বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে বসে একবার বলেছিলেন, লোকে আমাকে ভগবতী বলে, আমিও ভাবি—সত্যিই বা তাই হবে।

রামকৃষ্ণ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ও সারদা, সরস্বতী- জ্ঞান দিতে এসেছে।
শেষ আপডেট: 16 October 2025 15:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মা সারদার মধ্যে কালীকেই দেখেছিলেন ডাকাত-দম্পতি। তখন ১২৯০ সাল। চারদিকে গহন অরণ্য। সূর্য পাটে গেলেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায় চারদিক। জঙ্গল থেকে ভেসে আসে শেয়াল-কুকুরের চিৎকার। মানুষ যাতায়াত করত হেঁটে। সেই সময় থেকেই তেলোভেলোর মাঠ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে। সারদাদেবী কামারপুকুর থেকে হাঁটাপথে কলকাতায় যাচ্ছেন। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। অথচ তেলোভেলোর মাঠ পার হওয়া বাকি। সঙ্গিনীরা হাঁটছেন দ্রুতগতিতে। তাঁরা অন্ধকার নামার আগেই বুকে কাঁপন ধরানো আতঙ্কের তেলোভেলোর মাঠ পার হতে চান। কিন্তু, তাঁদের গতির সঙ্গে মেলাতে পারছেন না মা সারদা।
তাই বাধ্য হয়েই সঙ্গীদের এগিয়ে যেতে বলে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। ঘন অন্ধকার চারদিকে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে জঙ্গল গভীরতর হচ্ছে। সেই জঙ্গলপথে একা হাঁটছেন মা সারদা। হঠাৎই সামনে দেখলেন এক দীর্ঘাবয়ব মানুষ। সে হুঙ্কার দিয়ে বলল, কে গা এ সময়ে এখানে দাঁড়িয়ে? যাবে কোথায়। মা ততক্ষণে তার কাছাকাছি এসে পড়েছেন। সামনে দাঁড়িয়ে এক বলশালী পুরুষ। গায়ের রং ঘোর কালো। হাতে রুপোর বালা, কাঁধে লাঠি। সে ডাকাত। মা বললেন, যাব পুবে।
সারদা তাঁকে দেখে বিচলিত হননি। শিশুসুলভ সারল্যে তিনি বলেন, তোমার মেয়ে গো বাবা। আমি সারদা। যাচ্ছি তোমার জামাইয়ের কাছে দক্ষিণেশ্বর। একথা শুনেই রুক্ষ কঠিন ডাকাত সর্দারের মনও গলে। তিনি ভাবেন, এতদিন ডাকাতি করলেও কেউ তাঁকে এভাবে বাবা বলে ডাকেনি। মা সারদার মধ্যে ডাকাত সর্দার ভীম নিজের আরাধ্য দেবী মা কালীকে দেখতে পান।
মা সারদার মধুর কণ্ঠ শুনেছিলেন ডাকাত সর্দারের স্ত্রী-ও। তিনি মা সারদাকে নিজেদের কুটিরে নিয়ে গিয়ে যত্নআত্তি করেন। ঘরে ছিল মুড়িমুড়কি ও চালভাজা। তাই তিনি খেতে দেন মা সারদাকে। তৃপ্তি করে খেয়ে মাটির দাওয়াতেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন মা সারদা। পরদিন ভোরে ডাকাত সর্দার ভীম নিজেই মা সারদাকে তাঁর সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে দেন। ডাকাত সর্দার ভীম ভাবেন বহু জন্মের পূণ্য ফলে মা ভবতারিণী নিজে এসেছেন তাঁর কাছে। তারপরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রাচীন এক মন্দির। এখনও সেখানে মায়ের নিত্যভোগে দেওয়া হয় চালভাজা ও মুড়িমুড়কি।
সারদার মা শ্যামাসুন্দরী দেবী ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরছেন। সন্ধে হয়েছে। একাই আছেন। আজ শরীরটা যেন ভালো নয়। শিওড়ের শিবঠাকুর দেখে ফেরার পথে হঠাৎ পেটটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। জায়গাটা চেনা। কিন্তু হঠাৎ-ই বড় অচেনা হয়ে উঠল সব। হঠাৎ অন্ধকারের নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে উঠল ঝনঝন নূপুরের শব্দ। কিন্তু শব্দটা আসছে কোথা থেকে? ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলেন শ্যামাসুন্দরী। এ কী! কে ও লালচেলি পরে—গাছ থেকে হাসতে হাসতে নেমে আসছে কেন আমার দিকে? কে? কে তুমি মা? মেয়েটি কোনও উত্তর দিল না। ধীর পায়ে নেমে এল শ্যামাসুন্দরীর কাছে। তারপর পিঠের দিক দিয়ে জড়িয়ে ধরল গলাটা। মুখে বলল স্নেহমাখা মায়াবী কণ্ঠে—আমি তোমার ঘরে এলাম মা।
পৌষের এক মিঠা দিনে রাত ২টার সময় জন্ম হল সেই মেয়ের। শ্যামাসুন্দরী মেয়ের মুখ দেখে আনন্দে ভাসেন। আর ভাবেন, এই কি সেই মেয়েটা যে গাছের তলায় গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল—তোমার ঘরে এলাম মা! তাই রামকৃষ্ণ একদিন নিজেই স্ত্রীকে বলেন, সত্যি সত্যি তোমাকে আনন্দময়ী মা বলে দেখতে পাই। রামকৃষ্ণ তখন তাঁকে পরম যত্নে নহবতে রেখেছিলেন। মা আপনমনে সর্বদা স্বামীর সেবা করে যান। একদিন কী খেয়াল হল, সারদা জিজ্ঞাসা করে বসলেন, আমাকে তোমার কী বোধ হয়? শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, যে মা মন্দিরে আছেন, তিনিই এই শরীরের জন্ম দিযেছেন ও সম্প্রতি নহবতে বাস করছেন এবং তিনি এখন আমার পদসেবা করছেন। সাক্ষাৎ আনন্দময়ীর রূপ বলে তোমাকে সর্বদা সত্য সত্য দেখতে পাই।
স্বামী গৌতমানন্দ বেদান্ত কেসরি পত্রিকার শ্রীসারদা দেবী আধুনিক নারীর আদর্শ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, রামকৃষ্ণ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ও সারদা, সরস্বতী- জ্ঞান দিতে এসেছে। ও কি যে সে! ও আমার শক্তি। ও রাগ করলে এর সব নষ্ট হয়ে যাবে। ওর ভেতরে যে আছে, সে ফোঁস করলে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরও রক্ষা করতে পারবেন না। সারদা বলতেন, ঠাকুর...মাতৃভাব জগতে বিকাশের জন্য আমাকে এবার রেখে গেছেন।
বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে বসে একবার বলেছিলেন, লোকে আমাকে ভগবতী বলে, আমিও ভাবি—সত্যিই বা তাই হবে। নইলে আমার জীবনে অদ্ভুত অদ্ভুত যা সব হয়েছে! এই গোলাপ, যোগীন এরা তার অনেক কথা জানে। আমি যদি ভাবি—এইটি হোক, কী এইটি খাব, তা ভগবান কোথা হতে সব জুটিয়ে এনে দেন। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর সারদা ফিরে যান জয়রামবাটীতে। সেবার জয়রামবাটী থেকে কামারপুকুর ঘুরে আবার ফিরে যাচ্ছেন পিতৃগৃহে।
ঠাকুরের ভাইপো শিবু রয়েছেন মায়ের সঙ্গে। মায়ের কাপড়ের বোঁচকা তাঁর হাতে। জয়রামবাটীতে ঢোকার পথে শিবু পড়লেন দাঁড়িয়ে। মা কিছুদূর এগিয়ে পিছন ফিরে দেখেন শিবু দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিবু বললেন— মা, তুমি একটি কথা বলতে পার, তাহলে আসতে পারি।
—কী কথা?
—তুমি সত্যিই কে বলতে পারো? শিবু জিজ্ঞাসা করলেন।
—আমি আবার কে? তোর খুড়ী।
—তবে যাও। এই তো বাড়ির কাছে এসেছ। আমি আর যাব না।
শিবুর ছেলেমানুষী দেখে সারদা বেশ বিব্রত বোধ করে বলতে লাগলেন, দেখ তো ছেলের কাণ্ড! আমি আবার কে রে? আমি মানুষ, তোর খুড়ী।
—তবে তুমি যাও, আমি যাব না।
শিবুর জেদ দেখে মা আর কি করেন—বললেন, লোকে বলে কালী।
—কালী! মা কালী তো? ঠিক?
—হ্যাঁ, ঠিক।
—তবে চলো।