একসময় বিদায়ী আধিকারিকরা নবাগতদের হাতে তুলে দিতেন গুরুত্বপূর্ণ নথি, ফাইল, সতর্কবার্তা ও অভিজ্ঞতার সারাংশ। এখন প্রশাসনে সেই চর্চা প্রায় বিলুপ্ত, ফলে ব্যাহত হচ্ছে কাজের ধারাবাহিকতা ও দায়বদ্ধতা।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 25 October 2025 15:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময় বিদায়ী আধিকারিকরা নবাগতদের হাতে তুলে দিতেন গুরুত্বপূর্ণ নথি, ফাইল, সতর্কবার্তা ও অভিজ্ঞতার সারাংশ। এখন প্রশাসনে সেই চর্চা প্রায় বিলুপ্ত, ফলে ব্যাহত হচ্ছে কাজের ধারাবাহিকতা ও দায়বদ্ধতা।
ভারতের আমলাতন্ত্রে (India) এক সময় একটি সুশৃঙ্খল প্রথা ছিল। বিদায়ী আধিকারিক তাঁর স্থলাভিষিক্তের জন্য রেখে যেতেন একটি লিখিত ‘চার্জ হ্যান্ডওভার নোট’ (Handover Note)। এই প্রথার সূচনা হয়েছিল ১৮৫৮ সালের Government of India Act-এর পর, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে। ওই সময় থেকেই দায়িত্বে পরিবর্তনের সময়ে সরকারি আধিকারিকদের বাধ্যতামূলকভাবে এমন নোট তৈরি করতে হত, যাতে থাকত চলতি প্রকল্পের অগ্রগতি, গুরুত্বপূর্ণ নথি, গোপন তথ্য, এমনকি কে বিশ্বস্ত, কে নয় সেই সতর্কবার্তাও।
ব্রিটিশ আমলের (British Era System) ওই প্রথা নতুন আধিকারিকদের কাজ সহজ করত। হঠাৎ বদলির পরও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকত, সময় নষ্ট হত না ফাইল বুঝতে। স্বাধীনতার পরও কিছু সৎ ও সচেতন আধিকারিক এই রীতি বজায় রেখেছিলেন, কিন্তু আজ তা প্রায় হারিয়ে গেছে।
বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার— কেউই এই বিষয়ে কোনও স্পষ্ট নির্দেশ দেয় না। কেবল কিছু দফতর মাঝে মাঝে সার্কুলার জারি করে, কিন্তু তা অনুসরণ করা হয় খুব কম ক্ষেত্রেই।
বিদেশমন্ত্রক (MEA) এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে আধিকারিকদের এমন নোট লিখতে উৎসাহিত করে। রেলবোর্ড ২০০২ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছিল, পদত্যাগ বা বদলির সময় প্রতিটি আধিকারিককে সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। ২০১১ সালে আয়কর দফতরও একই নির্দেশ দেয়, স্বীকার করে যে এই রীতি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
কিছু রাজ্য যেমন হিমাচল প্রদেশ ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট দফতরে এ বিষয়ে নির্দেশ জারি করেছে।
ব্রিটেনে আজও মন্ত্রীরা এবং সিনিয়র সিভিল সার্ভেন্টরা হ্যান্ডওভার নোটস লেখেন। ফ্রান্সে একে বলে dossier de passation de service, আর জার্মানিতে Übergabevermerk। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট বদলের সময় তৈরি হয় “Agency Transition Books” বা “Exit Memos”, যাতে বিস্তারিত থাকে নীতি, বাজেট ও চলতি প্রকল্পের তথ্য। সেনাবাহিনীতেও এই রীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হয়— ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও এটি বাধ্যতামূলক।
এই হ্যান্ডওভার নোট থাকলে প্রশাসনিক কাজের গতি বিঘ্নিত হয় না, চলতি প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। নতুন আধিকারিক আগেই জানতে পারেন কোন প্রকল্প অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, কোথায় সমস্যা, কাদের ওপর ভরসা করা যায়। এছাড়া, এতে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা বাড়ে, কারণ কোনও তথ্য গোপন করা বা ফাইল ‘গায়েব’ করার সুযোগ কমে যায়।
আজ অধিকাংশ আধিকারিক হঠাৎ বদলি বা অবসর পান কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই। ফলে হ্যান্ডওভার নোট তৈরির সময়ই পান না। অনেকে ইচ্ছে করেও লেখেন না। যাতে উত্তরসূরি অত দ্রুত কাজ শিখে তাঁদের ‘ছাপিয়ে’ না যান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় দফতরে হ্যান্ডওভার নোট বাধ্যতামূলক করা উচিত। বিদায়ী আধিকারিকের পেনশন বা আর্থিক প্রাপ্যতা যেন এই নোট জমার ওপর নির্ভর করে। তাঁরা বলছেন, প্রতিটি দফতরে আলাদা ইউনিট তৈরি হোক, যারা এই নোটে উল্লিখিত বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়া, বার্ষিক গোপনীয় রিপোর্টে (ACR) উল্লেখ করা যেতে পারে— আধিকারিক এই নির্দেশ মেনেছেন কি না।
পরিশেষে এতে কোনও সন্দেহ নেই যে ব্রিটিশ আমলে যেভাবে আইসিএস অফিসাররা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও নির্দেশিকা লিখে রেখে যেতেন, সেই ধারা আবার ফিরিয়ে আনলে আজকের প্রশাসনও উপকৃত হবে। কারণ প্রশাসনিক দক্ষতা কেবল ফাইল বা নীতিতে নয়, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাতেও টিকে থাকে।