ভগবান বিশ্বাসের মতোই মানুষের মধ্যে ভূত, জিন ও ঘোস্ট বিশ্বাস শার্লক হোমসের যুগেও ছিল, রাজকুমার রাওয়ের যুগেও আছে।

ভূত চতুর্দশীতে ভূতরা নেমে আসেন বলে বিশ্বাস করেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে জ্বালানো হয় ১৪ প্রদীপ।
শেষ আপডেট: 14 October 2025 14:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাঁছে আঁয়, কাঁছে আঁয়, তোঁরাঁ বড় ভাল ছেঁলে, কাঁছে আঁয়, কাঁছে আঁয়। ভূতের রাজাকে দেখে যতই আমোদ মিলুক না কেন, সত্যিই যদি বাঁশবাগানের আড়াল থেকে এরকম ১৪ ভূতের নাচনাচানি দেখতে হয়, তাহলে নিমিষে সব মজা ফুড়ুৎ হয়ে যাবে। ভগবান বিশ্বাসের মতোই মানুষের মধ্যে ভূত, জিন ও ঘোস্ট বিশ্বাস শার্লক হোমসের যুগেও ছিল, রাজকুমার রাওয়ের যুগেও আছে। তাই এখনও দেশের অগুনতি মানুষ ভূত চতুর্দশীতে ভূতরা নেমে আসেন বলে বিশ্বাস করেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে জ্বালানো হয় ১৪ প্রদীপ।
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি অর্থাত্ কালীপুজোর আগের দিনটি ভূত চতুর্দশী নামে পরিচিত। অনেক জায়গায় এই দিনকে নরক চতুর্দশী বলা হয়ে থাকে। কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই দিনে স্বর্গ ও নরকের দ্বার খুলে দেওয়া হয়। ভূত চতুর্দশীতে ভূত প্রেতের দল মর্ত্যে ঘোরাফেরা করে বলেও মনে করেন অনেকে। অন্ধকার হলেই নাকি ‘তেঁনারা’ নেমে আসেন ইহজগতে। চারপাশে একটা গা ছমছমে ভাব। এই দিন সন্ধেবেলা বাড়ির নানা স্থানে মোট ১৪টি প্রদীপ জানানোর রীতি রয়েছে। সেই কারণে এদিন সন্ধের পর বাইরে বেরতেও বারণ করা হয়।
পুরাণে ১৪টি ভুবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যার সাতটি স্বর্গ ও সাতটি পাতাল। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, জনঃ, মহঃ, তপঃ ও সত্য হল স্বর্গ। অন্যদিকে মাটির নীচে রয়েছে অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল এবং পাতাল এই ১৪ লোকের বাসিন্দাদের সম্মান জানাতে এদিন ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, ভূত চতুর্দশীর দিনে কিছু সময়ের জন্য স্বর্গ ও নরকের দরজা খুলে যায়, তখন আত্মারা মর্ত্যে নেমে আসে। ভূত-প্রেত নিয়ে এদিন রাজা বলিও মর্ত্যে আসেন বলে মনে করা হয়। এই দিনে অশুভ শক্তির প্রকোপ বৃদ্ধি পায় বলে একটা বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এই অশুভ শক্তিকে নিজের বাড়ি থেকে দূরে রাখতেই ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয়ে থাকে। যেহেতু দিনটি চতুর্দশী, তাই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। কিন্তু কোথায় কোথায় দিতে হয় ১৪ প্রদীপ, জানেন?
অন্য একটি ধারণা অনুসারে ভূত চতুর্দশী তিথিতে মর্ত্যে আসেন পূর্বপুরুষরা, সেই রাতে ফিরেও যান তাঁরা। অমাবস্যার আগের রাতে অন্ধকারে তাঁদের পথ দেখাতে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। যে বাড়িতে ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয়, সেই বাড়ির সদস্যরা যে তাঁদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের ভুলে যায়নি, এভাবেই তা প্রমাণিত হয়। যদিও অধিকাংশেরই কাছে ১৪ পুরুষের নাম মেলা ভার। অবশ্য রাগারাগির সময়, মেরে ১৪ পুরুষের নাম ভুলিয়ে দেব, একথাটা সকলেই কমবেশি বলে থাকেন।
আবার ভূত চতুর্দশী তিথিটি অনেক জায়গায় যম চতুর্দশী নামেও পরিচিত। এই দিনে যমরাজের নামে প্রদীপ জ্বালালে অকালমৃত্যুর ভয় এড়ানো যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস। এদিন ১৪ জন যমের উদ্দেশে তর্পণের রীতি আছে। এই ১৪ যম হলেন, ধর্মরাজ, মৃত্যু, অন্তক, সর্বভূতক্ষয়, বৃকোদর, বৈবস্বত, উড়ুম্বর, কাল, যম, দধ্ন, পরমেষ্ঠী, নীন, চিত্র ও চিত্রগুপ্ত। পদ্মপুরাণে বলা আছে ভূত চতুর্দশীতে গঙ্গা স্নান করলে নরক যন্ত্রণা কম সহ্য করতে হয়।
এই সময়ে বাড়ির ঠাকুরঘরে প্রদীপ দেওয়াটা সর্বাধিক প্রয়োজন। বাড়িতে তুলসীমঞ্চ থাকলে, সেখানেও একটি প্রদীপ দিতে হবে। বাড়ির সদর দরজায় দুপাশে দুটি প্রদীপ দিতে হবে। তাতে একটি করে লবঙ্গ রাখতে পারেন। বাড়ির যেখানে জলের ব্যবস্থা রয়েছে বা কলতলায় একটি প্রদীপ দিতে হবে। বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটি প্রদীপ জ্বালাতে হবে। বাড়িতে মাটির উনুন থাকলে, সেই উনুনে একটি প্রদীপ দিন। প্রতিটি প্রদীপই ১৪ পুরুষের প্রতীক। ১৪ পুরুষের নাম মনে থাকলে, প্রদীপ জ্বালানোর সময় এই মন্ত্রটি মনে মনে উচ্চারণ করে নেবেন, তাহলে সকলেই সন্তুষ্ট হবেন।
নমঃ পিতৃভ্যঃ প্রতেভ্যো নমো ধর্মায় বিষ্ণবে।
নমো ধম্রায় রুদ্রায় কান্তারপতয়ে নমো নমঃ।।