রামকৃষ্ণ ভাবাশ্রিত কল্যাণকর আদর্শে ডুব দিয়ে এককালে সেবাকে ধর্ম করে একদল সদ্য যুবক গেরুয়া বেশ ধরে পথে নেমেছিলেন।
.jpeg.webp)
সারদাদেবীকে বলা হতো সঙ্ঘজননী।
শেষ আপডেট: 11 December 2025 14:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারদাদেবীকে বলা হতো সঙ্ঘজননী। যিনি ছিলেন সকলের মা। বিবেকানন্দ, নিবেদিতাই শুধু নয়, প্রায় দেড়শো বছর ধরে আপামর হিন্দু বাঙালি ছাড়াও খ্রিস্টান, পারসি থেকে আমজাদেরও মা হয়ে থেকে গিয়েছেন সারদাদেবী। রামকৃষ্ণ ভাবাশ্রিত কল্যাণকর আদর্শে ডুব দিয়ে এককালে সেবাকে ধর্ম করে একদল সদ্য যুবক গেরুয়া বেশ ধরে পথে নেমেছিলেন। তিনি শুধু তাঁদেরই মা ছিলেন না, দেশমুক্তির আগুনে ঝাঁপ দেওয়া বিপ্লবীদেরও মা ছিলেন। সে কারণেই তাঁর মাতৃত্ব সমান দৃষ্টিতে ছিল গোরা সৈনিকদের প্রতিও। দেশ স্বাধীন করার নামে হানাহানি, রক্তারক্তি করে ইংরেজ নিধনের বিরোধী ছিলেন সারদাদেবী। বলেছিলেন, আমি মা হয়ে কাউকে উচ্ছন্নে যেতে কি করে বলবো, ইংরেজ কি আমার সন্তান নয়? আমি বলি, সকলের কল্যাণ হোক। ভারতবর্ষ স্বাধীন হোক, সেটা তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের কারও কোনও ক্ষতি হোক তা তিনি চাননি কখনও।
আর সে কারণেই খোদ বিবেকানন্দ শিবানন্দজিকে চিঠিতে লেখেন, যার মা-র ওপর ভক্তি নেই তার ঘোড়ার ডিম হবে। সোজা বাংলা কথা। ঠাকুর বরং যাক। ঠাকুরের থেকে মা বড়ো দয়াল। মা-কে তোমরা বোঝনি। মায়ের কৃপা লক্ষগুণ বড়ো। ১৮৯৮ সালের ১৭ মার্চ নিবেদিতার সঙ্গে সারদাদেবীর প্রথম সাক্ষাতের দিনটিকে মিস মার্গারেট নোবেল (পরে নিবেদিতা) ‘Day of days’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর ১৯১১ সালের এপ্রিল-মে মাসে সারদা দেবীর সঙ্গে নিবেদিতার শেষবারের জন্য দেখা হয়েছিল। আর এই কয়েক বছর ধরে প্রায়শই নিবেদিতা যেতেন সারদার সঙ্গে দেখা করতে। সারদাদেবীকে কালী বলেছিলেন নিবেদিতা। আর সারদাদেবীর নিজের হাতে তৈরি করে ঝালর দেওয়া হাতপাখা নিবেদিতা চিরকাল সঙ্গে করে রেখে দিয়েছিলেন। নিবেদিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলও পরিদর্শনে গিয়েছিলেন সারদাদেবী। বলেছিলেন, মেয়েদের জন্য খুব ভাল কাজ করছ।
সারদাদেবী কাছে কে সন্তান-স্নেহ পাননি? অরবিন্দ ঘোষ, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, বিপ্লবী বাঘাযতীন, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। নিবেদিতাও ভারতসেবার মন্ত্র পেয়েছিলেন সারদাদেবীর কাছ থেকে, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। বিপ্লবী বিধবা নারী ননীবালা কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে তখন অনশন করছেন। জনমত তাঁর দিকে। পুলিশের সুপারিনটেন্ডেন্ট গোল্ডি ননীবালাকে ডেকে বললেন "আপনি আহার গ্রহণ করুন, তার জন্য আপনার যেকোনও ইচ্ছাপূরণ করব।" ননীবালাদেবী বলেছিলেন, "আমায় বাগবাজারে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্ত্রীর কাছে রেখে। তাহলেই খাব।" এতটাই শক্তির উৎস ছিলেন সারদা। আর তাঁর শক্তির আধার ছিলেন পরমহংসদেব। বিপ্লবী প্রিয়নাথ দাশগুপ্তকে শ্রীমা বলেছিলেন, "ভয় করো না, ঠাকুর সব ঠিক করে দেবেন।"
মানিকতলা বোমা মামলায় জড়িত দুই বিপ্লবী রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে যোগ দিয়েছিলেন কেবল সারদামায়ের ইচ্ছায়। তাঁরাই হয়ে ওঠেন স্বামী প্রজ্ঞানন্দ ও স্বামী চিন্ময়ানন্দ। পূর্বাশ্রমে তাঁরা ছিলেন দেবব্রত বসু ও শচীন্দ্রনাথ সেন। অনুশীলন সমিতির আরও যেসব সদস্য শ্রীমায়ের কাছে মন্ত্রদীক্ষা নিয়ে মঠে যোগদান করেছিলেন তাঁদের মধ্যে রয়েছে, নগেন্দ্রনাথ সরকার (স্বামী সহজানন্দ), প্রিয়নাথ দাশগুপ্ত (স্বামী আত্মপ্রকাশানন্দ), রাধিকামোহন গোস্বামী (স্বামী সুন্দরানন্দ) সতীশ দাশগুপ্ত (স্বামী সত্যানন্দ) ধীরেন দাশগুপ্ত (স্বামী সম্বুদ্ধানন্দ), অতুল গুহ (স্বামী অভয়ানন্দ বা ভরত মহারাজ) প্রমুখ।
১৯০৯ সালের ২২ জুলাই মিস ম্যাকলাউডকে লেখা এক চিঠিতে নিবেদিতা লিখছেন, "সব দলগুলিই ঐক্যবদ্ধ হইয়া বলিতেছে, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিকট হইতে নূতন প্রেরণা আসিতেছে। কারাগার হইতে মুক্তিলাভ করিয়া দলে দলে সকলে সারদাকে প্রণাম করিয়া যাইতেছে।" স্বদেশী ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় বহু তরুণ বিপ্লবী মঠে যোগদান করেন। কয়েকজন বিপ্লবী মায়ের কাছে দীক্ষাগ্রহণও করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিভূতিভূষণ ঘোষ, বিজয়কৃষ্ণ বসু, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, রজনীকান্ত প্রামাণিক প্রমুখের নাম উল্লেখ্যযোগ্য। বিপ্লবী যোগেন্দ্র নাথ গুহঠাকুরতার মেয়ে প্রফুল্লমুখী দেবীও মায়ের কাছে মন্ত্র দীক্ষা পেয়েছিলেন। ঢাকার স্বাধীনতা সংগ্রামী, শ্রীমায়ের ভক্ত রাজেন্দ্রভূষণ গুপ্তের কন্যা গিরিজা গুপ্ত শ্রীমায়ের কাছে দীক্ষাগ্রহণ করেন।
১৯১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল তাঁর ভাষণে রামকৃষ্ণ মিশন সম্পর্কে বললেন, দেশে সন্ত্রাসীবাদী তরুণ ও যুবকেরা রামকৃষ্ণ মিশনের মদতপুষ্ট। মিশনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের আনুকূল্যে এবং ত্রাণকার্য করার ছলে প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের প্রভাবিত করে যাচ্ছে। দেশবাসী যেন এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের ছেলেদের যোগাযোগ যা কি-না রাষ্ট্রদোহিতার নামান্তর, সে ব্যাপারে সাবধান হন। গভর্নরের মন্তব্যে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল।
মঠ ও মিশন থেকে অনেকের বহিষ্কারের দাবি উঠেছিল। মঠ ও মিশনের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ তখন দক্ষিণ ভারতে। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক স্বামী সারদানন্দ সারদাদেবীর কাছে ছুটলেন। শ্রীশ্রী মা বলেছিলেন, "ও মা! এ সব কী কথা! ঠাকুর সত্যস্বরূপ। যে সব ছেলে তাঁকে আশ্রয় করে তাঁর ভাব নিয়ে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছে, দেশের, দশের ও আর্তের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে, সংসারের মুখে জলাঞ্জলি দিয়েছে, তারা মিথ্যাভাষণ কেন করবে বাবা? স্বামী সারদানন্দকে মা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ঠাকুরের ইচ্ছেয় মঠ-মিশন হয়েছে। রাজরোষে নিয়ম অলঙ্ঘন করা অধর্ম। ঠাকুরের নামে যারা সন্ন্যাসী হয়েছে তারা মঠে থাকবে নয়তো কেউ থাকবে না। তাঁর ছেলেরা গাছতলায় আশ্রয় নেবে। তবু সত্যভঙ্গ করবে না। তুমি লাটসাহেবের সঙ্গে দেখা করো। তিনি রাজপ্রতিনিধি। তোমাদের সব কথা তাঁকে বুঝিয়ে বললে তিনি নিশ্চয়ই শুনবেন।" মায়ের পরামর্শে কাজ হয়েছিল।
১৯১৭ সালে স্বদেশি মামলা অভিযোগে যুথবিহার গ্রামের দেবেনবাবুর আসন্নসম্ভবা স্ত্রী ও বোনকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে বাঁকুড়া থানায় বন্দি করেছিল পুলিশ। মা বলেছেন, "এমন কোনও বেটাছেলে কি সেখানে ছিল না যে দু’চড় মেরে মেয়ে দু’টিকে ছাড়িয়ে আনতে পারত?"
কোয়ালপাড়া আশ্রমের ছেলেদের বলতেন, "বাবা, তোমরা বন্দেমাতরম্ করে হুজুগ করে বেড়িও না তাঁত কর, চরকা কর, আগে তো তাঁতের কাপড়ই সবাই পড়ত, চরকা পেলে আমিও সুতো কাটি।" প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালে, খাদ্যাভাব ও বস্ত্রাভাব চরমে ওঠে দেশে। মেয়েরা বস্ত্রাভাবে বাইরে বের হতে পারছে না। এক টুকরো কাপড়ের জন্য কেউ কেউ আত্মহত্যাও করছে। দিকে দিকে হাহাকার। মা বললেন, "কাপড় না পেলে কী করবে গো? তখন ঘরে ঘরে চরকা ছিল, ক্ষেতে কাপাস চাষ হত, সকলেই সুতো কাটত, নিজেদের কাপড় নিজেরাই করিয়ে নিত, কাপড়ের অভাব ছিল না। কোম্পানি এসে সব নষ্ট করে দিলে। কোম্পানি সুখ দেখিয়ে দিলে টাকায় চারখানা কাপড়, একখানা ফাও। সব বাবু হয়ে গেল চরকা উঠে গেল। এখন বাবু সব কাবু হয়েছে।
সহধর্মিনীকে রামকৃষ্ণ একবার বলেছিলেন, 'পরে দেখবে, এত ছেলে তোমায় মা বলে ডাকবে, তোমার সামলানো ভার হয়ে উঠবে।' নিবেদিতা লিখেছেন 'সকল মহান জাতীয়তাবাদীই তাঁর চরণ স্পর্শ করে যেতেন। স্বামী সারদানন্দ কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। যদিও তিনি জানতেন এটা খুবই ঝুঁকির কাজ হয়ে যাচ্ছে।' আর শ্রী মা ওই সন্তানদের নিয়ে গর্ব করে বলছেন, ''কী সাহস। এমন সাহস কেবল ঠাকুর আর নরেনই আনতে পারে। দোষ যদি কারও হয়, সে তো তাদেরই।' ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমার লিখছেন 'একদিন একটি গোপনীয় ফাইলের উপরে দেখিলাম লেখা আছে, 'রামকৃষ্ণ মিশন'। আমি একটু আশ্চর্য বোধ করিয়া ফাইলটি আমার বসিবার ঘরে গিয়া পড়িতে লাগিলাম। ফাইলের সর্বনিম্ন তলে একটি পুলিশ রিপোর্ট আছে-তাহাতে বিস্তৃত ভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, রামকৃষ্ণ মিশনের ৮/১০ জন সাধু পূর্বজীবনে বিপ্লবী ও গুপ্তসমিতির সভ্য ছিলেন, কেহ কেহ ডাকাতি করিয়াছেন এবং নানাভাবে বিপ্লবীদের সাহায্য করিতেন। তাঁহাদের পূর্বেকার এবং বর্তমান সাধু অবস্থার নামও দেওয়া আছে। সেক্রেটারী এই সমস্ত বিবরণ দিয়া বড়লাটের কাছে প্রস্তাব করিলেন যে, বেলুড় মঠকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিযা বন্ধ করিয়া দেওয়া হউক।'
সারদামণির পরামর্শ (স্বামী সারদানন্দকে), ''তুমি একবার লাট সাহেবের সঙ্গে দেখা কর। তিনি রাজ প্রতিনিধি। তোমাদের সব কথা তাঁকে বুঝিয়ে বললে তিনি নিশ্চয়ই শুনবেন।' ওই একটি নিদানেই সে যাত্রা বেঁচে গেল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। তবে ব্রিটিশ সরকারের মত পরিবর্তনের পিছনে অন্য কারণ ছিল বলে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র তাঁর লেখায় ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, 'বড়লাট ফাইলে লিখিয়াছেন-'পুলিশের রিপোর্ট এবং সেক্রেটারির মন্তব্য খুব সম্ভব বেলুড় মঠের কর্তৃপক্ষ জানিতে পারিয়াছেন। কারণ, মাত্র কয়েকদিন পূর্বে একজন আমেরিকান মহিলা (মিস জোসেফিন ম্যাকলাউড) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া বলিলেন, যদি বেলুড় মঠ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে আমেরিকায় ইহার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন হইবে। এসময় (খুব সম্ভব প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপন্ন ইংরেজ আমেরিকার সাহায্যের উপর বিশেষভাবে নির্ভর করত) কোনরকমে আমেরিকার বিরুদ্ধভাজন হওয়া যুক্তিযুক্ত নহে। সুতরাং বেলুড় মঠ বন্ধ না করিয়া সাদা পোশাকে কয়েকজন পুলিশ কর্মচারীকে সদাসর্বদা বেলুড়মঠে নিযুক্ত করা হোক।'
বিপ্লবীদের প্রতি সারদার এমন স্নেহশীল ব্যবহার সত্ত্বেও সিস্টার নিবেদিতা স্বদেশী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়তে হয়েছিল। বহিষ্কারের পরেও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা নিবেদিতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন কেন? কেনই বা মায়ের বাড়িতে নিবেদিতার ছিল অবারিত দ্বার? এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি আজও। 'মা সিস্টারকে কখনও বিপ্লবের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে বলেছেন বলে শুনিনি। মা যদি তাঁকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতেন তাহলে নিশ্চয়ই নিবেদিতার পক্ষে বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা অসম্ভব ছিল।' বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের প্রধান হেমচন্দ্র ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু যখন জানলাম বহিষ্কারের পরে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে নিবেদিতার সম্পর্ক অটুট আছে, তখন বুঝতে পারলাম এটা লোকদেখানো।' হেমচন্দ্রবাবুর ধারণা, 'নিবেদিতাকে বহিষ্কারের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার পিছনে মায়ের সুগভীর বাস্তববুদ্ধির অবদান ছিল।'
বাঘাযতীনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী পঞ্চানন চক্রবর্তী এক জায়গায় লিখেছেন, 'পলাতক অবস্থায় যতীন্দ্রনাথ ১৯১৫ সালে বাগনান হইতে যাত্রাকালে স্টেশনে শুনিতে পান শ্রীমা সারদাদেবী ওই ট্রেনে কোথাও যাইতেছেন। তিনি সকল বিপদ তুচ্ছ করিয়া মায়ের কাছে ছুটিয়া যান ও তাঁহার আশীর্বাদ লইয়া যান।' ট্রেনের একটি কামরায় যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে মায়ের একান্তে কথা হয়। পরে মাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, 'কি কথা হল?' মায়ের সংক্ষিপ্ত জবাব, 'দেখলাম আগুন' (স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, কমলা দাশগুপ্ত, পৃষ্ঠা-৩৭-৪১)। সেটাই ছিল মায়ের সঙ্গে ওই স্বাধীনতা যোদ্ধার শেষ সাক্ষাৎকার। বাঘাযতীন সশস্ত্র সংগ্রামে যাচ্ছেন তাতে প্রাণহানির আশঙ্কা প্রবল জেনেও সারদা তাঁকে নিরস্ত করেননি। ওই বছরই বালেশ্বরে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মৃত্যু হয় বাঘাযতীনের।
পরমেশানন্দ লিখছেন, 'মা একদিন তাঁদের সাবধান করে দিয়ে বলেন, 'বাবা তোমরা এরকম করে বেড়িয়ো না, দেখো না ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়ে গেল। তাঁত করো, চরকা কাটো...।' তবুও সারদাদেবী বলতেন, 'ওরা কবে যাবে গো, কবে যাবে গো।' শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে ইংরেজরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়িয়েছে বলে কেউ সওয়াল করলেই বলতেন, 'কিন্তূ বাবা ঐ সব সুবিধা হলেও আমাদের দেশের অন্নবস্ত্রের অভাব বড় বেড়েছে। আগে এত অন্নকষ্ট ছিল না।' ইংরেজ সরকারকে 'কোম্পানি' নামেই ডাকতেন। ইংরেজরা আমাদের কতটা ক্ষতি করেছে তা বোঝাতে গিয়ে সারদাদেবী বলেন, 'তখন ঘরে ঘরে চরকা ছিল, ক্ষেতে কাপাস চাষ হত, সকলেই সুতো কাটত, নিজেদের কাপড় নিজেরাই করিয়ে নিত, কাপড়ের অভাব ছিল না। কোম্পানি সব নষ্ট করে দিলে।'
রামচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে সস্ত্রীক অরবিন্দ ঘোষ সারদাকে দর্শন করতে গেলেন। অরবিন্দকে দেখে সারদা বললেন, 'এইটুকু মানুষ, এঁকেই গবর্নমেন্টের এত ভয়!' অরবিন্দকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন আমার বীর ছেলে। অরবিন্দ ও সারদার মধ্যে সাক্ষাৎ সম্পর্কে নানা বাগবিতণ্ডা বিদ্যমান। শ্রীগিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী রামকৃষ্ণ মিশনের বাংলা মুখপত্র 'উদ্বোধন' পত্রিকায় অরবিন্দ সম্পর্কে এক বারাবাহিক প্রবন্ধমালায় সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন যে ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯১০ সালে চন্দননগর যাত্রার পূর্বে অরবিন্দ বাগবাজারে 'উদ্বোধনে' এসে মাকে প্রণাম করে যান। শ্রীঅরবিন্দ-সুহৃদ শ্রীচারুচন্দ্র দত্ত 'উদ্বোধনে' (ফাল্গুন, ১৩৫১, পৃ. ৫৫) এর প্রতিবাদ করে জানান, 'তাঁহার সহিত শ্রীসারদেশ্বরী দেবীর কখনই দেখা-সাক্ষাৎ হয় নাই।' ১৩৫২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা 'প্রবাসী'-তে শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম থেকে শ্রীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী 'অপ্রকাশিত ইতিহাসের এক পৃষ্ঠা' শীর্ষক প্রবন্ধে গিরিজাশঙ্করের মতের প্রতিবাদ করেন। শ্রীরামচন্দ্র মজুমদার ১৩৫২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যা 'উদ্বোধনে' এবং শ্রাবণ সংখ্যা 'প্রবাসী'-তে 'অপ্রকাশিত ইতিহাসের আর এক-পৃষ্ঠা' শিরোনাম যুক্ত এক প্রবন্ধে জানান যে, চন্দননগর যাত্রার দিন নয়, অন্য একদিন অরবিন্দের অনুরোধক্রমে স্বামী সারদানন্দের অনুমতি পাওয়ার পর তিনি সস্ত্রীক অরবিন্দকে বাগবাজারে মায়ের কাছে নিয়ে যান।
সারদামণির সঙ্গে সাক্ষাতের পরে তাঁরা যখন গাড়িতে ওঠেন, তখন 'বন্দে মাতরম' পত্রিকার সহকারী সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষ, বেদান্ত-চিন্তামণি, 'উদ্বোধনে' আসছিলেন। সেখানে তাঁদের দেখা হয়। বলা বাহুল্য, অরবিন্দ 'বন্দেমাতরম' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। অরবিন্দ নিজে প্রকাশ্যে সারদাদেবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের বিরুদ্ধে কোনও বিবৃতি দেননি। অরবিন্দ-সারদাদেবী সাক্ষাৎকারকালে উদ্বোধনের কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন স্বামী বিশ্বেশ্বরানন্দজি (কপিল মহারাজ)। তিনি এক চিঠিতে জানান, "শ্রীঅরবিন্দ যে উদ্বোধনে আসিয়া শ্রীশ্রীমাকে দর্শন ও প্রণাম করিয়াছিলেন এবং নীচে পূজনীয় শরৎ মহারাজ যে ঘরে বসিতেন, সেই ঘরে যাইয়া তাঁহাকেও প্রণাম করিয়াছিলেন, একথা ধ্রুব-সত্য। কারণ, এ সকল ঘটনা আমার চোখের সম্মুখে ঘটিয়াছিল।" শ্রীশ্রীমায়ের প্রথম জীবনীকার ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য মহারাজ এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, অরবিন্দ ও মা-র সাক্ষাৎকালে উপস্থিত স্বামী বিশ্বেশ্বরানন্দ এবং কৈবল্যানন্দ (যোগী মহারাজ) উভয়ের মুখেই তিনি শুনেছেন যে, অরবিন্দ তাঁর স্ত্রী-সম্পর্কে মা-কে বলেন, "মা, ওকে আপনি দেখবেন।' মা এ-ব্যাপারে মৌন সম্মতিই দিয়েছিলেন।”
অরবিন্দের পণ্ডিচেরি গমনের পরে মৃণালিনী গভীরভাবে সারদাদেবীকে আঁকড়ে ধরেন। মা তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতেন। মা তাঁর খুব প্রশংসা করতেন এবং বলতেন, “অরবিন্দের স্ত্রী মৃণালিনী মেয়েটি সরল। তাঁর বোন সরোজিনী বেশ চালাক।” বিপ্লবকর্মে অগ্রজ অরবিন্দকে সরোজিনী নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন এবং আলিপুর বোমার মামলা শুরু হলে মামলা চালানোর জন্য সরোজিনী সংবাদপত্র মারফত দেশবাসীর কাছে অর্থসাহায্যের আবেদন জানান। তাঁর আবেদন তৎকালীন প্রায় সকল পত্র-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। যাই হোক, সারদার কাছে মৃণালিনীর যাতায়াত সম্পর্কে পণ্ডিচেরিতে অরবিন্দ বলেন, "I was glad to know that she had found so great a spiritual refuge. মৃণালিনীর কিছু গয়না বোন সুধীরার কাছে গচ্ছিত ছিল। মৃণালিনীর অকাল-প্রয়াণের পর অরবিন্দের অনুমতি নিয়ে ওই গয়না বিক্রি করা হয় এবং ওই অর্থ নিবেদিতা বিদ্যালয়ে দান করা হয়।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, ভারতবর্ষ স্বাধীন হোক, সেটা সারদাদেবী মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের কারও কোনও ক্ষতি হোক তা তিনি চাননি কখনও। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, 'যারা এসেছে, যারা আসেনি, আর যারা আসবে, আমার সকল সন্তানদের জানিয়ে দিও মা-আমার ভালোবাসা আমার আশীর্বাদ সকলের ওপরে আছে'।