দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি, শস্যখেত, সবুজে সবুজে ছাওয়া উপত্যকা ছুঁয়ে গিয়েছে সদ্য যৌবনবতী নারীর মতো গতিময় ঝরনা।

উৎসুক তরুণরা ছড়ি হাতে পায়ে পায়ে চলে আসছেন মর্তোলীতে স্বর্গের অনুভূতির পুঁজি পকেটে ভরে নিতে।
শেষ আপডেট: 15 October 2025 17:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নন্দাদেবীর কোলে দোল খায় মর্তোলী। বাইরের লোক তো দূরের কথা এই গ্রামের কুমারী সৌন্দর্যের ঘ্রাণ নেননি এই প্রজন্মের উত্তরসূরিরাও। ভারত-চিন যুদ্ধের সময় খালি হওয়া গ্রামে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শুধু কুমায়ুন পর্বতমালার হাওয়া ঘুরেফিরে গিয়েছে।
দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি, শস্যখেত, সবুজে সবুজে ছাওয়া উপত্যকা ছুঁয়ে গিয়েছে সদ্য যৌবনবতী নারীর মতো গতিময় ঝরনা। সেই মর্তোলীতে ফের ফিরতে চলেছে জীবনের জয়গান। একটু একটু করে ফিরছেন গ্রামবাসীরা। আর সেই সঙ্গে এই কুমারী সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে আসছে ছোট চারচাকা গাড়ির টায়ারের শব্দ। উৎসুক তরুণরা ছড়ি হাতে পায়ে পায়ে চলে আসছেন মর্তোলীতে স্বর্গের অনুভূতির পুঁজি পকেটে ভরে নিতে।

উত্তরাখণ্ডের উত্তরাংশে জোহর উপত্যকার কোলে বসে রয়েছে এই গ্রামটি। যেখানে একদিন প্রাণচঞ্চল অথচ ছিমছাম জনবসতি ছিল। এখান থেকে দেখলে মনে হবে নন্দাদেবীর শৃঙ্গকে ছোঁয়া যাবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত সাম্রাজ্যের মতো এখানে গুটিকয় ভাঙা পাথরে নির্মিত ঘরের ঠিকানা মিলবে। ঠিক মনে হবে ভারত-তিব্বত সীমান্তের ধারে ফুরিয়ে যাওয়া এক সাম্রাজ্যে ঢুকে পড়েছেন আপনি।
শীতে এখানকার বাসিন্দারা সমতলে চলে আসেন। সেখানে তাঁরা চিনি, ডাল, মশলা এবং পোশাক বিক্রি করেন। ক্রেতাদের অধিকাংশই তিব্বতি। গ্রীষ্মে ঠিক উল্টোটা ঘটে, তাঁরা নুন ও উল কেনেন। তবে পুরোটাই হয় বিনিময় পদ্ধতিতে। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধ এঁদের জীবনযাত্রা পাল্টে দিয়ে যায়। ছয়ের দশকের গোড়ার দিকে জোহর উপত্যকার সব থেকে বড় গ্রাম মর্তোলীতে মাত্র ৫০০ জন বাস করতেন।

গোটা উপত্যকা বিন্দু বিন্দুর মতো ১২-১৩টি ছোট গ্রাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকটিতে মাত্র ১০-১৫ ঘরের বাস। সেই সময় সব মিলিয়ে মাত্র দেড় হাজার মানুষ থাকতেন এই গ্রামগুলিতে। এখানকার বাসিন্দারা যাযাবর শ্রেণির, পশুপালন ও কৃষিই তাঁদের মূল জীবিকা।
অত্যন্ত উর্বর এখানকার জমি। কালো জিরা, স্ট্রবেরি ও বাজরা উৎপাদন হয়। জীবনযাত্রা অত্যন্ত সাদাসিধে কিন্তু সুখী। বাচ্চারা পাহাড়ের কোলে কোলে খেলা করে বেড়ায়। গবাদি পশুরা নিশ্চিন্তে ঘাস খায়। কিন্তু, এই সুখ ভেঙে দিয়ে যায় ভারত-চিন যুদ্ধ। সেই সময় এই সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্যপথও রুদ্ধ হয়। গ্রামবাসীরা সেই যে সমতলে নেমে যান, তারপর আর ফেরেননি।

মর্তোলী ছেড়ে বাসিন্দা রুটিরুজির খোঁজে আশ্রয় নেন থল গ্রামে। সেই থেকে জোহর উপত্যকার অনেক গ্রামই জনশূন্য হয়ে পড়ে। সেই আমলে ১৪ বছরের কিশোর ছিলেন কিষেন সিং। এখন তাঁর বয়স ৭৭। তিনি মর্তোলী গ্রামে ফিরে আসেন প্রতি গ্রীষ্মে। তাঁর পৈতৃক ঘরের ছাদ নেই। তিনি পড়শির পরিত্যক্ত ঘরে রাত কাটান। নিজেই রান্না করে খান।
তিনি বলেন, আমি পাহাড়ে থাকতেই পছন্দ করি। এই জমিতে সোনা ফলে। গ্রীষ্মের ৬ মাস ধরে তিনি কুটকি, স্ট্রবেরি, কালো জিরে চাষ করেন। শরৎকাল এলেই সেগুলি গাধা ও খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে সমতলে নিয়ে বিক্রি করে দেন। কিষান সিংকে দেখে অনেকেই এখন তা করছেন।

কিছুদিন আগে একটি কাচা রাস্তা তৈরি হয়েছে। তাই লোকজন গাড়ি করেই এই গ্রামগুলির কয়েক কিমির মধ্যে আসতে পারেন। আর সেখান থেকে ট্রেকিং করে পিকনিক করতে অনেকেই এখন আসছেন। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে মর্তোলীর পুরনো পাথরের ঘরে মাঝেই একটি নতুন গেস্ট হাউস তৈরি করা হয়েছে। নন্দাদেবী বেস ক্যাম্পের দিকে যাওয়া ট্রেকারদের এখানেই আতিথেয়তা জোটে। পর্যটন গড়ে ওঠায় স্থানীয়রা বহুদিন পর পয়সার মুখ দেখছেন।

এখানকার গ্রামের কিছু লোকও পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে লাভের মুখ দেখছেন। নতুন রাস্তা যাত্রাপথ সহজ করে দিয়েছে। পর্যটন ব্যবসা দিনদিন বাড়ছে। সরকার আর একটু সাহায্য যেমন- বিদ্যুৎ, পানীয় জল ইত্যাদি পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করে দিলে স্থায়ীভাবে পর্যটন ব্যবসায় আয়ের সংস্থান হবে।