বাস্তবের জমিনে পা রাখার পরেই স্বামী-স্ত্রীর মিঠে সম্পর্ক ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। যেখান থেকে জন্ম নেয় অস্থিরতা, বিরক্তি, সন্দেহ, রাগ এবং অবশেষে এক বিছানায় দুটি মেরুর মতো বসবাস।

একটি শিশু নায়ক-নায়িকার সব মান-অভিমান, দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদকে ভুলিয়ে দেয়।
শেষ আপডেট: 15 October 2025 12:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্যার ঝুকতা নেহি। ১৯৮৫ সালে নির্মিত মিঠুন চক্রবর্তী ও পদ্মিনী কোলাপুরি অভিনীত ছবি। আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-তনুজা অভিনীত ইন্দর সেনের বাংলা ছবি প্রথম কদম ফুল কিংবা সৌমিত্র-অপর্ণা সেন অভিনীত জীবন সৈকতে ছবির মূল উপজীব্য বিষয় একটিই। যা কিনা একটি শিশু নায়ক-নায়িকার সব মান-অভিমান, দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদকে ভুলিয়ে দেয়। শুধু এই কটি ছবিই নয়, বাংলা, হিন্দি যে কোনও ভাষায় এই একই কাহিনির উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে অন্তত কয়েকশো ছবি।
এটা ঠিকই যে, যৌবনের শুরুতে প্রেম (Relationship) আসে। সেই প্রেমের পরিণতি ঘটে বিয়েতে। সুখী দাম্পত্যের প্রতীক হিসেবে সন্তানও আসে। তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে অছোঁয়া-অজানা কত স্বপ্ন। কিন্তু, বাস্তবের জমিনে পা রাখার পরেই স্বামী-স্ত্রীর মিঠে সম্পর্ক ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। যেখান থেকে জন্ম নেয় অস্থিরতা, বিরক্তি, সন্দেহ, রাগ এবং অবশেষে এক বিছানায় দুটি মেরুর মতো বসবাস। অনেকে সেটা মানতে না পেরে বিবাহ বিচ্ছেদ চান। আইনের দোরগোড়ায় তা হয়েও যায়। কিন্তু, নিষ্পাপ শিশুটির কী হবে? বহু ক্ষেত্রেই নাবালক বাচ্চার ভার মায়ের উপর এসে পড়ে। বাবার উপর খোরপোশের দায়িত্ব।
কিন্তু, একটি শিশুর শারীরিক-মানসিক-সামাজিক-আর্থিক বিকাশের জন্য সেটাই কি যথেষ্ট? বাচ্চাটি স্কুলে পা রাখার সময় অন্য বাচ্চাদের কাছে কী পরিচয় দেবে? পাড়ার লোকেদের মুখোমুখি হবে কী করে? শিশুর জন্য তার মায়ের সান্নিধ্যই কী শেষ? কিংবা শুধু বাবার সংযোগ! শিশু থেকে নাবালক, নাবালক থেকে কিশোর, তরুণ, যুবক সব বয়সের জন্যই চাই একটি হাসিখুশি পরিবেশ। শুধু বাবা, কিংবা মায়ের ভালবাসা দিয়ে সন্তানের ভরণপোষণ, লালনপালন করা যায় না। বাবা না থাকলে সে বাবার কাছে যাওয়ার বায়না করে। তেমনই মাকে না পেলে তার মধ্যে সুকুমারবৃত্তিগুলিই গড়ে ওঠে না। তাই ইদানীং একটি এরকম দম্পতিদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক নতুন প্রবণতা। যার নাম সহ-অভিভাবকত্ব বা সহজ ইংরেজিতে কো-পেরেন্টিং। বিবাহ বিচ্ছেদ নিজের জায়গায় থাকল।

সন্তানের কাছে, তাকে বড় করে তোলার কাজে সেই মা-বাবাই সুখী দম্পতির মতো আচরণ করে যাবে। সন্তানের সুখের ভবিষ্যতের জন্য অনেকেই এখন এই মানসিক বিজ্ঞানের হাত ধরে কো-পেরেন্টিংয়ের পথ বেছে নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এইভাবে বিকল্প বাবা বা মা বেছে নেওয়ার জন্য রয়েছে কো-পেরেন্টিং অ্যাপও। এদেশে এখন তা ভালই প্রচার ও প্রসার পাচ্ছে। ফলে, বাবা হোক বা মা, শিশুদের এখন অঙ্ক দেখিয়ে দেওয়া কিংবা স্কুল থেকে ফিরলে খেতে দেওয়া অথবা কোলের কাছে বসিয়ে কার্টুন দেখার লোকের অভাব নেই।
দুজন মানুষ যখন দাম্পত্য জীবন শুরু করে তখন সেখানে নানা ধরনের প্রত্যাশা থাকে, স্বপ্ন থাকে। বিভিন্ন কারণে সেই দাম্পত্য ভেঙেও যায়, আলাদা হয় দুজনের পথ। কিন্তু সেই দাম্পত্যে যদি সন্তান থাকে তাহলে সম্পর্কটি শেষ করা বা শেষ করতে চাওয়া নিয়ে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। তবে সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন হয় বাবা-মা দুজনেরই সংস্পর্শ। বিচ্ছেদের পরেও তাকে বাবা-মা দুজনের ভালোবাসা, সময়, সাহচর্য দিতে বেছে নেওয়া যেতে পারে কো-পেরেন্টিং পদ্ধতি। যেন সে বাবা-মা দুজনের সঙ্গ পেয়েই বেড়ে ওঠে, বিচ্ছেদের প্রভাব তুলনামূলক কম পড়ে তার উপর।
কো-পেরেন্টিংয়ের আরেক নাম শেয়ার্ড পেরেন্টিং। এই পদ্ধতিতে বিচ্ছেদের পরেও বাবা-মা যথানিয়মে তাদের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে তাঁরা দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেন। বিচ্ছেদের খারাপ প্রভাব যেন সন্তানের জীবনে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতেই কো-পেরেন্টিংয়ের যাত্রা শুরু।
ভেরিওয়েল মাইন্ডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটা দাগে কো-পেরেন্টিংয়ের তিনটি ধরন শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এগুলো হল, দ্বন্দ্বমূলক, সহযোগিতামূলক এবং সমান্তরাল। দ্বন্দ্বমূলকে দেখা যায় যে, বাবা-মায়েরা কোনও কিছুতেই একমত হতে পারেন না। তাঁদের সন্তান পালনের নিয়ম-রীতি, গুরুত্ব আলাদা হয়। সন্তানের জন্য কে, কতটুকু সময় দেবেন বা কে, কোন দায়িত্ব পালন করবেন তা নিয়ে দুজনেই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দ্বন্দ্বমূলক কো-পেরেন্টিংয়ের ফলে শিশুদের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দেয় এবং তারা হতাশা, উদ্বেগের মতো মানসিক রোগের শিকার হয়।

সহযোগিতামূলক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের পরেও দুজন সন্তান পালনের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করেন। এক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, সন্তানের বিভিন্ন তথ্য একে অন্যকে জানান, সন্তানের উন্নতি বা প্রয়োজনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা এমনভাবে নিজেদের জীবনের রুটিন ঠিক করেন, যেন প্রত্যেকেই সন্তানের সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটাতে পারেন। বিচ্ছেদের পরেও বাবা-মায়ের মধ্যে এই সম্মানজনক সম্পর্ক, সহযোগিতামূলক পরিবেশ সন্তানের বেড়ে ওঠায় গঠনমূলক প্রভাব রাখে, তাদের মনোজগত ভাল থাকে।
সমান্তরাল কো-পেরেন্টিংয়ের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনেই নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যোগাযোগ রক্ষা করেন। সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও তাঁরা ভিন্ন নীতি অনুসরণ করেন এবং দুজনেই দুজনের নিয়ম সন্তানের উপর চাপিয়ে দিতে চান। এর ফলে তাঁদের সন্তানের জীবনে স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দেয়, যা তার পরবর্তী জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কো-পেরেন্টিং সফল করতে বিবিসিকে কিছু পরামর্শ নিয়েছেন ব্রিটেনের সংস্থা রিলেটের প্রবীণ পরামর্শদাতা ডি হোমস। এসব পরামর্শ মেনে চললে, বিচ্ছেদের পরেও সন্তান পালন নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হবে না। আবার সন্তানের উপরও বিচ্ছেদের খারাপ প্রভাব পড়বে না।
নয়াদিল্লির অনামকারু থেরাপি কেয়ার অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রুচিকা কানোয়াল ইন্ডিয়া টুডে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিচ্ছেদের পর দুই বাবা-মা তাঁদের ছেলেমেয়েকে বড় করে তোলার জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলেন। এই ধারণার সূত্রপাত এই কারণে যে, দুটি প্রাপ্তবয়স্কের সম্পর্কে ছেদ আসতেই পারে। কিন্তু তাঁদের ছেলেমেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নৈতিকতাবোধ, সামাজিক করে গড়ে তোলা বাকি থেকে যায়। তাই কো-পেরেন্টিংয়ের অর্থ হল- মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে একটি টিমের অংশীদার হিসেবে কাজ করা। যেখানে দুজনের নয়, তিন বা চারজনেরই মতামতের সমান গুরুত্ব থাকবে।

ফোর্টিস হেল্থকেয়ার, গুরুগ্রামের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মীমাংসা সিং তানোয়ার বলেন, কো-পেরেন্টিংয়ের মাধুর্যই হল অতীতের তিক্ততা ভুলে সন্তানের লালনপালনের জন্য একটি সমঝোতা। যেখানে বাচ্চাটি কোনওভাবেই একাকিত্ববোধ না করে। তার পারিবেশিক মেলামেশা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বেঙ্গালুরুর এক হাসপাতালের সাইকোলজিস্ট সুমালতা বাসুদেব বলেন, কো-পেরেন্টিং একটি শিশুর ভিতরে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরিবেশকে একটু একটু করে স্বাভাবিক করে তোলে। তাতে একদিন হঠাৎ করে আঘাত সে পায় না। কিন্তু, সবশেষে প্রায় সব মনোবিদই বিচ্ছেদের অপরিহার্যতা সত্ত্বেও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুগঠিত রাখতে এই পথে হাঁটছেন। বলা কী যায়, এই পথই হয়তো ভবিষ্যতে একদিন আগের ক্ষত মেরামত করে দিতে পারে! কারণ, ‘একান্ত নিজের’ সন্তানের হাসি বদলে কি দিতে পারে না বাবা-মায়ের দূরত্ব?