দীপাবলির সঙ্গে এই যোগ আজ অবিচ্ছেদ্য মনে হলেও কিন্তু কখন থেকে আতশবাজি আলোর উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠল?

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 22 October 2025 13:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীপাবলি মানেই আলো, রঙের খেলা, সাজসজ্জা, উপহার আর... আতসবাজি। অন্ধকারকে ছাপিয়ে আলো আর অসুরের বিরুদ্ধে সুরের জয়ের প্রতীক হিসেবে এই উৎসব আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্যাপিত হয়।
বাড়ি বাড়ি জ্বলে ওঠে প্রদীপ আর মোমবাতি, রঙ্গোলিতে সেজে ওঠে উঠোন, আকাশ ভরে ওঠে শব্দে ও রঙে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই উৎসব মিলে যায় কালীপুজোর সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও অসমে কালীপুজোতেও বাড়িঘর আলোকিত করা হয় প্রদীপ ও মোমবাতিতে, আর আতসবাজি ফাটানো হয় অশুভ শক্তিকে দূর করার প্রতীক হিসেবে, মা কালীকে উৎসর্গ করে।
কিন্তু কখন থেকে আতসবাজি দীপাবলির অঙ্গ হয়ে উঠল? ইতিহাস বলছে, এই ঐতিহ্যের শিকড় জড়িয়ে আছে সুদূর চিনের মাটিতে, মুঘল আমলে তা প্রাণ পায়।
দীপাবলির সঙ্গে আতসবাজির যোগ আজ অবিচ্ছেদ্য মনে হলেও, এর জন্মস্থান কিন্তু ভারত নয়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এর শুরুটা প্রাচীন চিনে। তখন কিন্তু ভাবা যায়নি আজকের এই নানা জিনিসের মিশ্রণে এমন একটা জিনিস গড়ে উঠতে পারে। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন চিনে বাঁশের টুকরো আগুনে ফেলা হত, ভেতরে বাতাস ভরে থাকার কারণে তা ফাটত এবং শব্দও হত। সম্ভবত, এখান থেকেই আতসবাজির প্রাথমিক ধারণা আসে।
নবম শতকে চিনা রসায়নবিদরা আবিষ্কার করেন গানপাউডার (সালফার, চারকোল ও সল্টপিটার-এর মিশ্রণ) যা থেকেই তৈরি হয় আধুনিক আতসবাজি।
বিখ্যাত স্কলার জোসেফ নিডহাম তাঁর 'Science and Civilization in China' বইতে লিখেছেন, চিনের লিউয়াং অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতেই তাওবাদী রসায়নবিদরা প্রথম আতসবাজি ও রকেট বানিয়েছিলেন।
কীভাবে আতসবাজি ভারতে এল?
মধ্যযুগে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সূত্রে ভারতে আতসবাজির আগমন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তা তেরশো শতাব্দীতেই পৌঁছে যায় উপমহাদেশে, আবার কারও মতে সময়কালটা ছিল ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে।
ইতিহাসবিদ পি.কে. গোডে তাঁর History of Fireworks in India between 1400 and 1900 বইয়ে লিখেছেন, গানপাউডার ভারতে আসে আনুমানিক ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে, মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। চিনের তাং রাজবংশের সময় (প্রায় ৭০০ খ্রিস্টাব্দে) প্রথম গানপাউডার আতসবাজিতে ব্যবহৃত হয়।
প্রথমদিকে এটি ছিল রাজদরবারের বিশেষ উৎসব, বিজয় বা রাজবিবাহের অংশ। ইতিহাসবিদ ইকতিদার আলম খান তাঁর 'Gunpowder and Firearm Warfare in Medieval India' বইয়ে লিখেছেন, 'তেরশো শতাব্দীর মধ্যে গানপাউডার ভারতে পৌঁছয়, সঙ্গে এসে পৌঁছয় আতসবাজি তৈরির কৌশল, যা পরবর্তীতে রাজদরবারের উৎসবে জনপ্রিয়তা পায়।”
দীপাবলিতে আতসবাজির প্রথার শুরু কবে?
ঐতিহাসিক নানা সূত্র বলছে, ১৬ থেকে ১৭ শতকের মধ্যে দীপাবলিতে আতসবাজির চল শুরু হয়। প্রথমে রাজপরিবার ও অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের উৎসবে ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসবিদ ডি.এন. ঝা তাঁর 'Feast and Fast: A History of Food in India' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, “চিনা আতসবাজির কৌশল ভারতের রাজদরবারে উৎসবের অংশ হয়েই থেমে থাকেনি, দীপাবলির মতো ধর্মীয় উৎসবেও জুড়ে যায়।”
মুঘল আমলে আতসবাজির 'শিল্প'
মুঘল যুগেই আতসবাজি কার্যত 'শিল্পের' তকমা পায়। সম্রাট আকবর রাজসভায় আতসবাজি প্রদর্শনের সূচনা করেন, আগ্রা ও ফতেপুর সিক্রিতে রাজউৎসবের সময় আতসবাজি তৈরির চিনা কৌশলের কথা লিখেছেন ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তাঁর আকবরনামা-য়।
জন এফ. রিচার্ডস তাঁর 'The Mughal Empire' বইতে লিখেছেন, আকবর ১৫৭০-এর দশকে নওরোজ ও বিজয় উৎসবে আতসবাজি প্রদর্শন শুরু করেন।
জাহাঙ্গিরের আমলে আতসবাজি শিল্পকলা প্রাণ পেয়েছিল। তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি-তে ১৬১০ সালে লাহোরে চিনা কারিগরদের তৈরি আতসবাজির এক বর্ণনা রয়েছে। এমনকী ঔরঙ্গজেব আমলেও আতসবাজির বাণিজ্য টিকে ছিল। ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ফ্রেজার লিখেছেন, দিল্লির চাঁদনি চক এলাকায় প্রায় ১০ হাজার কারিগর আতসবাজি তৈরি করতেন। উইলিয়াম ডালরিম্পল 'The Last Mughal'-এও এই তথ্য তুলে ধরেছেন।
আধুনিক ভারতের আতসবাজি
আজ ভারতের আতসবাজি শিল্পের কেন্দ্র তামিলনাড়ুর শিবকাশি। প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার এই শিল্প দেশের মোট উৎপাদনের ৯০ শতাংশের দায়িত্বে। এখানে ৮,০০০-রও বেশি কারখানায় সরাসরি কাজ করেন ৩ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক, আর পরোক্ষভাবে জীবিকা পান প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ।
এইভাবেই শতাব্দী-প্রাচীন এই শিল্প ভারতের উৎসব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।