চেলসি-র কর্মকর্তারা বরাবরই বলেন, ‘আমরা ওকে শুধু প্রতিভা হিসেবে আনিনি, ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে কিনেছি!’ শনিবার রাতে সেই আস্থারই প্রতিদান দেখল স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে।

এস্তেভাও
শেষ আপডেট: 5 October 2025 15:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স মাত্র আঠারো। অথচ নামটা এখনই স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের (Stamford Bridge) গ্যালারি থেকে শুরু করে প্রতিটি ফুটবল টক-শো—সর্বত্র ছড়িয়েছে। এস্তেভাও উইলিয়ান (Estevao Willian), যাঁকে ব্রাজিলে ডাকা হত ‘মেসিনহো’ (Messinho) নামে, তিনি আপাতত দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে জাঁকিয়ে বসেছেন। শনিবার রাতে লিভারপুলের (Liverpool) বিরুদ্ধে সংযুক্ত সময়ে গোল করে এই প্রতিভাবান ব্রাজিলীয় যেন নিজের আবির্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন!
সাম্বার ছোঁয়ায় কাঁপল স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ
শেষ মিনিটে মার্ক কুকুরেয়ার (Marc Cucurella) ক্রস আসে বাঁ-দিক থেকে। ম্যাচের বয়স ৯৫ মিনিট। স্কোর ১–১। লিভারপুলের রক্ষণ তখন ক্লান্ত, দম নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে, দৌড়ে ঢুকে এল তরুণ এস্তেভাও। আলতো টাচে বল ঠেলে দিলেন জালে। ২–১! এক নিমেষে উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা স্টেডিয়াম। চেলসি (Chelsea) ম্যানেজার এনজো মায়েরস্কা (Enzo Maresca) টাচলাইন পেরিয়ে ছুটে এলেন মাঠে—সেই উল্লাসের দায়ে লাল কার্ড দেখে বেরিয়েও গেলেন। যদি আর সব ছাপিয়ে নজরে ব্রাজিলের মিডফিল্ডার। পুরো রাতটাই লেখা ছিল এস্তেভাওয়ের নামে!
কেবল একখানা গোল নয়, ব্রিটিশ ফুটবলে নিজের নামটিও খোদাই করে দিলেন প্রতিশ্রুতিমান তরুণ। যা দেখে ওয়েন রুনি (Wayne Rooney) ‘ম্যাচ অফ দ্য ডে’-তে বলেছেন, ‘মাত্র আঠারো বছর বয়স, কিন্তু স্পেশ্যাল ট্যালেন্ট। চেলসির ভবিষ্যৎ হয়ে উঠতে পারে এস্তেভাও!’
এক ঝলকে আস্থা, এক ছোঁয়ায় বিস্ময়
লিভারপুলের বিপক্ষে নামার আগে পর্যন্তও কেউ ভাবেনি, এস্তেভাও এমন করে আলো কাড়বেন। ৭৫ মিনিটে ময়দানে। তার পরের ২০ মিনিটেই গোটা সমীকরণ বদলে গেল। চারটি সফল ড্রিবল, দুটি নিখুঁত সু্যোগ তৈরি, একবার সরাসরি শট… যার জবাবে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয় লিভারপুল। কঠিন পরীক্ষায় বসেন গোলরক্ষক জর্জি মামারদাশভিলি (Giorgi Mamardashvili)। ৯১ মিনিটে এস্তেভাওয়ের ক্রসেই পোস্টে লাগে এনজো ফার্নান্দেজের হেডার। এবং অবশেষে ইনজুরি টাইমে সেই গোল—যে গোল চেলসিকে এনে দেয় গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট আর এস্তেভাওকে ভরপুর স্টারডম!
চেলসির সহকারী কোচ উইলি ক্যাবালেরো (Willy Caballero) পরে বলেন, ‘ছেলেটা দারুণ পরিশ্রমী। ওর মতো তরুণদের মানিয়ে নিতে সময় লাগে। কিন্তু সবাই ওকে দলে টেনে নিয়েছে। ওর সঙ্গে আমি স্প্যানিশে কথা বলি—বুঝতে পারে। খুব বিনয়ীঅ বটে!’
মেসিনহো থেকে এস্তেভাও
ব্রাজিলের পালমেইরাসে (Palmeiras) থাকাকালীনই পান সুনাম। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাবের হয়ে ৮৩ ম্যাচে ২৭ গোল ও ১৫টি অ্যাসিস্ট—অসংখ্য দর্শককে মুগ্ধ করে তাঁর বল কন্ট্রোল, দ্রুত টার্ন আর অনায়াসে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতা। যে কারণে ডাকা শুরু হয় ‘মেসিনহো’ নামে। মাঠে বল পেলেই তাঁর শরীরের দোল আর মুভমেন্টে যেন খানিকটা মেসির (Lionel Messi) ছায়া!
এই প্রতিভার জন্যই এস্তেভাওয়ের পিছু নেয় ইউরোপের প্রায় সমস্ত বড় দল—রিয়াল মাদ্রিদ (Real Madrid), বার্সেলোনা (Barcelona), পিএসজি (PSG), বায়ার্ন মিউনিখ (Bayern Munich)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চেলসিই তাঁকে দলে টানে। কারণ, লন্ডনের ক্লাব তাঁকে প্রথম থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—‘তুমি আসবে, খেলবে, আর আমাদের পরিকল্পনার শরিক হবে!’ এরপর থিয়াগো সিলভার (Thiago Silva) সঙ্গে আলোচনা। অবশেষে পাকা সিদ্ধান্ত।
ইংল্যান্ডে মানিয়ে নেওয়ার গল্প
২০২৫ সালের মাঝামাঝি পালমেইরাস থেকে যোগ দেন এস্তেভাও। তখনও তাঁর বয়স আঠারো হয়নি। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন লিগ—চাপ ছিলই। প্রথম কয়েক মাস কিছুটা চুপচাপ, নিজের খোলসেই। কিন্তু ট্রেনিং গ্রাউন্ডে তাঁর স্কিল দেখে সতীর্থরা বুঝে যান, মার্কামারা প্রতিভাবান নন, এস্তেভাও বাকিদের থেকে অনেকটা আলাদা। কোল পালমার (Cole Palmer) যেমনটা বলেছিলেন, ‘ওর পায়ে বল থাকলে বাকিরা থেমে যায়। কারণ কিছু না কিছু অন্যরকম হতে যাচ্ছে, এটা সবাই জানে!’
প্রথম দলে সুযোগ পেতে সময় লাগেনি। কারণ, পালমারের চোটে হঠাৎ খালি জায়গা তৈরি হয়। মায়েরস্কা পরিকল্পনা বদলে তাঁকেই দলে নেন। এরপর থেকে প্রায় প্রতি লড়াইয়ে সজীব উপস্থিতি। একমাত্র ব্রেন্টফোর্ড ম্যাচ মিস করেন অসুস্থতার কারণে।
ব্রাজিল থেকে ইংল্যান্ড: প্রত্যাশার ভার
ব্রাজিলে এস্তেভাও মানেই ‘পরবর্তী সুপারস্টার’। দেশের রেকর্ড বইয়ে ইতিমধ্যে নাম তুলে ফেলেছেন। ১৮ বছরের কম বয়সে ব্রাজিলীয় সেরি আ-তে (Serie A) ২০টি গোল ইনভলভমেন্টের কৃতিত্ব রয়েছে। আগে এই রেকর্ড ছিল নেইমারের (Neymar)। এ ছাড়া ক্লাব বিশ্বকাপে (Club World Cup) দু’বার ‘সুপিরিয়র প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচে’র সম্মান। লিওনেল মেসির ইন্টার মায়ামির (Inter Miami) বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স! যার পর থেকেই ‘মেসিনহো’ ট্যাগ আরও পোক্ত হয়। এস্তেভাওয়ের ভবিষ্যৎ এখন যেন সাজানো রাস্তা। লক্ষ্য যদিও একটাই—২০২৬ সালের বিশ্বকাপে (World Cup 2026) ব্রাজিল জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া।
চেলসি-র কর্মকর্তারা বরাবরই বলেন, ‘আমরা ওকে শুধু প্রতিভা হিসেবে আনিনি, ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে কিনেছি!’ শনিবার রাতে সেই আস্থারই প্রতিদান দেখল স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে।