খুলে গেল, ইনসুলিন আবিষ্কারের কাহিনির সূত্রপাত।
ইনসুলিনের আগে ডায়াবেটিস মানেই প্রায় অবধারিত মৃত্যু। চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর কোনও অস্ত্র ছিল না। রোগীদের জীবনকাল ছিল সীমিত, আর রোগের অগ্রগতি থামানোর উপায় প্রায় ছিল না বললেই চলে। বিবেকানন্দের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল।
১৯২০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, ডায়াবেটিস মূলত ইনসুলিনের ঘাটতির কারণে হয়—প্যানক্রিয়াসের আইসলেট কোষ পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। কিন্তু কোষ থেকে ইনসুলিন আলাদা করার চেষ্টা হলেও, তা ব্যর্থ হচ্ছিল।
এই অচলাবস্থায় এগিয়ে আসেন তরুণ চিকিৎসক ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং। তিনি ভাবলেন, ভিন্ন উপায়ে ইনসুলিন আলাদা করা যেতে পারে। এ কাজে তিনি যোগ দেন বিজ্ঞানী জন ম্যাকলয়েড-এর সঙ্গে। গবেষণা সহযোগী হিসেবে যুক্ত হন তরুণ ছাত্র চার্লস বেস্ট।
১৯২১ সালে তাঁরা একাধিক পরীক্ষা চালিয়ে প্রথমবার সফলভাবে একটি কুকুরের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন আলাদা করেন। তবে সেটি ব্যবহার করে ডায়াবেটিস রোগ নিরাময়ের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি।
অবশেষে ১৯২১-এর নভেম্বর মাসে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন। তাঁদের তৈরি ইনসুলিন-এক্সট্র্যাক্ট ব্যবহার করে একটি ডায়াবেটিক কুকুরকে ৭০ দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। ডিসেম্বর মাসে দলে যোগ দেন বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ, যাঁর কাজ ছিল ইনসুলিনকে আরও বিশুদ্ধ করা।
১৯২২ সালের জানুয়ারিতে এল ইতিহাস বদলে দেওয়া মুহূর্ত। প্রথমবারের মতো এক মানব রোগী ইনসুলিন ইনজেকশন পান, ১৪ বছর বয়সি লিওনার্ড থম্পসন। প্রথম ইঞ্জেকশনে তাঁর শর্করার মাত্রা কিছুটা কমলেও, কিটোনের মাত্রা রয়ে যায় বিপজ্জনক স্তরে। এর পর কলিপ ইনসুলিনকে আরও বিশুদ্ধ করেন। ২৩ জানুয়ারি দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়া হলে, থম্পসনের রক্তে শর্করা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে লেখা হয় নতুন অধ্যায়।
১৯২৩ সালের জানুয়ারিতেই ব্যান্টিং, বেস্ট এবং কলিপ আমেরিকায় ইনসুলিন ও তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য পেটেন্ট পান। কিন্তু মানবতার কল্যাণে তাঁরা এই পেটেন্ট মাত্র এক ডলারে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে বিক্রি করে দেন। ব্যান্টিং বলেছিলেন— “Insulin does not belong to me; it belongs to the world.”
শিগগিরই ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা ইলাই লিলি ইনসুলিনের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে। ১৯২৩ সালের শেষের দিকেই বাজারে আসে প্রথম বাণিজ্যিক ইনসুলিন।
১৯২৩ সালেই ব্যান্টিং এবং ম্যাকলয়েডকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ব্যান্টিং তাঁর অর্ধেক পুরস্কার সহযোগী বেস্টকে দেন। ম্যাকলয়েডও তাঁর অংশ ভাগ করে দেন কলিপকে। ইনসুলিন আবিষ্কার শুধু বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
ডায়াবেটিস আজও বিশ্বে এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ। তবে ১৯২৩ সালে ইনসুলিন আবিষ্কার না হলে হয়তো লক্ষ লক্ষ জীবন হারিয়ে যেত। বিবেকানন্দের অকালমৃত্যু আমাদের সেই অন্ধকার সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর ব্যান্টিং-বেস্ট-কলিপ-ম্যাকলয়েডদের অদম্য জেদ প্রমাণ করে, বিজ্ঞান কেবল রোগ নিরাময়ের হাতিয়ার নয়, মানবতার মুক্তিরও পথপ্রদর্শক।