আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে নালন্দায় জ্ঞানচর্চার যে দীপ জ্বলে উঠেছিল, তার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা এশিয়ায়।

ছবি - এআই
শেষ আপডেট: 29 October 2025 15:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অক্সফোর্ডের (Oxford University) মিনার আকাশ ছোঁয়ার বহু আগে, হার্ভার্ডের (Harvard University) ধারণা জন্মানোরও আগে, ভারত গড়ে তুলেছিল বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় (Ancient residential University in India)। বিহারের (Bihar) হৃদয়ে, আজ যেখানে লাল ইটের ধ্বংসাবশেষ (ruins) নিঃশব্দে শুয়ে আছে, সেখানেই একসময় দাঁড়িয়ে ছিল জ্ঞানের এক নগরী - নালন্দা (Nalanda University)।
আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে, জ্ঞানচর্চার যে দীপ এখানে জ্বলে উঠেছিল, তার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা এশিয়ায়। ১০ হাজার ছাত্র, ২ হাজার শিক্ষকের আলোচনা-বিতর্ক জমে উঠত। জ্ঞানবৃক্ষের ছায়ায় চর্চার বিষয় থেকে বাদ যেত না ব্যাকরণ থেকে জ্যোতির্বিদ্যা, থাকত দর্শন থেকে চিকিৎসাবিদ্যা।
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের সময় প্রতিষ্ঠিত হয় নালন্দা। রাজরাজড়াদের আনুকূল্যে এবং তত্ত্বাবধানে প্রায় ৭০০ বছর ধরে এটি জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চিন, তিব্বত, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা-সহ এশিয়ার নানা দেশ থেকে পণ্ডিতরা পড়তে আসতেন। সেই অর্থে এটাই ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
চিনা পর্যটক হিউয়েন সাং (Xuanzang) ও ই-জিং - এর (Yijing) ভ্রমণ বৃত্তান্তে নালন্দার বিশালতার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁদের মতে, এখানে সেই সময় আটটি বড় প্রাঙ্গণ, ৭২টি লেকচার হল, তিনটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল - রত্নসাগর, রত্নোদধি, রত্নরঞ্জক - যেখানকার পুঁথিগুলি 'রত্নের মতো দীপ্ত'।
নালন্দার পাঠ্যক্রমে ছিল ৬৪টি বিষয়
নালন্দার পাঠ্যক্রম শুধুমাত্র ধর্মতত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। হিউয়েন সাং-এর বর্ণনায় জানা যায়, এখানে পড়ানো হত মোট ৬৪টি বিষয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি - ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্ব (ব্যাকরণ), হেতুবিদ্যা (যুক্তিবিদ্যা), আয়ুর্বেদ (চিকিৎসাশাস্ত্র), গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ (জ্যোতিষ), দর্শন ও তত্ত্বচিন্তা (মাধ্যমিক, যোগাচার), রাজনীতি ও অর্থনীতি (অর্থশাস্ত্র), চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য।
ইতিহাস বলছে, ভারতীয় শিক্ষাদর্শে তখনই জ্ঞানচর্চার বিষয় হিসেবে দর্শন, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, চিকিৎসা - সব ছিল এক বৃহৎ চিন্তাধারার অংশ।
তর্ক, বিতর্ক আর মেধার পরীক্ষা
নালন্দায় পড়াশোনা ছিল তর্ক ও আলোচনানির্ভর। শিক্ষার্থীরা খোলামেলা বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন, শিক্ষকদের মতামতকে চ্যালেঞ্জ করতেন। পড়ুয়াদের নিজস্ব মত প্রমাণ করতে হত যুক্তির মাধ্যমে।
নালন্দায় ভর্তির পরীক্ষাও ছিল কঠিন। ‘দ্বারপালিকা’ পদাধিকারী পণ্ডিতরা প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্ন করতেন প্রার্থীদের। হিউয়েন সাং-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রতি পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র একজনকে ভর্তি করা হত।
রাজাদের অনুদানে চলত বিশ্ববিদ্যালয়
নালন্দা পরিচালিত হত রাজকীয় অনুদানে। গুপ্ত, হর্ষবর্ধন ও পরবর্তীকালে পাল রাজবংশের রাজারা জমি ও অর্থ দান করতেন। বিদেশ থেকেও সাহায্য আসত, যা প্রমাণ করে নালন্দা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পেয়েছিল।
বিশাল ক্যাম্পাসে ছিল ছাত্রাবাস, পাঠশালা, মন্দির, পুকুর ও উদ্যান - সবই এক সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা।
নালন্দা - এক বৈশ্বিক বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র
নালন্দা সেই সময় হয়ে ওঠে মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের কেন্দ্র, যা চিন, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষাপদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ধ্বংসের সময় কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পুঁথি নিয়ে তিব্বতে পালিয়ে যান। সেই পুঁথিগুলি থেকেই পরবর্তী শতাব্দীতে তিব্বতি বৌদ্ধ শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে।
বহু শতাব্দী পরে পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু অংশ লাসা এবং দানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধার হয়, যা প্রমাণ করে নালন্দার জ্ঞানের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর দূরদূরান্তেও।
আগুনে পুড়ে যাওয়া এক সভ্যতা
খ্রিস্টীয় ১১৯৩ সালে বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে ধ্বংস হয় নালন্দা। ইতিহাসবিদদের মতে, বিশাল গ্রন্থাগার 'ধর্মগঞ্জ' টানা কয়েক মাস ধরে পুড়েছিল। নষ্ট হয়ে যায় বহু পাণ্ডুলিপি। জ্ঞান-আলোকও খানিক নিভে, নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল ভারতের জন্য।
২০০০ সালে ইতিহাসবিদ জন কী তাঁর ইন্ডিয়া: আ হিস্ট্রি বইতে লিখেছেন, “নালন্দার অগ্নিশিখা এতদিন জ্বলেছিল যে তা ভারতের শিক্ষার আলোকে বহু শতাব্দীর জন্য ম্লান করে দেয়।”
ধ্বংসস্তূপে জেগে ওঠা নালন্দার দ্বিতীয় অধ্যায়
তবুও নালন্দার চেতনা টিকে আছে। ২০১৪ সালে, মূল ধ্বংসাবশেষের কাছেই পুনরায় গড়ে ওঠে নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া-সহ ১৭টি দেশ সহযোগিতা করে।
নতুন ক্যাম্পাসের নকশা তৈরি হয়েছে মণ্ডল আকৃতিতে, যা জ্ঞানের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।
সময়ের হিসেবে অনেক আগেই জন্ম নিয়েছিল নালন্দা। মাঝে কিছুদিন তার আলো স্তিমিত হয়ে এলেও পোড়া ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফিনিক্সের মতো মাথা তুলে দাঁড়ায় জ্ঞানের নগরী।