সেই সময়ে ব্রিটিশ অফিসাররা গরমের ছুটি কাটাতে পালিয়ে আসতেন পাহাড়ে। তাঁদের রুচি অনুযায়ী কেভেন্টার্স তৈরি করেছিল ইংরেজি ব্রেকফাস্টের মেনু।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 14 October 2025 18:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দার্জিলিং (Darjeeling)। শুধু পাহাড় নয়, সময়ের এক ধীর ছন্দ। ১৯৭০-এর দার্জিলিং ছিল আরও শান্ত, আরও মেঘে ঢাকা, যেন কবিতার ছায়া মিশে প্রতিটি গলিতে। তখনও শহরটি ছিল না কেবল পর্যটনের গন্তব্য। ছিল এক আলাদা জীবনের সুর, যেখানে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ছোঁয়া মিশে গিয়েছিল পাহাড়ের মাটির গন্ধে।
যাঁরা কখনও দার্জিলিংয়ে যাননি, তাঁদের কাছে পরিচালক অনুরাগ বসুর ‘বরফি!’ (Barfi) সিনেমাটি একটি রঙিন জানালা খুলে দিতে পারে। তাঁর ক্যামেরার লেন্সে ফুটে উঠেছিল শহরের কালজয়ী রূপ। ক্লক টাওয়ার (Clock Tower), হ্যাপি নিউ ইয়ার ব্রিজ (Happy New Year Bridge), কিংবা কাঠের ছাউনিওয়ালা সেই পুরনো রেস্তরাঁ, যা দেখতে সিনেমার সেটের মতো হলেও বাস্তবে শহরের প্রাণের অংশ - কেভেন্টার্স (Keventer's)।
১৯১১ সাল। মোহনবাগান (Mohunbagan) প্রথমবার বিদেশি কোনও দলকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড (IFA Shield) জিতেছে। বাঙালির ইতিহাসে এক গর্বের অধ্যায়। সেই বছরই দার্জিলিংয়ে জন্ম নেয় আর এক কিংবদন্তি - কেভেন্টার্স। যার গল্প ১১৪ বছর পরও গাঢ় কুয়াশার সঙ্গে মিশে আছে পাহাড়ের বাতাসে।
কেভেন্টার্স নাম শুনে অনেকেই দুধ বা মিল্কশেক ব্র্যান্ডের কথা ভাবেন। আসলে দু’টোরই সূত্রপাত একই ব্যক্তির হাত ধরে। সুইডিশ উদ্যোগপতি (Swedish Dairy Entrepreneur) এডওয়ার্ড কেভেন্টার (Edward Keventer)। ১৯০০ সালের শেষভাগে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে ভারতীয় দুগ্ধশিল্পকে আধুনিক করতে তিনিই শুরু করেছিলেন এই সংস্থা। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে দিল্লি, আলিগড়, কলকাতা ও দার্জিলিংয়ে দুধের খামার।
সেই সময়ে ব্রিটিশ অফিসাররা গরমের ছুটি কাটাতে পালিয়ে আসতেন পাহাড়ে। তাঁদের রুচি অনুযায়ী কেভেন্টার্স তৈরি করেছিল ইংরেজি ব্রেকফাস্টের মেনু (English Breakfast Menu)। তাতে থাকত - ডিম, টোস্ট, বেকড বিনস, হ্যাম, বেকন, সসেজ, এমনকী স্থানীয় উপাদানে বানানো পেস্ট্রি ও হট চকোলেট। আজ ১১৪ বছর পরও সেই স্বাদ অপরিবর্তিত।
দার্জিলিংয়ের কেভেন্টার্সে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার (Kanchenjunga) সাক্ষী থেকে এক প্লেট পোর্ক হট ডগ বা চিকেন বার্গার খাওয়ার অভিজ্ঞতা টাইম ট্রাভেলের মতো। অনেকেই বলেন, এখানে শুধু খাবার নয়, ইতিহাসের স্বাদও পাওয়া যায়।
এডওয়ার্ড কেভেন্টারের মৃত্যুর পর ১৯৩৭ সালে দার্জিলিংয়ের কেভেন্টার্স রেস্তরাঁটি প্রথমে নেপালের শাহ পরিবার (Nepal Shah Family) এবং পরে ১৯৭০ সালে ঝাঁ পরিবার অধিগ্রহণ করে। অন্যদিকে, ব্র্যান্ডের বাকি অংশ কিনে নেন শিল্পপতি রামকৃষ্ণ ডালমিয়া, যিনি পরবর্তীতে কেভেন্টার্সকে মিল্ক পাউডার, কনডেন্সড মিল্ক, মিল্কশেক ও আইসক্রিমের ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলেন।
তবুও দার্জিলিংয়ের কেভেন্টার্স রয়ে গেছে একেবারে আলাদা। এখানে আজও পরিবেশিত হয় সেই পুরনো রেসিপি, যা বারেবারে ফিরিয়ে নিয়ে আসে সেই অতীতের পাহাড়ি সকালের আবহ।
দার্জিলিং মানেই টয় ট্রেনের (Toy Train) হুইসেল, কাঠের বাড়ির বারান্দায় বসে চা পান, আর দূরে বরফবেষ্টিত কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু এসবের মাঝেও মনের এক কোণে দখল করে থাকে কেভেন্টার্সের ধোঁয়া ওঠা ব্রেকফাস্ট। যা বয়ে নিয়ে চলে ইতিহাসের সময়।
পর্যটক হোক কিংবা স্থানীয় মানুষ - সবার কাছে কেভেন্টার্স এখন দার্জিলিংয়ের আরেক নাম। শহর যতই আধুনিক হোক, এই ছোট্ট রেস্তরাঁ আজও পাহাড়ি শহরের পুরনো গল্প বলে চলে।