লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির হৃদপিণ্ড গবেষণা (Cardiovascular Research by Leonardo da Vinci)— চিত্র, আবিষ্কার, ভুল ধারণা ও আধুনিক বিজ্ঞানে তাঁর উত্তরাধিকার। দ্য ওয়াল আরোগ্যের (The Wall Arogya) ‘হার্ট ভাল রাখার আর্ট’ (Heart Bhalo Rakhar Art) অনুষ্ঠানে ডক্টর কুণাল সরকারের (Doctor Kunal Sarkar) বক্তৃতায় ফুটে উঠল 'কৃতজ্ঞতা'।
.jpeg.webp)
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির হার্ট-গবেষণা।
শেষ আপডেট: 9 September 2025 17:40
'হার্ট ভাল রাখার আর্ট' (Heart Bhalo Rakhar Art)। দ্য ওয়াল আরোগ্য (The Wall Arogya) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চাঁদের হাট বসেছিল বৃহস্পতিবার সন্ধেয়, হোটেল ভিভান্তার প্রাঙ্গণে। সেখানেই বক্তব্য রাখলেন কলকাতার তথা পূর্বভারতের খ্যাতনামা কার্ডিয়াক সার্জেন, ডক্টর কুণাল সরকার (Doctor Kunal Sarkar)। তাঁর বলার বিষয় ছিল, 'Prevention of heart disease in the age of AI.' সে আলোচনার শুরুতেই যে তিনি রেনেসাঁ শিল্পী, স্থপতি, প্রকৌশলী, দার্শনিক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির (Leonardo da Vinci) কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবেন, তা কে জানত!
এদিনের আলোচনার শুরুতেই কুণালবাবু বলেন, “হার্ট সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ডিভাইস নিয়ে যে আলোচনা, তার পিছনে আছেন একটি মানুষ। তাঁর নাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। একটা সময়ে হার্টের চিকিৎসা নিয়ে চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ মানুষ হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। প্রায় ১২ বছর ধরে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কার্ডিওলজি। চোখ, পেট, হাড়, ব্রেন-- এসব নিয়ে বোঝাপড়া চলছিল। কিন্তু হার্ট যেন এসবের থেকে আলাদা। একটা বৈজ্ঞানিক নিস্তব্ধতা জেঁকে বসেছিল হার্ট নিয়ে।"
এর পরেই তিনি মনে করিয়ে দেন, "একটি মানুষ তাঁর অসীম ঔৎসুক্যের মধ্যে দিয়ে হার্ট নিয়ে মানবসভ্যতার চিন্তাভাবনা (Cardiovascular Research) আবারও উস্কে দিয়েছিলেন। তাঁর জন্যই আজ ফের খুলেছে হার্টের চিকিৎসার খাতা। আজ আমার মতো যে সমস্ত চিকিৎসকরা হার্টের মেরামতি করে নিজেদের ডালভাত জোগাড় করছি, জীবনধারণ করছি, আমরা একটি মানুষের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। হার্টের চিকিৎসার নবজাগরণ ঘটিয়ে আমাদের পথ খুলেছিলেন তিনি। তাঁর হাতেই কার্ডিওলজি চর্চার খাতা খুলেছিল।”
কুণাল সরকারের এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে চিকিৎসাশাস্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের নানা অধ্যায়ের মাঝে হার্ট যেন ছিল রহস্যে ঘেরা, প্রায় অচর্চিত। অথচ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অদম্য কৌতূহলই ফের সেই অধ্যায়ের পাতা উল্টে দিয়েছিল। ১৫শ শতাব্দীর শেষদিকে তিনি যে অনুসন্ধিৎসা নিয়ে মানবদেহকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, তা শুধু শিল্পীসত্তার প্রকাশ ছিল না, ছিল বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রারও ভিত।

দ্য ভিঞ্চি তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে মানবদেহ কেটে কেটে দেখেছেন, হার্টের গঠন নকশায় এঁকেছেন। তাঁর আঁকা হার্টের স্কেচ আজও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তখনকার চিকিৎসাশাস্ত্রে এমন সাহসী পরীক্ষা কেউ ভাবতেও পারত না। তিনি প্রথম বুঝতে শুরু করেছিলেন হার্টের চারটি চেম্বারের কাজকর্ম, ভাল্ভের সূক্ষ্মতা, এমনকি রক্ত সঞ্চালনের প্রবাহ নিয়েও পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় এই আবিষ্কারগুলি বিজ্ঞানী মহলে সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকেরা তাঁর কাজকে পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
অবশ্য ভুলও ছিল তাঁর গবেষণায়। দ্য ভিঞ্চি রক্তসঞ্চালনকে যান্ত্রিক নীতিতে দেখার চেষ্টা করেছিলেন, অনেক জায়গায় বিভ্রান্তিও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর আঁকা চিত্র, তৈরি করা মডেল, গভীর পর্যবেক্ষণ পরবর্তী চিকিৎসাশাস্ত্রের ভিত্তি গড়ে দেয়। এক অর্থে, তাঁর অর্ধেক-অসফল প্রয়াসই আধুনিক কার্ডিওলজির জন্য দরজা খুলে দেয়।
আজ যখন প্রযুক্তি ও এআই চিকিৎসার মানচিত্র বদলে দিচ্ছে, তখনও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নাম উচ্চারণ করতে হয়। তাঁর অসীম কৌতূহলই আমাদের মনে করিয়ে দেয়— চিকিৎসাশাস্ত্র শুধু নির্ভুল যন্ত্রের ব্যবহার নয়, মানুষের কল্পনা আর অনুসন্ধিৎসার ফলও বটে। সেই কৌতূহলই হৃদরোগ চিকিৎসার নবজাগরণের পথ খুলে দিয়েছিল।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি— নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মোনালিসার রহস্যময় হাসি কিংবা ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর মহাকাব্যিক দৃশ্য। কিন্তু শিল্পী, স্থপতি, ভাস্কর, উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি আধুনিক কার্ডিওলজিরও অন্যতম প্রথম প্রণেতা, এটা আজকের দিনে অনেকের কাছেই অবাক করা শোনায়। অথচ সত্যি এটাই যে হার্টের গঠন, রক্তপ্রবাহ ও সার্কুলেশনের যে ধারণা আজকের চিকিৎসাশাস্ত্রে ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার বীজ রোপণ করেছিলেন দ্য ভিঞ্চিই।
পঞ্চদশ শতকের ইউরোপে মানবদেহ কাটাছেঁড়া ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বিধিনিষেধ, ভয় ও কুসংস্কারের কারণে চিকিৎসকেরা হার্টের প্রকৃত কার্যপ্রণালী বুঝতেই পারছিলেন না। প্রচলিত ধারণা ছিল গ্যালেনের— রক্ত লিভারে তৈরি হয়, শরীরে ছড়িয়ে যায় এবং পরে শরীরেই ভস্মীভূত হয়। এই ভুল ধারণা ভাঙতে এগিয়ে এলেন দ্য ভিঞ্চি। শিল্পীর অনুমতি থাকায় তিনি মৃতদেহ কেটে দেখার সুযোগ পান এবং শুরু করেন তাঁর বিপ্লব।
শুধু মানবদেহই নয়, গরু-শুয়োরসহ নানা প্রাণীর হৃদপিণ্ড কেটে তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন। ওয়াক্স দিয়ে হার্টের ছাঁচ বানিয়ে কাচের মডেল তৈরি করেছিলেন, যাতে রক্তপ্রবাহের হাইড্রলিক বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। এমনকি নদীর জলের স্রোত আর ঘূর্ণি পর্যবেক্ষণ করে তিনি রক্তপ্রবাহের গতিবিধি ব্যাখ্যা করেছিলেন। আজকের ভিজ্যুয়ালাইজেশন টেকনোলজির যুগে ভাবা যায় না, ৫০০ বছর আগে একজন মানুষ ঘাসের বীজ জলে ভাসিয়ে হার্টের ভালভের কার্যপদ্ধতি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি প্রথম বলেন, “হার্ট একটি পেশি, যা নিজে থেকেই সংকুচিত হয়।” এটিই আধুনিক কার্ডিওলজির ভিত্তি। তিনি আঁকেন করোনারি ধমনী-শিরার ছবি, দেখান কীভাবে হার্ট নিজেকে পুষ্টি জোগায়। তাঁর আঁকা চিত্রে হার্ট আর ‘রহস্যময় অঙ্গ’ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল চলমান, বোধগম্য, বৈজ্ঞানিক অঙ্গ।
অবশ্যই দ্য ভিঞ্চির পর্যবেক্ষণে ভুলও ছিল। তিনি হার্টকে অনেক সময় শরীরের ‘চুল্লি’ ভেবে বসেছিলেন, যেখানে রক্ত গরম হয়। আবার গ্যালেনের প্রভাবেই বিশ্বাস করতেন, ডান ভেন্ট্রিকল থেকে বাঁ ভেন্ট্রিকলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে রক্ত যায়। যদিও তিনি স্বীকার করেছিলেন, সেই ছিদ্র চোখে ধরা পড়ে না। আধুনিক চিকিৎসায় প্রমাণিত হয়েছে, এগুলো ছিল ভুল ব্যাখ্যা।
তবু তাঁর কৃতিত্ব এই যে, তিনি বিদ্যমান মতবাদ আঁকড়ে না ধরে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর আঁকা প্রায় ১৯০টি অ্যানাটমিক্যাল ড্রয়িং আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্পদ। কিন্তু তাঁর সময়ে তা প্রকাশিত হয়নি। হয়তো যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকায়, হয়তো ইনকুইজিশনের ভয়ে, হয়তো তাঁর নিজের অগোছালো জীবনযাত্রার কারণে।
১৬২৮ সালে উইলিয়াম হার্ভে যখন রক্তসঞ্চালন নিয়ে তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তখন আসলে দ্য ভিঞ্চির পর্যবেক্ষণের ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ১৬৬১ সালে মালপিঘি ফুসফুসে অক্সিজেনেশনের তত্ত্ব দিয়ে তা পূর্ণতা দেন। এই পুরো শৃঙ্খলের শুরুতেই ছিলেন দ্য ভিঞ্চি।
আজ, তাঁর আঁকা হার্টের ছবি দেখে তৈরি হচ্ছে থ্রি-ডি ভার্চুয়াল মডেল। তাঁর ভালভ স্টাডি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে আধুনিক প্রস্থেটিক হার্ট ভালভ। এমনকি ‘দ্য ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম’ নামক রোবোটিক প্রযুক্তিও তাঁর নামেই, যা আজ জটিল হার্ট সার্জারি করছে ন্যূনতম ক্ষত দিয়ে, সর্বোচ্চ নিখুঁততায়।

দ্য ভিঞ্চি নিজে একসময়ে বলেছিলেন, “আমি আমার সময় নষ্ট করেছি।” হয়তো হতাশা থেকেই বলেছিলেন। কারণ তাঁর বহু কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, বহু নকশা ব্যর্থ হয়েছে। তবুও আজ আমরা জানি, বিজ্ঞান, শিল্প আর মানবজিজ্ঞাসার ইতিহাসে তিনি এক ‘মহত্বের ব্যর্থতা’। যাঁর ভুলও নতুন পথ দেখিয়েছে, আর যাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার নবজাগরণ ঘটিয়েছে।
আজ, চিকিৎসক কুণাল সরকারের ভাষায়— “আমাদের মতো যারা হার্ট নিয়ে কাজ করছি, তাঁদের কাছে দ্য ভিঞ্চি এক চিরকৃতজ্ঞতার নাম।” এই কৃতজ্ঞতা শুধু চিকিৎসকদের নয়, সমগ্র মানবসমাজেরও। কারণ হৃদয়ের ভাষা বোঝার প্রথম পাঠ তাঁর কাছ থেকেই শিখেছে মানবসভ্যতা।