মহেন্দ্রপ্রসাদ গুপ্ত। পেশায় বিদ্যুৎকর্মী (Electrician)। যিনি গত দশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে চালিয়ে রেখেছেন রাজাবাই টাওয়ারের ঐতিহাসিক ঘড়িকে (Historical Clock)।

২৩৬ সিঁড়ি ডিঙিয়ে ‘সময়’ বাঁচান মহেন্দ্র
শেষ আপডেট: 25 October 2025 17:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বইয়ের ফোর্ট ক্যাম্পাসের উপর ২৮০ ফুট উঁচু এক টাওয়ার (Rajabai Tower)। বাইরে থেকে কেউ তাকালে সেটি নিছক এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য মনে হয়। কিন্তু ভেতরে, প্রতিদিন সকালে, একজন মানুষ ২৩৬টি সরু সিঁড়ি (Mumbai Rajabai Tower) পেরিয়ে ওঠেন শুধু এই শহরের সময় যাতে থেমে না যায় তা নিশ্চিত করতে।
তিনি মহেন্দ্রপ্রসাদ গুপ্ত। পেশায় বিদ্যুৎকর্মী (Electrician)। যিনি গত দশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে চালিয়ে রেখেছেন রাজাবাই টাওয়ারের ঐতিহাসিক ঘড়িকে (Historical Clock)।
১৮৭৮ সালে নির্মিত রাজাবাই ক্লক টাওয়ার শুধু এক স্থাপত্য নয়, বরং মুম্বইয়ের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। লন্ডনের বিগ বেনের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই টাওয়ারের নকশা করেছিলেন ব্রিটিশ স্থপতি স্যার জর্জ গিলবার্ট স্কট। অর্থ জোগান দিয়েছিলেন স্টকব্রোকার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ, তাঁর মা রাজাবাইয়ের স্মৃতিতে।
রাজাবাই ছিলেন দৃষ্টিহীন। সময় বোঝার জন্য তিনি ঘণ্টার শব্দ শুনতেন। সেই কারণেই তাঁর ছেলে এমন এক ঘড়ি তৈরি করান, যার ঘণ্টাধ্বনি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছয়।
একদিকে ছেলের ভালবাসা, অন্যদিকে স্থাপত্যের ঐতিহ্য— এই দুইয়ের মিশেলে গড়ে ওঠে রাজাবাই টাওয়ার, যা আজও মুম্বইয়ের আকাশরেখার অন্যতম সিগনেচার স্থাপনা।
২০১৮ সালে ইউনেসকো রাজাবাই টাওয়ার-সহ মুম্বইয়ের ভিক্টোরিয়ান গথিক ও আর্ট ডেকো ভবনগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। এর খোদাই, রঙিন কাঁচের জানলা ও সূচালো খিলান এখনও মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক বোম্বের শৈল্পিক অতীতকে।
একসময় টাওয়ারের ১৪টি ঘণ্টা একসঙ্গে বেজে উঠত। এখন বাজে মাত্র পাঁচটি। তবু প্রতি ১৫ মিনিটে সেই সুর এখনও বাজে— সময়ের জানান দেয় শহরবাসীকে।
মহেন্দ্র গুপ্তের কথায়, “এই ঘড়িটা পুরোপুরি মানুষের শক্তিতেই চলে। প্রতিদিন আমি ২৩৬ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি, পরিষ্কার করি, তেল দিই, আর লিভার ঘুরিয়ে ঘড়ি চালু করি। এর ওজন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলো। বিদ্যুৎ নেই— এটি চলে ওজনের ভারসাম্যে।”
ঘড়ির যান্ত্রিক অংশ ঘুরিয়ে রাখার জন্য গুপ্তের প্রয়োজন পড়ে হাতের শক্তি, ধৈর্য আর নিবেদন। তাঁর ভাষায়, “এটা শুধু কাজ নয়, এক রকম সাধনা। আমাদের পুরনো ব্যবস্থা চলতে থাকুক, সেটাই আমার চাওয়া।”
মুম্বই শহর যত দ্রুত বদলাচ্ছে, রাজাবাই টাওয়ার ততটাই স্থির দাঁড়িয়ে। আর তার বুকের ভেতর প্রতিদিন সময়কে বাঁচিয়ে রাখেন এক মানুষ— নিঃশব্দে, অবিচলভাবে। যে শহর এখন মোবাইলের স্ক্রিনে বাঁচে, সেখানে মহেন্দ্র গুপ্ত মনে করিয়ে দেন— সময় কেবল ঘড়িতে নয়, মানুষের হাতেও থামে না।