যে মানুষ একদিন মদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই পরে মদ্যপানের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি এর কারণ, হয়তো তিনি উত্তর দিতেন এমন নির্মমভাবে, যা সহ্য করা যেত না।

ঋত্বিক ঘটক
শেষ আপডেট: 4 November 2025 12:39
অনেকেই বলাবলি করেন মানুষের আঙুল দেখে নাকি দোষ-গুণ বিচার করা যায় অনেক ক্ষেত্রে। বৃদ্ধাঙ্গুল যত সুন্দর, যত বেশি লম্বা এবং হাতের চেটোর সঙ্গে লম্বভাবে যুক্ত, সে তত বেশি সুন্দর মনের মানুষ। তার তত বেশি বুদ্ধির বিকাশ হয়ে থাকে। যাদের বৃদ্ধাঙ্গুল খর্ব, স্থুল তার মানসিক গঠন অমার্জিত। আবার খুব ছোট ও মোটা বৃদ্ধাঙ্গুলির মানুষের নাকি কোনও বিচার বুদ্ধি কাজ করে না। ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষে (Ritwik Ghatak Birthday) তাঁকে নিয়ে লেখা কিছু বইপত্তর পড়তে গিয়ে কথাগুলো মনে পড়ল। বাংলার এই চলচ্চিত্রকার এমনই এক আইডেন্টিটি যাঁর দোষ-গুণ নিয়ে কথা ওঠে হামেশাই।
সে সময় অনেকেই আলোচনা করতেন ঋত্বিকের হাত নিয়ে। বলতেন, কী সুন্দর লম্বা আঙুল! সেগুলো যেন কথা বলে। কথাটা শুনে হঠাৎ মনে পড়ল, কোথাও যেন পড়েছিলাম— সুন্দর, সুশৃঙ্খল আঙুল নাকি সহজ মনের লক্ষণ। কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের মনের ভেতর যে কত রকমের ঢেউ বয়ে যেত, তা কে জানে! হয়তো সংঘাত না থাকলে, তাঁর শিল্পীসত্তা এমন উন্মত্ত আগুনে জ্বলত না।
ঋত্বিক ছিলেন একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। তাঁর ভিতরে দোষ, গুণ— দুইই প্রবল ছিল। তিনি নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে যেমন সচেতন ছিলেন, আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর, কখনও আবার আত্মম্ভরিতার শেষ সীমায় আসীন। মনে হতো, তাঁর লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে তিনি পুরো আকাশটাকেই ছুঁতে চান, যেন রঙ মেখে আঁকতে চান প্রতিবাদের এক বিশাল ক্যানভাস। কিন্তু সেই আঙুলের ফাঁকে বাস্তবের ধুলো জমে যেত, আর মানুষ ঋত্বিক ক্রমে জর্জরিত হতেন স্ব-বিরোধিতায়।
যে মানুষ একদিন মদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই পরে মদ্যপানের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি এর কারণ, হয়তো তিনি উত্তর দিতেন এমন নির্মমভাবে, যা সহ্য করা যেত না।
লেখা, রাজনীতি, মঞ্চ, সিনেমা— সব ক্ষেত্রেই যেন সহজাত প্রতিভা ছিল তাঁর। শেখার প্রয়োজন হয়নি, যেন সবই জন্মগত। ‘অযান্ত্রিক’-এর মতো (Ajantrik) এক অভিনব বিষয় নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন এমন সময়ে, যখন বাংলা দর্শক তখনও প্রস্তুত নয় এমন চিন্তার জন্য। তাই প্রত্যাশা যতটা, প্রতিক্রিয়া ততটাই তিক্ত। তবু ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (Bari Theke Paliye) তৈরি করেছিলেন, মানুষের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ খুঁজে পেতে।
ঋত্বিকের সিনেমায় যন্ত্রও ছিল জীবন্ত। ‘অযান্ত্রিক’-এর গাড়ি যেন এক মানুষ, সুখে-দুঃখে সঙ্গী। আর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (Meghe Dhaka Tara), ‘কোমল গান্ধার’ বা ‘সুবর্ণরেখা’য় তিনি দেখিয়েছেন রাজনীতির যন্ত্রচালিত পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প। দেশভাগের ক্ষত তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের নদীতটে, যেখানে তিনি বানিয়েছিলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। সেই ছবিতে আবার ফিরে এসেছে তার গীতিকাব্যের সুর, যদিও তখন তিনি দেহে-মনে ভীষণই অসুস্থ।
ঋত্বিক ছিলেন জেদি, স্পষ্টভাষী, কখনও অসহিষ্ণু— তবু নিঃস্বার্থ। নাট্যজগৎ থেকে আইপিটিএ পর্যন্ত, সহকর্মীদের সঙ্গে যতই মতভেদ হোক, সম্পর্কের উষ্ণতা কখনও হারায়নি। সপ্ত হাউসের বারান্দায় কাঁধে ঝোলা, মুখে চেনা হাসি নিয়ে বলেছিলেন, “যান, দেখে আসুন কেমন অভিনয় করেছি।” অথচ ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’-তে তিনি অভিনয় করেননি— বরং উল্টেছিলেন নিজের জীবনটা, একপাতা একপাতা করে।
তাঁর প্রতিটি আঙুলে ছিল এক জীবনের গল্প। সেই হাত আজ নেই, কিন্তু তার স্পর্শ থেকে তৈরি হয়েছে এক অনন্ত শিল্পধারা— যা আজও আলো জ্বেলে রাখে বাংলা সিনেমার অন্তরে। কোথায় যেন সত্যি হয়ে যায়, সুমনের সেই গান। “সে চলে গেলেও থেকে যাবে তার স্পর্শ আমারই হাতের ছোঁয়ায়…” এক্ষেত্রে হাতে নয়, আমাদের মনে, মাথায়, চিন্তায় থেকে গেছে তাঁর স্পর্শ।
তিনি সিনেমা করেছেন মানুষের জন্য। কারণ মানুষের চেয়ে বড় কোনও সত্যি আছে বলে বিশ্বাস করতেন না। বলতেন, "সব শিল্পের শেষ কথা মানুষ, আর সিনেমাও তার ব্যতিক্রম নয়। সিনেমা কোনও আলাদা জগৎ নয়, বরং অন্য সব শিল্পের মতো এখানেও দরকার সেই গভীরতম মানবিক মুহূর্তগুলোর অনুসন্ধান। আমি বিশ্বাস করি, সিনেমা এক ধরনের শিল্প, আর তাই তার দায়বদ্ধতাও আছে— মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি।"
‘ফিল্ম ফর্ম’ বলে আলাদা কোনও মহিমা নেই। মানুষের মন ছোঁয়া, তাকে ভাবাতে পারা, তাকে মোহিত করা— এটাই সব শিল্পের লক্ষ্য বলে মানতেন খামখেয়ালি এই চলচ্চিত্রকার।
সব মিলিয়ে, ঋত্বিক ঘটক যেন এক অসমাপ্ত বাক্য— যার শেষ কেউ লিখতে পারেনি এখনও। কারণ তাঁর ভিতরকার আগুন নিভে গেলেও সেই দহন এখনও টের পাওয়া যায় বাংলা সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে, প্রতিটি উচ্চারণে। তিনি শুধু চলচ্চিত্র বানাননি, তৈরি করেছিলেন এক বোধের মানচিত্র— যেখানে বাস্তব আর কল্পনা, যন্ত্র আর মানুষ, ক্ষত আর সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। হয়তো এ কারণেই ঋত্বিক আজও আমাদের বিবেকের অন্তরালে নীরবে নির্দেশ দেন, ‘ভাবা প্র্যাকটিস করো!’